দেশে ৪৫ শতাংশ শিশু প্রথম ছয় মাস শুধু মায়ের দুধ পায় না, উদ্বেগ বিশেষজ্ঞদের
বিশ্ব মাতৃদুগ্ধ সপ্তাহ উপলক্ষে আয়োজিত সেমিনারে দেশে মাতৃদুগ্ধ পান কমে যাওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করেন বিশেষজ্ঞরা।
নিজস্ব প্রতিবেদক: দেশে জন্মের পর প্রথম ছয় মাস শুধু মায়ের দুধ পান করা শিশুর সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে কমে গেছে। বর্তমানে মাত্র ৫৫ শতাংশ শিশু এই সময়ে শুধু মায়ের দুধ পায়, বাকি ৪৫ শতাংশ শিশু প্রয়োজনীয় মাতৃদুগ্ধ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। একই সঙ্গে হাসপাতালগুলোতে আইন লঙ্ঘন করে মায়ের বুকের দুধের বিকল্প শিশুখাদ্য প্রচার ও প্রদর্শনের অভিযোগও উঠে এসেছে।
বিশ্ব মাতৃদুগ্ধ সপ্তাহ ২০২৬ উপলক্ষে বৃহস্পতিবার সরকারের জনস্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানে আয়োজিত এক সেমিনারে এসব তথ্য তুলে ধরেন শিশুস্বাস্থ্য ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। বাংলাদেশ ব্রেস্টফিডিং ফাউন্ডেশন (বিবিএফ) এবং স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবারকল্যাণ বিভাগ যৌথভাবে এ সেমিনারের আয়োজন করে।
সেমিনারে বিবিএফের পরিচালক খুরশিদ জাহান জানান, বর্তমানে দেশে জন্মের পর প্রথম ছয় মাস কেবল মায়ের দুধ পান করে ৫৫ শতাংশ শিশু। অথচ ২০৩০ সালের মধ্যে এ হার ৬০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। তিনি বলেন, এটি কোনো মায়ের ব্যর্থতা নয়; বরং হাসপাতাল ও ক্লিনিকে পর্যাপ্ত সহায়তার অভাব, অস্ত্রোপচারের পর প্রয়োজনীয় পরিচর্যার ঘাটতি এবং মাতৃত্বকালীন ছুটি না পাওয়ার মতো নানা কারণে মাতৃদুগ্ধ পানের হার কমছে।
সেমিনারে জানানো হয়, ২০১৭-১৮ সালে বাংলাদেশে ছয় মাস বয়স পর্যন্ত শুধু মায়ের দুধ পান করা শিশুর হার ছিল ৬৫ শতাংশ। সে সময় উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ প্রথম অবস্থানে থাকলেও বর্তমানে অবস্থান নেমে এসেছে ষষ্ঠে।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, দেশে হামের প্রাদুর্ভাবের পর মাতৃদুগ্ধের গুরুত্ব আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। হামে আক্রান্ত অনেক শিশুই জন্মের পর শালদুধ কিংবা প্রথম ছয় মাস একমাত্র মায়ের দুধ পায়নি। তাঁদের মতে, মায়ের দুধ শিশুর জন্য প্রাকৃতিক টিকার মতো কাজ করে এবং রোগ প্রতিরোধক্ষমতা গড়ে তোলে।
বিবিএফের ভাইস চেয়ারপারসন অধ্যাপক সুফিয়া খাতুন জানান, চলতি বছরের এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত ১২টি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান, ৪০টি বাজারের ২৬০টি ওষুধের দোকান এবং ৪৮টি অনলাইন প্ল্যাটফর্ম পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে। এতে দেখা গেছে, আইন লঙ্ঘন করে শতভাগ দোকানে মাতৃদুগ্ধের বিকল্প পণ্য প্রকাশ্যে প্রদর্শন করা হচ্ছে। একইভাবে সব অনলাইন প্ল্যাটফর্মেই চিকিৎসা বা পুষ্টি পরামর্শের আড়ালে বিকল্প শিশুখাদ্যের প্রচারণা চালানো হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, পর্যবেক্ষণ করা ১২টি শিশুবান্ধব হাসপাতালের কোনোটিতেই কার্যকর ‘শিশুবান্ধব হাসপাতাল কমিটি’ বা ব্রেস্টফিডিং কর্নার সক্রিয় পাওয়া যায়নি। প্রায় সব হাসপাতালেই বিকল্প শিশুখাদ্যের প্রচার এবং আইনের লঙ্ঘনের প্রমাণ মিলেছে।
অনুষ্ঠানের সভাপতি ও বিশিষ্ট পুষ্টিবিদ অধ্যাপক এস কে রায় বলেন, মাতৃদুগ্ধ পানকে টেকসই করতে হলে কার্যকর সহায়ক পরিবেশ, প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মী, মায়েদের প্রয়োজনীয় সহায়তা এবং সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সমন্বিত উদ্যোগ নিশ্চিত করতে হবে। নিয়মিত পর্যবেক্ষণ ও জবাবদিহিও জরুরি বলে মন্তব্য করেন তিনি।
পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক জিন্নাত রেহানা বলেন, মাকে কোনোভাবেই দোষারোপ করা যাবে না; বরং তাঁকে এমন পরিবেশ দিতে হবে, যাতে তিনি সহজেই সন্তানকে বুকের দুধ খাওয়াতে পারেন।
জনস্বাস্থ্য পুষ্টি প্রতিষ্ঠানের উপপরিচালক রওশন জাহান আখতার জানান, মাতৃদুগ্ধের বিকল্প শিশুখাদ্য আইন বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও জনস্বাস্থ্য পুষ্টি প্রতিষ্ঠান যৌথভাবে কাজ করছে। পাশাপাশি সম্প্রতি দেশের ১৪০টি সরকারি হাসপাতালে নতুন করে ব্রেস্টফিডিং কর্নার স্থাপন করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জন্মের প্রথম এক ঘণ্টার মধ্যে শালদুধ খাওয়ানো নবজাতকের মৃত্যুঝুঁকি প্রায় ৩১ শতাংশ কমায়। নিয়মিত মাতৃদুগ্ধ পান করা শিশুদের ডায়রিয়া, নিউমোনিয়া এবং অপুষ্টিজনিত মৃত্যুঝুঁকিও উল্লেখযোগ্যভাবে কম থাকে।























