পাঁচ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি: ভারতের পুরোনো প্রতিশ্রুতি, নতুন পূর্বাভাস
আন্তর্জাতিক ডেস্ক: ভারতের বহু আলোচিত ‘পাঁচ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি’ হওয়ার লক্ষ্য আবারও সামনে এসেছে। গত ৪ আগস্ট ভারতের অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারমণ সংসদে জানান, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (IMF) পূর্বাভাস অনুযায়ী ২০২৯ অর্থবছরে ভারতের মোট দেশজ উৎপাদন (GDP) পাঁচ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়াতে পারে।
নতুন এই পূর্বাভাস সামনে আসার পর ভারতের অর্থনীতির আকার, প্রবৃদ্ধির গতি এবং কয়েক বছর ধরে দেওয়া পাঁচ ট্রিলিয়ন ডলারের প্রতিশ্রুতি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। কারণ, এই লক্ষ্য প্রথম ঘোষণা করা হয়েছিল বহু বছর আগে। এর মধ্যে কয়েকবার সময়সীমাও পরিবর্তন করা হয়েছে।
বারবার এসেছে পাঁচ ট্রিলিয়ন ডলারের লক্ষ্য
২০১৮ সালে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের সম্মেলনে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি জানিয়েছিলেন, ২০২৫ সালের মধ্যে ভারত পাঁচ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত হবে। পরবর্তী সময়ে ২০১৯ সালে পাঁচ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির লক্ষ্য নিয়ে ভারতের বাজেটেও গুরুত্ব দেওয়া হয়। তৎকালীন বাজেট নথিতে ভারতের অর্থনীতিকে পাঁচ ট্রিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার জন্য কাঠামোগত সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছিল।
তবে করোনা মহামারির সময় ভারতের অর্থনীতিতে বড় ধাক্কা লাগে। ২০২০-২১ অর্থবছরে অর্থনীতি উল্লেখযোগ্যভাবে সংকুচিত হয়। এরপরও সরকারের পক্ষ থেকে পাঁচ ট্রিলিয়ন ডলারের লক্ষ্য পুরোপুরি পরিত্যাগ করা হয়নি।
পরবর্তী কয়েক বছরে প্রধানমন্ত্রী মোদি এবং সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি এই লক্ষ্য অর্জনের কথা পুনরায় উল্লেখ করেন। কিন্তু নির্ধারিত সময়ের মধ্যে লক্ষ্য অর্জন সম্ভব হয়নি।
২০২৫ সাল পার হওয়ার পরও ভারত পাঁচ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পৌঁছাতে পারেনি। এর পর নতুন করে ২০২৯ অর্থবছরকে সম্ভাব্য সময়সীমা হিসেবে সামনে আনা হয়েছে। সাম্প্রতিক সংসদীয় বক্তব্যে নির্মলা সীতারমণও IMF-এর পূর্বাভাসের ভিত্তিতে ২০২৯ অর্থবছরের কথা উল্লেখ করেছেন।
নতুন পূর্বাভাস কতটা বাস্তবসম্মত
ভারতের অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি নিয়ে সরকারি তথ্য অবশ্য ইতিবাচক চিত্র তুলে ধরছে। ২০২৬ সালের Economic Survey অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ভারতের প্রকৃত GDP প্রবৃদ্ধি ৭ দশমিক ৪ শতাংশ হতে পারে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে ৬ দশমিক ৮ থেকে ৭ দশমিক ২ শতাংশের মধ্যে।
সরকারের অর্থনৈতিক নথিতে বলা হয়েছে, অভ্যন্তরীণ চাহিদা, সরকারি বিনিয়োগ, ভোগব্যয়, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং সংস্কার কার্যক্রম ভারতের প্রবৃদ্ধির অন্যতম চালিকাশক্তি।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটেও ভারতের নামমাত্র GDP ১০ শতাংশ বাড়ার পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। সরকারের হিসাবে ওই অর্থবছরে নামমাত্র GDP প্রায় ৩৯৩ লাখ কোটি রুপিতে পৌঁছাতে পারে।
অর্থাৎ ভারতীয় অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি অব্যাহত থাকলেও পাঁচ ট্রিলিয়ন ডলারের হিসাবের ক্ষেত্রে রুপি-ডলারের বিনিময় হারও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
রুপি ও ডলারের হিসাব
একটি দেশের GDP ডলারে হিসাব করলে স্থানীয় মুদ্রার বিনিময় হার বড় ভূমিকা রাখে। ভারতের GDP রুপিতে বাড়লেও রুপির মূল্য ডলারের বিপরীতে কমে গেলে ডলারে হিসাব করা অর্থনীতির আকার প্রত্যাশার তুলনায় কম হতে পারে।
সাম্প্রতিক GDP সিরিজ পরিবর্তন নিয়েও ভারতের অর্থনীতি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। নতুন হিসাবপদ্ধতিতে আগের কিছু প্রবৃদ্ধির হিসাব সংশোধন করা হয়েছে এবং অর্থনীতির নামমাত্র আকার নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
তবে রুপির বিনিময় হারকে একমাত্র কারণ হিসেবে দেখলে বিষয়টি পুরোপুরি ব্যাখ্যা করা যায় না। অর্থনীতির প্রকৃত প্রবৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগ, উৎপাদনশীলতা ও বৈদেশিক পুঁজি প্রবাহ—সবকিছু মিলিয়েই ডলারে GDP-এর আকার নির্ধারিত হয়।
পাঁচ ট্রিলিয়ন থেকে ৩৫ ট্রিলিয়ন
পাঁচ ট্রিলিয়ন ডলারের লক্ষ্য নিয়ে দীর্ঘ সময় আলোচনা চলার পর ভারত সরকার এখন আরও দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য সামনে এনেছে। ২০৪৭ সালের মধ্যে ভারতকে একটি উন্নত অর্থনীতিতে পরিণত করার পাশাপাশি অর্থনীতির আকার কয়েক দশকের মধ্যে প্রায় ৩৫ ট্রিলিয়ন ডলারে নেওয়ার লক্ষ্য নিয়েও আলোচনা চলছে।
এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য ভারতের Economic Survey-তে দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চ প্রবৃদ্ধি ধরে রাখার প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছে। ২০২৫ সালের Economic Survey অনুযায়ী, ২০৪৭ সালের উন্নত অর্থনীতির লক্ষ্য অর্জনে আগামী দুই দশক বা তারও বেশি সময় ধরে গড়ে প্রায় ৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি প্রয়োজন হতে পারে।
অর্থনীতিবিদদের কাছে এখানেই বড় প্রশ্ন—উচ্চ প্রবৃদ্ধি শুধু কয়েক বছর ধরে রাখা নয়, বরং দীর্ঘ সময় ধরে তা বজায় রাখা কতটা সম্ভব।
উৎপাদন খাত নিয়ে প্রশ্ন
ভারত সরকার দীর্ঘদিন ধরে উৎপাদন খাতকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম প্রধান ভিত্তি হিসেবে গুরুত্ব দিয়ে আসছে। ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’সহ বিভিন্ন উদ্যোগের মাধ্যমে দেশটিকে বৈশ্বিক উৎপাদন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা করা হয়েছে।
সরকারের সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক নথিতে শিল্প ও উৎপাদন খাতে উন্নতির কথা বলা হয়েছে। ২০২৬ সালের Economic Survey অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথমার্ধে উৎপাদন খাতের প্রবৃদ্ধি ৮ দশমিক ৪ শতাংশ ছিল।
তবে সমালোচকদের প্রশ্ন, এই প্রবৃদ্ধি কতটা কর্মসংস্থান তৈরি করছে এবং ভারতের বিপুল শ্রমশক্তির জন্য কতটা নতুন সুযোগ সৃষ্টি করতে পারছে।
তথ্যপ্রযুক্তি খাতে নতুন চ্যালেঞ্জ
ভারতের অর্থনীতিতে তথ্যপ্রযুক্তি ও সেবা খাত দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। কিন্তু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিস্তার এই খাতের সামনে নতুন ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।
জেনারেটিভ এআইয়ের কারণে সফটওয়্যার, কাস্টমার সার্ভিস, ডেটা প্রসেসিং এবং অন্যান্য জ্ঞানভিত্তিক কাজের একটি অংশ ভবিষ্যতে স্বয়ংক্রিয় হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে ভারতের বিপুলসংখ্যক তরুণ কর্মীর কর্মসংস্থান নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
অর্থনীতির আকার বাড়লেও যদি একই হারে কর্মসংস্থান না বাড়ে, তাহলে GDP প্রবৃদ্ধির সুফল সাধারণ মানুষের কাছে কতটা পৌঁছাচ্ছে—সেটিও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়।
মাথাপিছু আয়ও গুরুত্বপূর্ণ
একটি দেশের মোট GDP বড় হওয়া মানেই দেশটির সব মানুষের জীবনযাত্রার মান একই হারে উন্নত হচ্ছে—এমন নয়। জনসংখ্যা বেশি হলে মোট GDP দ্রুত বাড়লেও মাথাপিছু GDP তুলনামূলক কম থাকতে পারে।
ভারতের ক্ষেত্রে তাই পাঁচ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির পাশাপাশি মাথাপিছু আয়, কর্মসংস্থান, দারিদ্র্য, সামাজিক সুরক্ষা এবং জীবনযাত্রার মানের দিকে নজর দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।
ভারতের অর্থনৈতিক অগ্রগতি নিয়ে ইতিবাচক তথ্য যেমন রয়েছে, তেমনি আয় ও সম্পদের বৈষম্য, কর্মসংস্থান এবং আঞ্চলিক বৈষম্য নিয়েও বিতর্ক রয়েছে।
কেন পাঁচ ট্রিলিয়ন ডলার গুরুত্বপূর্ণ
পাঁচ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি শুধু একটি সংখ্যাগত লক্ষ্য নয়। এটি ভারতের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অবস্থান এবং বড় শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আকাঙ্ক্ষার সঙ্গেও যুক্ত।
বড় অর্থনীতি হলে বৈশ্বিক বাণিজ্য, বিনিয়োগ, কূটনীতি এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানে একটি দেশের প্রভাব বাড়তে পারে। ভারত ইতোমধ্যেই বিশ্বের বৃহৎ অর্থনীতিগুলোর একটি এবং দ্রুত বর্ধনশীল প্রধান অর্থনীতির তালিকায় রয়েছে বলে সরকারি Economic Survey-তে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে অর্থনীতির আকারের পাশাপাশি সেই প্রবৃদ্ধির মান ও বণ্টনও গুরুত্বপূর্ণ। কর্মসংস্থান সৃষ্টি, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং সাধারণ মানুষের আয় বাড়াতে না পারলে শুধু GDP-এর আকার দিয়ে অর্থনৈতিক সাফল্য পুরোপুরি বিচার করা যায় না।
এবার কি সত্যিই পাঁচ ট্রিলিয়ন?
ভারতের অর্থমন্ত্রী যে নতুন পূর্বাভাস দিয়েছেন, সেটি সরকারের নিজস্ব নির্ধারিত সময়সীমার চেয়ে বেশি একটি আন্তর্জাতিক পূর্বাভাসের ওপর ভিত্তি করে দেওয়া হয়েছে। IMF-এর হিসাব অনুযায়ী ২০২৯ অর্থবছরে ভারতের GDP পাঁচ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়াতে পারে।
এবার লক্ষ্যটি অর্জিত হবে কি না, তা নির্ভর করবে ভারতের প্রবৃদ্ধির গতি, রুপির বিনিময় হার, বিনিয়োগ, উৎপাদন, রপ্তানি এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির ওপর।
আগের মতো নির্দিষ্ট সময়সীমা দিয়ে রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি দেওয়ার বদলে এবার IMF-এর পূর্বাভাস সামনে এসেছে—এটিও গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য।
সব মিলিয়ে ভারতের পাঁচ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি হওয়ার স্বপ্ন এখনো শেষ হয়নি। তবে আগের সময়সীমা পেরিয়ে যাওয়ার পর নতুন পূর্বাভাস বাস্তবে কতটা রূপ নেয়, সেটিই আগামী কয়েক বছরের বড় অর্থনৈতিক পরীক্ষাগুলোর একটি।























