বিল গেটসের মেয়ে ফিবি গেটসের ‘ফিয়া’ নিয়ে কুকি স্টাফিং অভিযোগ, হতে পারে বড় জরিমানা
বিল গেটসের মেয়ে ফিবি গেটসের সহপ্রতিষ্ঠিত এআই-চালিত শপিং প্ল্যাটফর্ম ফিয়াকে ঘিরে কুকি স্টাফিংয়ের অভিযোগ উঠেছে।
আন্তর্জাতিক ডেস্ক: বিল গেটসের মেয়ে ফিবি গেটসের সহপ্রতিষ্ঠিত এআই-চালিত শপিং স্টার্টআপ ‘ফিয়া’কে ঘিরে ‘কুকি স্টাফিং’ অভিযোগে নতুন করে আইনি বিতর্ক তৈরি হয়েছে। তবে অভিযোগ প্রমাণিত হলেও ফিবি গেটসের সর্বোচ্চ ২০ বছরের কারাদণ্ড হওয়ার সম্ভাবনা কম বলে জানিয়েছেন আইন বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের মতে, এ ক্ষেত্রে বড় অঙ্কের আর্থিক জরিমানা ও দেওয়ানি মামলার ঝুঁকিই বেশি।
সাইবার ল’ ফার্মের প্রতিষ্ঠাতা অংশীদার স্টার ক্যাশম্যান জানান, ফেডারেল ওয়্যার জালিয়াতির ক্ষেত্রে আইনে সর্বোচ্চ ২০ বছরের কারাদণ্ড ও আর্থিক জরিমানার বিধান রয়েছে। তবে ফিবি গেটসের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ আনতে হলে প্রসিকিউটরদের প্রমাণ করতে হবে যে তিনি জেনেশুনে প্রতারণার উদ্দেশ্যে ওই কর্মকাণ্ডে অংশ নিয়েছিলেন।
ক্যাশম্যানের মতে, এটি কেবল অসতর্কতা বা অবহেলার ঘটনা হলে ওয়্যার জালিয়াতির অভিযোগ প্রমাণ করা কঠিন হবে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে অর্থ থেকে বঞ্চিত করার উদ্দেশ্যে জেনেশুনে একটি সংগঠিত প্রতারণার পরিকল্পনায় অংশ নেওয়ার বিষয়টি প্রমাণ করতে হবে।
তবে ফিবি গেটস ও ফিয়ার জন্য তাৎক্ষণিক বড় ঝুঁকি হতে পারে আর্থিক ক্ষতিপূরণ ও দেওয়ানি মামলা। যেসব পক্ষ ফিয়ার কথিত কর্মকাণ্ডের কারণে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তারা কমিশন, চুক্তি ও ব্যবসায়িক সম্পর্কের পাশাপাশি গোপনীয়তা ও ভোক্তা-অধিকার সংক্রান্ত বিষয়েও আইনি পদক্ষেপ নিতে পারে।
মাইক্রোসফটের সহপ্রতিষ্ঠাতা বিল গেটসের ২৩ বছর বয়সী মেয়ে ফিবি গেটস এবং স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী সোফিয়া কিয়ানি মিলে ফিয়া প্রতিষ্ঠা করেন। এআই-চালিত এই শপিং প্ল্যাটফর্মের কনজ্যুমার অ্যাপ ও ব্রাউজার এক্সটেনশন ২০২৫ সালের এপ্রিলে চালু হয়।
ব্লুমবার্গের প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে, ফিয়ার ব্রাউজার এক্সটেনশন ক্রেতারা কোনো পণ্য কেনার ক্ষেত্রে ফিয়ার মাধ্যমে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ না নিলেও তাঁদের ডিভাইসে স্বয়ংক্রিয়ভাবে অ্যাফিলিয়েট ট্র্যাকিং কুকি বসাতে পারত। এর মাধ্যমে কোনো বিক্রয়ে ফিয়ার অবদান না থাকলেও প্রতিষ্ঠানটি কমিশনের কৃতিত্ব পাওয়ার সুযোগ তৈরি করত। প্রযুক্তি ও অ্যাফিলিয়েট মার্কেটিংয়ে এ ধরনের পদ্ধতিকে ‘কুকি স্টাফিং’ বলা হয়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, নাইকি, নর্ডস্ট্রম ও গ্যাপের মতো প্রতিষ্ঠানের বিক্রির ক্ষেত্রেও এ ধরনের কার্যক্রমের প্রভাব পড়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব প্রতিষ্ঠান এ বিষয়ে এখনো প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য করেনি।
ব্লুমবার্গের প্রতিবেদনে ফিয়ার অভ্যন্তরীণ স্ল্যাক বার্তা ও সোর্স কোডের তথ্য তুলে ধরে বলা হয়েছে, সমস্যাটি প্রকাশ্যে আসার কয়েক মাস আগেই স্বয়ংক্রিয় কুকি-প্লেসমেন্ট ফিচার সম্পর্কে প্রতিষ্ঠাতারা অবগত ছিলেন। তবে ফিয়া প্রতিবেদনের কিছু অভিযোগ অস্বীকার করেছে এবং প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে এখনো কোনো ফৌজদারি অভিযোগ আনা হয়নি।
ক্যাশম্যান বলেন, কোনো কর্মকাণ্ডে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত আচরণ থাকলেও তার অর্থ এই নয় যে স্বয়ংক্রিয়ভাবে মামলা বা বিচার শুরু হবে। তাঁর মতে, পরিচ্ছন্ন অতীত থাকা একজন তরুণ উদ্যোক্তার ক্ষেত্রে প্রথম অপরাধেই সর্বোচ্চ শাস্তি পাওয়ার ঘটনা অত্যন্ত বিরল।
তবে আইনি ঝুঁকি পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হলে ফিবি গেটস ও তাঁর কোম্পানির বিরুদ্ধে আদালতে মামলা হওয়ার যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে বলে মনে করেন ক্যাশম্যান।
এই বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে ফিয়ার ব্যবসার গুরুত্বপূর্ণ অংশ অ্যাফিলিয়েট মার্কেটিং ব্যবস্থা। কোনো ক্রেতা অ্যাফিলিয়েটের লিংক বা কুপন ব্যবহার করে পণ্য কিনলে ট্র্যাকিং কুকির মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট অ্যাফিলিয়েটকে শনাক্ত করা হয় এবং বিক্রির বিপরীতে কমিশন দেওয়া হয়।
কিন্তু ‘কুকি স্টাফিং’-এর মাধ্যমে এই ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করে এমন বিক্রির কৃতিত্ব নেওয়া সম্ভব, যা সংশ্লিষ্ট অ্যাফিলিয়েট প্রকৃতপক্ষে তৈরি করেনি। দীর্ঘদিনের বিজ্ঞাপন গবেষক বেন এডেলম্যান ফিয়ার কার্যক্রম পর্যালোচনা করেছেন। তিনি বলেন, ব্রাউজার এক্সটেনশনের মতো ক্লায়েন্ট-সাইড সফটওয়্যার জড়িত থাকলে ‘ফোর্সড ক্লিকস’ শব্দটি ব্যবহার করা বেশি উপযুক্ত হতে পারে। তবে কুকি স্টাফিংয়ের সঙ্গে এর পার্থক্য খুব সামান্য।
এডেলম্যানের মতে, কোনো ব্যবহারকারী সংশ্লিষ্ট লিংকের সঙ্গে অর্থবহভাবে যুক্ত না হলে একটি ব্রাউজার এক্সটেনশনের পক্ষ থেকে অ্যাফিলিয়েট লিংক চালু বা কুকি বসানোর যৌক্তিক কারণ নেই। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, এর ফলে অ্যাফিলিয়েটের আয় দ্রুত বাড়তে পারে এবং একই সঙ্গে বিক্রেতাদের খরচও বেড়ে যায়।
পারফরম্যান্স-মার্কেটিং শিল্পের কোম্পানিগুলোর প্রতিনিধিত্ব করা আইনজীবী রিচার্ড নিউম্যান জানান, অ্যাফিলিয়েট চুক্তিতে সাধারণত কুকি স্টাফিং নিষিদ্ধ থাকে। এ ধরনের কর্মকাণ্ড ধরা পড়লে সংশ্লিষ্ট অ্যাফিলিয়েটের কমিশন বাতিল হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।
নিউম্যানের মতে, প্রতারণার অভিযোগ প্রমাণিত হলেও এ ধরনের বিরোধ অনেক সময় ব্যক্তিগত পক্ষগুলোর মধ্যকার চুক্তিভিত্তিক বিষয় হিসেবে বিবেচিত হয়। ফলে সংশ্লিষ্ট অ্যাফিলিয়েট কমিশন হারানোর পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠানগুলো দেওয়ানি আইনি পদক্ষেপ নিতে পারে।
ব্লুমবার্গের তথ্য অনুযায়ী, বিতর্কিত ফিচারগুলো বন্ধ করার পর ফিয়ার গড় দৈনিক আয় প্রায় ৮০ হাজার ডলার থেকে কমে ১০ হাজার থেকে ২৮ হাজার ডলারের মধ্যে নেমে আসে। তবে ফিয়া দাবি করেছে, শুধু বিতর্কিত ফিচার নয়, তাদের অধিকাংশ মনিটাইজেশন ব্যবস্থা বন্ধ করে দেওয়ার কারণেও এই আয় কমেছে।
ফিয়া জানিয়েছে, যেসব ফিচারের কারণে বিক্রির ভুল কৃতিত্ব তৈরি হচ্ছিল, সেগুলো ৭ জুলাই সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি সংশ্লিষ্ট লেনদেন পর্যালোচনা এবং ব্র্যান্ড অংশীদারদের ভুলভাবে দেওয়া কমিশন সমন্বয়ের কাজ শুরু করেছে বলেও জানিয়েছে।
এদিকে, ফিবি গেটস ও ফিয়ার কাছে এ বিষয়ে মন্তব্য চেয়েছে নিউ ইয়র্ক পোস্ট। এখন পর্যন্ত তাঁদের বিরুদ্ধে কোনো ফৌজদারি অপরাধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আনা হয়নি।





















