সিরাজগঞ্জ মহাসড়কে কম দামে পণ্য বিক্রি, ট্রাক থেকে মালামাল সরানোর অভিযোগ
চট্টগ্রাম থেকে রডবোঝাই একটি ট্রাক যাচ্ছিল রংপুরে। গন্তব্যে পৌঁছানোর আগেই সিরাজগঞ্জ মহাসড়কের পাশে একটি পয়েন্টে ঢোকে ট্রাকটি। এরপর টিনের আড়ালে ট্রাক থেকে নামানো হয় রড। বাজারে প্রতি কেজি রডের দাম প্রায় ৯০ টাকা হলেও সেখানে তা বিক্রি করা হচ্ছিল ৫৫ টাকা কেজি দরে। ট্রাকচালক ও তাঁর সহকারী মালামাল নামিয়ে বিক্রি করেন, আর পয়েন্টের কর্মচারীরা তা কিনে নেন।
সম্প্রতি সিরাজগঞ্জ মহাসড়কের পাশে এমন একটি ঘটনা দেখা গেছে। শুধু রড নয়, চাল, ডাল, তেল, পেঁয়াজ, ভুট্টা ও সিমেন্টসহ বিভিন্ন পণ্যও এসব পয়েন্টে কম দামে বিক্রির অভিযোগ রয়েছে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে সেই সব পণ্যের মালিক ও ব্যবসায়ীদের, যাঁরা ট্রাকের মাধ্যমে নির্ধারিত গন্তব্যে মালামাল পাঠান।
উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চলের ২২ জেলার যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ পথ সিরাজগঞ্জ মহাসড়ক দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ২২ থেকে ২৫ হাজার যানবাহন চলাচল করে। এই মহাসড়কের দুই পাশে বিভিন্ন স্থানে গড়ে উঠেছে পণ্য কেনাবেচার পয়েন্ট। দিনের পাশাপাশি রাতেও এসব স্থানে পণ্য কেনাবেচা চলে।
সরেজমিনে দেখা যায়, কোনো কোনো পয়েন্টে টিন দিয়ে এমনভাবে ঘেরা তৈরি করা হয়েছে, যাতে একটি ট্রাক ভেতরে প্রবেশ করতে পারে। ট্রাক ঢোকার পর পর্দা বা আড়াল দিয়ে সেটি ঢেকে দেওয়া হয়। এরপর ট্রাক থেকে মালামাল নামিয়ে ওজন করা হয়। পণ্যভেদে দাম নির্ধারণের পর শুরু হয় কেনাবেচা।
এসব পয়েন্টে মূল মালিকদের সাধারণত দেখা যায় না। দৈনিক মজুরিতে নিয়োগ করা কর্মচারীরাই পণ্য গ্রহণ, ওজন ও কেনাবেচার কাজ করেন।
বাজারদরের চেয়ে কম দামে বিক্রি
সম্প্রতি দিনের বেলায় চট্টগ্রাম থেকে রড নিয়ে রংপুরগামী একটি ট্রাক মহাসড়কের পাশের একটি পয়েন্টে ঢোকে। সেখানে ট্রাকচালক ও তাঁর সহকারী মিলে প্রায় ১৫ কেজি রড নামান। পরে প্রতি কেজি ৫৫ টাকা দরে রডগুলো বিক্রি করা হয়। অথচ ওই সময় বাজারে রডের দাম ছিল কেজিপ্রতি প্রায় ৯০ টাকা। অর্থাৎ বাজারদরের তুলনায় প্রতি কেজিতে প্রায় ৩৫ টাকা কমে বিক্রি করা হচ্ছিল।
নিরাপত্তার কারণে ট্রাকচালক ও পয়েন্টের কর্মচারীরা নিজেদের নাম প্রকাশ করতে চাননি। নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই ট্রাকচালক ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘আমরা চট্টগ্রাম থেকে যে পরিমাণ রড তুলেছি, তা ওজন করেই দিয়েছে। রংপুরে গিয়েও আবার ওজন করা হবে। পরিবহনের সময় ২০ কেজি পর্যন্ত ওজন কমবেশি হলে সাধারণত সমস্যা হয় না। টাকাপয়সা যা ছিল, খরচ হয়ে গেছে। তাই বাজারে ৯০ টাকা কেজি দরের রড এসব পয়েন্টে ৫০ থেকে ৫৫ টাকা কেজি দরে বিক্রি করেছি। এই টাকা দিয়ে একটু ভাত খাইতাম। মালিক জানলে চাকরি থাকবে না।’
দৈনিক মজুরিতে কর্মচারী, কেনেন কম দামে
মহাসড়কের পাশে গড়ে ওঠা এসব পয়েন্টে পণ্য কেনাবেচার কাজে নিয়োজিত রয়েছেন দৈনিক মজুরিতে কাজ করা কর্মচারীরা। ট্রাক থেকে পণ্য নামানো, ওজন করা এবং দাম নির্ধারণের দায়িত্ব পালন করেন তাঁরা।
পয়েন্টগুলোর মালিক কারা, কোথা থেকে পণ্য সংগ্রহ করা হয় এবং কেন বাজারদরের তুলনায় কম দামে এসব পণ্য কেনা হয়—এসব বিষয়ে বিস্তারিত বলতে রাজি নন কর্মচারীরা।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একটি পয়েন্টের কর্মচারী ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘আমি দৈনিক ৬০০ টাকা হাজিরা পাই। মহাসড়কের দুই পাশেই অনেক পয়েন্ট আছে। যে-ই মালামাল বিক্রি করতে আসে, আমরা কম দামে কিনি।’
প্রশ্নের মুখে নজরদারি
মহাসড়ক দিয়ে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক পণ্যবাহী ট্রাক চলাচল করে। পরিবহনের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরা যদি মালিকের অনুমতি ছাড়া পথে পণ্য নামিয়ে বিক্রি করেন, তাহলে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন পণ্যের মালিক ও ব্যবসায়ীরা। একই সঙ্গে এ ধরনের কার্যক্রম পরিবহনব্যবস্থায় অনিয়মের সুযোগ তৈরি করতে পারে।
সিরাজগঞ্জ মহাসড়কের পাশে গড়ে ওঠা পণ্য কেনাবেচার পয়েন্টগুলোর কার্যক্রম, সেখানে বিক্রি হওয়া পণ্যের উৎস এবং পরিবহনের সময় মালামাল সরিয়ে বিক্রির অভিযোগ তদন্তের দাবি রাখে।
অভিযান অব্যাহত রাখার কথা পুলিশের
এ বিষয়ে হাটিকুমরুল হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মাহাবুর রহমান ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘আমি নতুন এসেছি। এর আগেও রাতভর জেলা পুলিশের তত্ত্বাবধানে আমরা অভিযান চালিয়েছি। এই অভিযান অব্যাহত থাকবে।’
তবে মহাসড়কের পাশে পণ্য কেনাবেচার এসব পয়েন্টে অভিযান চালিয়ে কী পাওয়া গেছে, কতজনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কিংবা পরিবহনের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের মাধ্যমে পণ্য সরিয়ে বিক্রির অভিযোগ তদন্ত করা হয়েছে কি না, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি।





















