০৪:৫৯ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ০৭ অগাস্ট ২০২৬, ২৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

পিত্তথলিতে পাথর কেন হয়? লক্ষণ, ঝুঁকি, চিকিৎসা ও প্রতিরোধের উপায়

নিউজ ডেস্ক

পিত্তথলিতে পাথর হলে সময়মতো শনাক্ত ও চিকিৎসা করলে জটিলতা এড়ানো সম্ভব।

স্বাস্থ্য ডেস্ক:
পিত্তথলিতে পাথর (Gallstones) বর্তমানে বিশ্বজুড়ে একটি সাধারণ পরিপাকতন্ত্রের রোগ। অনেকের ক্ষেত্রে বছরের পর বছর কোনো উপসর্গ দেখা না দিলেও কারও কারও তীব্র পেটব্যথা, সংক্রমণ, জন্ডিস কিংবা অগ্ন্যাশয়ের প্রদাহের মতো জটিলতা তৈরি হতে পারে। তবে সময়মতো রোগ শনাক্ত ও সঠিক চিকিৎসা নিলে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এ সমস্যা সফলভাবে মোকাবিলা করা সম্ভব।

পিত্তথলি কী এবং এর কাজ কী?

পিত্তথলি হলো যকৃতের নিচে অবস্থিত একটি ছোট থলির মতো অঙ্গ। এর প্রধান কাজ যকৃতে উৎপাদিত পিত্তরস সংরক্ষণ করা এবং প্রয়োজনের সময় হজমে সহায়তা করা।

পিত্তথলিতে পাথর কেন হয়?

চিকিৎসকদের মতে, পিত্তরসে থাকা কোলেস্টেরল, পিত্ত লবণ ও বিলিরুবিনের ভারসাম্য নষ্ট হলে ছোট ছোট স্ফটিক তৈরি হয়। সময়ের সঙ্গে এগুলো বড় হয়ে পাথরে পরিণত হয়।

এর প্রধান কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে—

  • অতিরিক্ত কোলেস্টেরল
  • পিত্তথলি পুরোপুরি খালি না হওয়া
  • অতিরিক্ত বিলিরুবিন উৎপাদন
  • পিত্তথলির প্রদাহ বা সংক্রমণ

পিত্তথলির পাথর কত ধরনের?

বিশেষজ্ঞদের মতে, পিত্তথলির পাথর সাধারণত তিন ধরনের—

  • কোলেস্টেরল পাথর: সবচেয়ে বেশি দেখা যায় (প্রায় ৮০ শতাংশ)।
  • পিগমেন্ট পাথর: বিলিরুবিনের মাত্রা বেড়ে গেলে তৈরি হয়।
  • মিশ্র পাথর: কোলেস্টেরল, ক্যালসিয়াম ও বিলিরুবিনের মিশ্রণে গঠিত।

কারা বেশি ঝুঁকিতে?

চিকিৎসকদের ‘৫এফ’ সূত্র অনুযায়ী ঝুঁকি বেশি—

  • নারী
  • ৪০ বছরের বেশি বয়স
  • স্থূলতা
  • সন্তান ধারণে সক্ষম নারী
  • পারিবারিক ইতিহাস থাকলে

এ ছাড়া ডায়াবেটিস, উচ্চ কোলেস্টেরল, গর্ভাবস্থা, দ্রুত ওজন কমানো, দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকা এবং উচ্চ চর্বিযুক্ত খাবারও ঝুঁকি বাড়ায়।

কী কী লক্ষণ দেখা দেয়?

অনেকের ক্ষেত্রে কোনো লক্ষণ থাকে না। তবে উপসর্গ দেখা দিলে সাধারণত—

  • পেটের ডান পাশে তীব্র ব্যথা
  • কাঁধ বা পিঠে ব্যথা ছড়িয়ে পড়া
  • চর্বিযুক্ত খাবারের পর ব্যথা
  • বমি বা বমিভাব
  • বদহজম
  • পেট ফাঁপা
  • গ্যাসের সমস্যা

কখন দ্রুত হাসপাতালে যেতে হবে?

নিচের লক্ষণগুলো দেখা দিলে দেরি না করে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া উচিত—

  • জ্বর ও কাঁপুনি
  • জন্ডিস
  • চোখ হলুদ হয়ে যাওয়া
  • গাঢ় রঙের প্রস্রাব
  • তীব্র পেটব্যথা
  • দীর্ঘ সময় ধরে বমি

কীভাবে রোগ নির্ণয় করা হয়?

পিত্তথলির পাথর শনাক্তে সবচেয়ে কার্যকর পরীক্ষা হলো আলট্রাসাউন্ড। প্রয়োজন হলে রক্ত পরীক্ষা, এমআরসিপি, সিটি স্ক্যান কিংবা ইআরসিপিও করা হতে পারে।

চিকিৎসা কী?

যাদের কোনো উপসর্গ নেই, তাদের অধিকাংশের অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হয় না। তবে বারবার ব্যথা বা জটিলতা দেখা দিলে ল্যাপারোস্কোপিক কোলেসিস্টেকটমি (পিত্তথলি অপসারণ) সবচেয়ে কার্যকর ও স্থায়ী চিকিৎসা হিসেবে বিবেচিত।

এই অস্ত্রোপচারের সুবিধা হলো—

  • ছোট ছেদ
  • কম ব্যথা
  • কম রক্তপাত
  • দ্রুত সুস্থ হওয়া
  • এক থেকে দুই দিনের মধ্যে হাসপাতাল ছাড়ার সুযোগ

চিকিৎসা না নিলে কী হতে পারে?

চিকিৎসা বিলম্বিত হলে দেখা দিতে পারে—

  • পিত্তথলির প্রদাহ
  • সংক্রমণ
  • পিত্তনালীতে বাধা
  • অগ্ন্যাশয়ের প্রদাহ
  • পিত্তথলি ছিদ্র হয়ে যাওয়া
  • বিরল ক্ষেত্রে পিত্তথলির ক্যানসার

প্রতিরোধের উপায়

বিশেষজ্ঞদের মতে, কিছু অভ্যাস পরিবর্তনের মাধ্যমে ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব।

  • স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখা
  • নিয়মিত ব্যায়াম
  • ফাইবারসমৃদ্ধ খাবার খাওয়া
  • ফাস্টফুড ও অতিরিক্ত চর্বিযুক্ত খাবার কম খাওয়া
  • পর্যাপ্ত পানি পান
  • ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখা
  • হঠাৎ অতিরিক্ত ওজন কমানো এড়িয়ে চলা

চিকিৎসকদের পরামর্শ, পেটের উপরের ডান পাশে বারবার ব্যথা হলে নিজে ওষুধ না খেয়ে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। সময়মতো রোগ শনাক্ত ও চিকিৎসা নিলে জটিলতা এড়ানো সম্ভব।

পিত্তথলিতে পাথর কেন হয়? লক্ষণ, ঝুঁকি, চিকিৎসা ও প্রতিরোধের উপায়

সময় : ০৪:৪৮:৪২ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৭ অগাস্ট ২০২৬

স্বাস্থ্য ডেস্ক:
পিত্তথলিতে পাথর (Gallstones) বর্তমানে বিশ্বজুড়ে একটি সাধারণ পরিপাকতন্ত্রের রোগ। অনেকের ক্ষেত্রে বছরের পর বছর কোনো উপসর্গ দেখা না দিলেও কারও কারও তীব্র পেটব্যথা, সংক্রমণ, জন্ডিস কিংবা অগ্ন্যাশয়ের প্রদাহের মতো জটিলতা তৈরি হতে পারে। তবে সময়মতো রোগ শনাক্ত ও সঠিক চিকিৎসা নিলে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এ সমস্যা সফলভাবে মোকাবিলা করা সম্ভব।

পিত্তথলি কী এবং এর কাজ কী?

পিত্তথলি হলো যকৃতের নিচে অবস্থিত একটি ছোট থলির মতো অঙ্গ। এর প্রধান কাজ যকৃতে উৎপাদিত পিত্তরস সংরক্ষণ করা এবং প্রয়োজনের সময় হজমে সহায়তা করা।

পিত্তথলিতে পাথর কেন হয়?

চিকিৎসকদের মতে, পিত্তরসে থাকা কোলেস্টেরল, পিত্ত লবণ ও বিলিরুবিনের ভারসাম্য নষ্ট হলে ছোট ছোট স্ফটিক তৈরি হয়। সময়ের সঙ্গে এগুলো বড় হয়ে পাথরে পরিণত হয়।

এর প্রধান কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে—

  • অতিরিক্ত কোলেস্টেরল
  • পিত্তথলি পুরোপুরি খালি না হওয়া
  • অতিরিক্ত বিলিরুবিন উৎপাদন
  • পিত্তথলির প্রদাহ বা সংক্রমণ

পিত্তথলির পাথর কত ধরনের?

বিশেষজ্ঞদের মতে, পিত্তথলির পাথর সাধারণত তিন ধরনের—

  • কোলেস্টেরল পাথর: সবচেয়ে বেশি দেখা যায় (প্রায় ৮০ শতাংশ)।
  • পিগমেন্ট পাথর: বিলিরুবিনের মাত্রা বেড়ে গেলে তৈরি হয়।
  • মিশ্র পাথর: কোলেস্টেরল, ক্যালসিয়াম ও বিলিরুবিনের মিশ্রণে গঠিত।

কারা বেশি ঝুঁকিতে?

চিকিৎসকদের ‘৫এফ’ সূত্র অনুযায়ী ঝুঁকি বেশি—

  • নারী
  • ৪০ বছরের বেশি বয়স
  • স্থূলতা
  • সন্তান ধারণে সক্ষম নারী
  • পারিবারিক ইতিহাস থাকলে

এ ছাড়া ডায়াবেটিস, উচ্চ কোলেস্টেরল, গর্ভাবস্থা, দ্রুত ওজন কমানো, দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকা এবং উচ্চ চর্বিযুক্ত খাবারও ঝুঁকি বাড়ায়।

কী কী লক্ষণ দেখা দেয়?

অনেকের ক্ষেত্রে কোনো লক্ষণ থাকে না। তবে উপসর্গ দেখা দিলে সাধারণত—

  • পেটের ডান পাশে তীব্র ব্যথা
  • কাঁধ বা পিঠে ব্যথা ছড়িয়ে পড়া
  • চর্বিযুক্ত খাবারের পর ব্যথা
  • বমি বা বমিভাব
  • বদহজম
  • পেট ফাঁপা
  • গ্যাসের সমস্যা

কখন দ্রুত হাসপাতালে যেতে হবে?

নিচের লক্ষণগুলো দেখা দিলে দেরি না করে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া উচিত—

  • জ্বর ও কাঁপুনি
  • জন্ডিস
  • চোখ হলুদ হয়ে যাওয়া
  • গাঢ় রঙের প্রস্রাব
  • তীব্র পেটব্যথা
  • দীর্ঘ সময় ধরে বমি

কীভাবে রোগ নির্ণয় করা হয়?

পিত্তথলির পাথর শনাক্তে সবচেয়ে কার্যকর পরীক্ষা হলো আলট্রাসাউন্ড। প্রয়োজন হলে রক্ত পরীক্ষা, এমআরসিপি, সিটি স্ক্যান কিংবা ইআরসিপিও করা হতে পারে।

চিকিৎসা কী?

যাদের কোনো উপসর্গ নেই, তাদের অধিকাংশের অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হয় না। তবে বারবার ব্যথা বা জটিলতা দেখা দিলে ল্যাপারোস্কোপিক কোলেসিস্টেকটমি (পিত্তথলি অপসারণ) সবচেয়ে কার্যকর ও স্থায়ী চিকিৎসা হিসেবে বিবেচিত।

এই অস্ত্রোপচারের সুবিধা হলো—

  • ছোট ছেদ
  • কম ব্যথা
  • কম রক্তপাত
  • দ্রুত সুস্থ হওয়া
  • এক থেকে দুই দিনের মধ্যে হাসপাতাল ছাড়ার সুযোগ

চিকিৎসা না নিলে কী হতে পারে?

চিকিৎসা বিলম্বিত হলে দেখা দিতে পারে—

  • পিত্তথলির প্রদাহ
  • সংক্রমণ
  • পিত্তনালীতে বাধা
  • অগ্ন্যাশয়ের প্রদাহ
  • পিত্তথলি ছিদ্র হয়ে যাওয়া
  • বিরল ক্ষেত্রে পিত্তথলির ক্যানসার

প্রতিরোধের উপায়

বিশেষজ্ঞদের মতে, কিছু অভ্যাস পরিবর্তনের মাধ্যমে ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব।

  • স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখা
  • নিয়মিত ব্যায়াম
  • ফাইবারসমৃদ্ধ খাবার খাওয়া
  • ফাস্টফুড ও অতিরিক্ত চর্বিযুক্ত খাবার কম খাওয়া
  • পর্যাপ্ত পানি পান
  • ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখা
  • হঠাৎ অতিরিক্ত ওজন কমানো এড়িয়ে চলা

চিকিৎসকদের পরামর্শ, পেটের উপরের ডান পাশে বারবার ব্যথা হলে নিজে ওষুধ না খেয়ে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। সময়মতো রোগ শনাক্ত ও চিকিৎসা নিলে জটিলতা এড়ানো সম্ভব।