অস্ত্রের মজুত কমেছে, উৎপাদন বাড়াতে মার্কিন নির্মাতাদের পেন্টাগনের নির্দেশ
অস্ত্রের মজুত কমে যাওয়ায় দ্রুত উৎপাদন বাড়াতে মার্কিন অস্ত্র নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলোকে নির্দেশ দিয়েছে পেন্টাগন।
আন্তর্জাতিক ডেস্ক: ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধসহ বিভিন্ন কারণে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রের মজুত কমে যাওয়ায় দ্রুত অস্ত্র উৎপাদন বাড়াতে দেশটির অস্ত্র নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলোকে আহ্বান জানিয়েছে পেন্টাগন। গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জামের সরবরাহ দ্রুত বাড়ানোর পরিকল্পনা জানাতে নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলোকে সর্বোচ্চ ২১ দিন সময় দেওয়া হয়েছে।
পেন্টাগনের মুখপাত্র শন পারনেল গত শনিবার এক বিবৃতিতে বলেন, সামরিক বাহিনীর প্রয়োজনীয় অস্ত্র দ্রুত সরবরাহ নিশ্চিত করতে প্রতিরক্ষা দপ্তর অস্ত্র ক্রয় বাড়ানোর তাগিদ দিচ্ছে। এ প্রক্রিয়া দ্রুত করতে গত এক সপ্তাহে বেশ কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
তবে পারনেল বলেন, শুধু ইরানের সঙ্গে চলমান পাঁচ মাসের যুদ্ধের কারণে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। এর আগে থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রভান্ডার আধুনিকায়ন ও প্রতিরক্ষাশিল্পের সক্ষমতা বাড়ানোর একটি বড় উদ্যোগ চলছিল।
অস্ত্র উৎপাদন বাড়ানোর নির্দেশ
যুক্তরাষ্ট্রের উপপ্রতিরক্ষামন্ত্রী স্টিভ ফেইনবার্গ গত বুধবার দেশটির অস্ত্র নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রধানদের কাছে একটি চিঠি পাঠান। চিঠিতে গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম দ্রুত সরবরাহ এবং উৎপাদন বাড়ানোর পরিকল্পনা জানাতে প্রতিষ্ঠানগুলোকে সর্বোচ্চ ২১ দিন সময় দেওয়া হয়েছে।
ফেইনবার্গ চিঠিতে বলেন, বছরের পর বছর ধরে অস্ত্র উৎপাদনের প্রক্রিয়া চালিয়ে যাওয়া আর গ্রহণযোগ্য নয়। এখন থেকে আরও দ্রুত অস্ত্র উৎপাদন করতে হবে এবং উৎপাদন সক্ষমতাও বাড়াতে হবে।
পেন্টাগনের ভাষ্য অনুযায়ী, এই নির্দেশনা ২০২৮ অর্থবছরের বাজেট তৈরিতে কাজে লাগবে। ওই বাজেট অনুমোদনের জন্য কংগ্রেসে পাঠানো হবে।
কমছে প্যাট্রিয়ট ও থাডের মজুত
আগে থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধী অস্ত্রের মজুত কমছিল। ইরানের সঙ্গে সাম্প্রতিক যুদ্ধের কারণে সেই মজুতে আরও চাপ পড়েছে।
ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ (CSIS)-এর বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, প্যাট্রিয়ট ও থাড ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থার মজুত কমে যাওয়ায় যুক্তরাষ্ট্র ও মধ্যপ্রাচ্যে দেশটির মিত্ররা এসব ব্যবস্থা ব্যবহারে আরও সতর্ক হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, প্রতিরক্ষামূলক ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত কমে গেলে ইরানের ছোড়া ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার ক্ষেত্রে মার্কিন বাহিনীকে কম ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করতে হতে পারে। এতে মার্কিন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেদ করে ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোন প্রবেশের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
CSIS-এর হিসাব অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর আগে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ২ হাজার ৩৩০টি প্যাট্রিয়ট প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র ছিল। এপ্রিলে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার সময় তা কমে দাঁড়ায় প্রায় ১ হাজার ৩০টিতে। সাম্প্রতিক লড়াইয়ের পর মজুত আরও কমে ৭৫৯ থেকে ৮২৭টির মধ্যে রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
অর্থাৎ যুদ্ধ শুরুর আগের তুলনায় প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত কমেছে অন্তত ৬৫ শতাংশ।
থাড প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্রের মজুতও কমেছে। যুদ্ধের আগে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে এ ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র ছিল ৪৫২টি। এপ্রিলে যুদ্ধবিরতির শুরুতে তা কমে ২৩২ থেকে ২৬২টির মধ্যে দাঁড়ায়। পরে কিছু ক্ষেপণাস্ত্র মজুতে যুক্ত হওয়ায় সংখ্যা ২৩৪ থেকে ২৭৮টির মধ্যে রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এরপরও যুদ্ধের আগের তুলনায় থাড ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত অন্তত ৩৮ শতাংশ কম।
ট্রাম্পের দাবি, অস্ত্র নিয়ে কৌশলগত সংকট নেই
অস্ত্রের মজুত কমে যাওয়ার খবর প্রকাশ্যে আসায় ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। গত বৃহস্পতিবার তিনি দাবি করেন, পাঁচ মাস ধরে চলা যুদ্ধে অস্ত্রের মজুত নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র এখনো কোনো কৌশলগত সমস্যায় পড়েনি।
নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্রের কাছে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র রয়েছে। বিশেষ করে কিছু নির্দিষ্ট ধরনের অস্ত্রের মজুত অনেক বেশি বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
প্রয়োজন অনুযায়ী অস্ত্রের বড় চালান তৈরি করে যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানো হচ্ছে বলেও দাবি করেন ট্রাম্প। তাঁর ভাষ্য, প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি অস্ত্র তৈরির কারখানা নির্মাণ করছে।
লকহিড ও নর্থরপের সঙ্গে নতুন চুক্তি
অস্ত্র উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগের অংশ হিসেবে চলতি মাসের শুরুতে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থায় ব্যবহৃত বিভিন্ন যন্ত্রাংশের উৎপাদন বাড়াতে প্রতিরক্ষা খাতের দুই বড় প্রতিষ্ঠান লকহিড মার্টিন ও নর্থরপ গ্রুম্যানের সঙ্গে নতুন চুক্তি করেছে মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর।
পেন্টাগনের মুখপাত্র শন পারনেল বলেন, প্রতিরক্ষাশিল্পের সক্ষমতা পুনর্গঠনের চলমান উদ্যোগের সঙ্গে নতুন নির্দেশনাটি পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ।
বিপুল অর্থ বরাদ্দ হলেও সময় লাগবে
এদিকে মার্কিন কংগ্রেসে প্রতিরক্ষা ব্যয়ের একটি বিল আটকে আছে। ইরানের বিরুদ্ধে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সামরিক অভিযান নিয়ে আইনপ্রণেতাদের মধ্যে ক্ষোভ রয়েছে।
একই সঙ্গে পেন্টাগনের বাজেট গত বছরের প্রায় ৯০ হাজার কোটি ডলার থেকে বাড়িয়ে ১ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন ডলার করার জন্য হোয়াইট হাউসের অনুরোধ নিয়েও আপত্তি রয়েছে আইনপ্রণেতাদের।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, নতুন করে বিপুল অর্থ বরাদ্দ করা হলেও যুদ্ধের আগের অবস্থায় প্যাট্রিয়ট ও থাড ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থার মজুত ফিরিয়ে আনতে অন্তত তিন বছর সময় লাগতে পারে।
CSIS-এর বিশ্লেষকদের একজন ও সাবেক মার্কিন মেরিন কর্মকর্তা মার্ক ক্যানসিয়ান আল-জাজিরাকে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের হাতে এসব ক্ষেপণাস্ত্র খুব বেশি নেই এবং এর ভালো বিকল্পও নেই। তাঁর মতে, প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত শেষ হয়ে গেলে ইরানের ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র মার্কিন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেদ করে প্রবেশের ঝুঁকি বাড়বে।
























