কক্সবাজারে আইনশৃঙ্খলার অবনতি, বিচারককে অস্ত্র দেখানো থেকে আদালতে গোলাগুলি
খুন, ধর্ষণ, অপহরণ ও আদালত প্রাঙ্গণে সহিংসতার ঘটনায় কক্সবাজারের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
কক্সবাজার প্রতিনিধি: খুন, ধর্ষণ, অপহরণ ও ছিনতাইয়ের পাশাপাশি আদালত প্রাঙ্গণে বিচারককে অস্ত্র দেখানো এবং প্রকাশ্যে গোলাগুলির ঘটনায় কক্সবাজারের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। পুলিশের ভূমিকা, সিদ্ধান্ত গ্রহণের ধরন ও কার্যকারিতা নিয়েও নানা অভিযোগ উঠেছে।
জেলা পুলিশের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত সাত মাসে কক্সবাজারে ৮৮টি খুন, ১২৭টি ধর্ষণ ও ২৯৭টি অপমৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। নারী ও শিশু নির্যাতন আইনে মামলা হয়েছে ১৫০টিরও বেশি। এর বাইরে ছিনতাই, চুরি, ডাকাতি ও অপহরণের ঘটনাও ঘটছে।
পর্যটন এলাকাসহ জেলার বিভিন্ন স্থানে দিনে ১৫ থেকে ৩০টি পর্যন্ত চুরি ও ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটছে বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব ঘটনার অনেকগুলো থানায় মামলা বা সাধারণ ডায়েরি হিসেবে নথিভুক্ত না হওয়ায় সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান পাওয়া যায় না।
বিচারককে অস্ত্র দেখানোর অভিযোগ
জেলা জজ পদমর্যাদার একজন বিচারকের ভাষ্য অনুযায়ী, গত ৩০ নভেম্বর কক্সবাজার আদালত প্রাঙ্গণে এক যুবক এক বিচারককে পিস্তল দেখিয়ে ভয় দেখান। পরে আরও দুই বিচারক তৎকালীন সদর থানার ওসি ছমিউদ্দীনকে ডেকে সিসিটিভি ফুটেজ দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ করেন।
বিষয়টি পুলিশ সুপারকেও জানানো হয়েছিল বলে ওই বিচারক জানান। তবে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
ঘটনার পর জানুয়ারিতে জেলা জজ পদমর্যাদার একাধিক বিচারক পুলিশ সুপার এএনএম সাজেদুর রহমানের কাছে গানম্যান চেয়ে চিঠি দেন। অভিযোগ রয়েছে, তাঁদের গানম্যান দেওয়া হয়নি এবং চিঠিরও কোনো জবাব দেওয়া হয়নি।
এর মধ্যে গত ২৪ মে দিনদুপুরে আদালত প্রাঙ্গণে প্রকাশ্য গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। এতে দুজন গুলিবিদ্ধসহ কয়েকজন আহত হন।
কক্সবাজার জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট মো. আবদুল মন্নান বলেন, স্বাধীনতার পর কক্সবাজারের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির এতটা অবনতি তিনি আর দেখেননি। তাঁর মতে, আদালত চত্বরে গোলাগুলি এবং বিচারকদের অস্ত্র দেখানোর ঘটনায় বিচারক, আইনজীবী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে।
খোরশেদ হত্যায় তদন্তের আগেই সন্দেহভাজনকে নির্দোষ ঘোষণার অভিযোগ
গত ২৪ মার্চ রাতে কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে ছুরিকাঘাতে নিহত হন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক সমন্বয়ক খোরশেদ আলম। ঘটনার পর তারিন নামের এক ব্যক্তিকে আটক করে পুলিশ। তাঁর ব্যাগ থেকে হত্যায় ব্যবহৃত ছুরিও উদ্ধার করা হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে খোরশেদের জানাজা চলাকালে সংবাদ সম্মেলন করে তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই তারিনকে নির্দোষ ঘোষণা করেন পুলিশ সুপার—এমন অভিযোগ উঠেছে। খোরশেদের পরিবারের দাবি, এর আগে তারিন তাঁকে হুমকি দিয়েছিলেন।
একই সময়ে খোরশেদের কাকা তারেককে হত্যাকাণ্ডের প্রধান হোতা হিসেবে দাবি করা হয়। পরে তারেকের একটি সিসিটিভি ফুটেজ প্রকাশের পর ঘটনার সময় তাঁর অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। এতে পুলিশের প্রাথমিক বক্তব্য বিতর্কের মুখে পড়ে।
পরবর্তীতে তারিনকে মামলায় আসামি না করে সাক্ষী করা হয় এবং প্রকৃত সন্দেহভাজনদের বাদ দিয়ে ১০ জনকে আসামি করে মামলা করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
পুলিশের ভূমিকার ওপর অনাস্থা প্রকাশ করে মামলার বাদী নাওশাদ হোসেন আদালতের মাধ্যমে মামলাটি পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ—পিবিআইয়ে স্থানান্তর করেন। বর্তমানে তারিন আত্মগোপনে রয়েছেন বলে জানা গেছে।
সাংবাদিককে হুমকির অভিযোগ
গত ২২ এপ্রিল খুরুশকুলে মন্দিরের সেবায়েত নয়ন সাধুকে হত্যা করে গাছে ঝুলিয়ে দেওয়ার ঘটনা ঘটে। এ হত্যাকাণ্ডের রহস্য উন্মোচন নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করেন সাংবাদিক অন্তর দে বিশাল। পরে পুলিশ আবদুর রহিম নামে একজনকে গ্রেপ্তার করে।
সাংবাদিক অন্তর দে অভিযোগ করেন, সংবাদটি মুছে না ফেললে তাঁকে ওই হত্যা মামলায় ফাঁসানোর হুমকি দেওয়া হয়। তাঁর অভিযোগের তীর ছিল পুলিশ সুপারের আস্থাভাজন হিসেবে পরিচিত এলআইসি সদস্য সোহেলের দিকে। তবে সোহেল এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
অন্তর দের দাবি, বিষয়টি পুলিশ সুপারকে জানানো হলে তিনি উল্টো তাঁকে প্রশ্ন করেন, ‘আপনাকে নিউজ করতে কে বলছে?’ এমনকি সাধারণ ডায়েরি না করারও পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ করেন তিনি।
পরে আবার হুমকি আসার পর সাংবাদিকদের প্রতিবাদের মুখে সদর থানা সাধারণ ডায়েরি গ্রহণ করে। এ ঘটনায় সাংবাদিকরা মানববন্ধন করেন। পূজা উদ্যাপন কমিটিও হুমকির প্রতিবাদ জানিয়ে জড়িতদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানায়।
আইনশৃঙ্খলা সভায় এসপির আচরণ নিয়েও অভিযোগ
আইনশৃঙ্খলা কমিটির কয়েকজন সদস্য পুলিশ সুপারের আচরণ নিয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তাঁদের অভিযোগ, আইনশৃঙ্খলার অবনতি নিয়ে কোনো সদস্য বক্তব্য দিতে চাইলে পুলিশ সুপার অনেক সময় তাঁর বক্তব্য থামিয়ে নিজেই কথা বলতে শুরু করেন। এতে সভায় মুক্তভাবে মতামত দেওয়ার পরিবেশ ব্যাহত হয়।
সম্প্রতি আইনশৃঙ্খলাসংশ্লিষ্ট একটি বৈঠকে তাঁর এমন আচরণে প্রকাশ্যে ক্ষোভ জানান কক্সবাজার-২ আসনের সংসদ সদস্য আলমগীর মুহাম্মদ মাহফুজুল্লাহ ফরিদ।
পুলিশের ভেতরেও অস্থিরতার অভিযোগ
জেলা পুলিশের অন্তত ৩৫ জন কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে তাদের অভিযোগ পাওয়া গেছে যে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির পেছনে পুলিশ সুপারের হঠকারী সিদ্ধান্ত, অদক্ষতা ও দুর্বল পুলিশিং দায়ী।
সম্প্রতি গোপন তথ্য প্রকাশের অভিযোগে ১০১ জন পুলিশ সদস্যকে বদলি করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে সাতজন ইনস্পেকটর, ৩৬ জন এসআই, ২৪ জন এএসআই এবং ৩৪ জন কনস্টেবল রয়েছেন।
পুলিশ সদস্যদের অভিযোগ, অভিজ্ঞ ও দক্ষ কর্মকর্তাদের বেছে বেছে সরিয়ে দিয়ে তাঁদের জায়গায় তুলনামূলক কম অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
অভিযোগ অস্বীকার এসপির
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি নিয়ে পুলিশ সুপার এএনএম সাজেদুর রহমান বলেন, সারা দেশে প্রতি মাসে প্রায় ৩০০টি হত্যাকাণ্ড ঘটে। কক্সবাজারে মাসে ১৫ থেকে ২০টি হত্যাকাণ্ড হয়। তাঁর দাবি, এ ধরনের হত্যাকাণ্ড আগেও হয়েছে এবং এখনো হচ্ছে।
তিনি বলেন, বেশির ভাগ হত্যাকাণ্ড পরকীয়া ও পারিবারিক কারণে ঘটছে এবং হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের আইনের আওতায় আনা হয়েছে।
অন্য অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে কিছুটা বিরক্তির সুরে পুলিশ সুপার বলেন, ‘আমি তো অথর্ব এসপি। আপনাদের প্রিয় এসপি যখন ছিল, তখনো মার্ডার এমন হতো।’ এরপর তিনি ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।
এদিকে কক্সবাজারের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন আইনজীবী, সাংবাদিক ও সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মহলের প্রতিনিধিরা। তাঁদের দাবি, অপরাধ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ও সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।










