বাংলাদেশে বন্যার নতুন আতঙ্ক: আরও ১০ জেলায় আকস্মিক বন্যার সতর্কতা, লাখো মানুষ চরম দুর্ভোগে
প্রকাশিত: ১৩ জুলাই ২০২৬
রিপোর্টার: নিজস্ব প্রতিবেদক
বাংলাদেশে চলমান মৌসুমি বৃষ্টি ও ভারতের উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের কারণে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতি এখনো উদ্বেগজনক। ইতোমধ্যে দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের বেশ কয়েকটি জেলায় বন্যার পানি ধীরে ধীরে কমতে শুরু করলেও নতুন করে দেশের আরও কয়েকটি জেলায় আকস্মিক বন্যার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র (FFWC) জানিয়েছে, আগামী ২৪ থেকে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে দেশের অন্তত ১০টি জেলায় স্বল্পমেয়াদি আকস্মিক বন্যা দেখা দিতে পারে। ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টিপাত এবং উজানের নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় এই সতর্কতা জারি করা হয়েছে।
কোন কোন জেলা ঝুঁকিতে?
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, সিলেট, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, নেত্রকোনা, ময়মনসিংহ, চট্টগ্রাম, ফেনী, খাগড়াছড়ি, কক্সবাজার, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, নীলফামারীসহ কয়েকটি জেলার নদ-নদীর পানি দ্রুত বাড়ছে। এসব জেলার নিচু এলাকা এবং নদীতীরবর্তী বসতিগুলোতে নতুন করে পানি প্রবেশের আশঙ্কা রয়েছে।
এখন পর্যন্ত ক্ষয়ক্ষতির চিত্র
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বন্যায় দেশের বিভিন্ন জেলায় লাখেরও বেশি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। হাজার হাজার পরিবার বাড়িঘর ছেড়ে আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান করছে। অনেক গ্রামীণ সড়ক পানির নিচে তলিয়ে গেছে, ভেঙে গেছে কয়েকটি সেতু ও কালভার্ট। এতে ত্রাণ পৌঁছাতে নানা ধরনের বাধার মুখে পড়ছে প্রশাসন।
চট্টগ্রাম বিভাগে সবচেয়ে বেশি প্রভাব
চট্টগ্রাম, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি ও কক্সবাজারে বন্যা এবং পাহাড়ি ঢলের প্রভাব সবচেয়ে বেশি দেখা গেছে। অনেক এলাকায় বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন, মোবাইল নেটওয়ার্ক দুর্বল এবং বিশুদ্ধ পানির সংকট দেখা দিয়েছে। স্থানীয় প্রশাসনের পাশাপাশি সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, ফায়ার সার্ভিস ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলো উদ্ধারকাজ চালিয়ে যাচ্ছে। দুর্গম এলাকায় নৌকা ও বিশেষ যানবাহনের মাধ্যমে খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি ও ওষুধ পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে।
নদীর পানি বিপৎসীমার ওপরে
বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, দেশের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ নদীর পানি ইতোমধ্যে বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। বিশেষ করে তিস্তা, ধরলা, দুধকুমার, মুহুরী, ফেনী ও হালদা নদীর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়ায় আশপাশের নিম্নাঞ্চলে প্লাবনের ঝুঁকি বেড়েছে।
কৃষি ও জনজীবনে বড় ধাক্কা
বন্যার কারণে আমন ধানের বীজতলা, সবজি ক্ষেত এবং মাছের ঘের ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছে। অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। গ্রামীণ বাজারগুলোতে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় কিছু এলাকায় দামও বেড়েছে। কৃষি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা অব্যাহত থাকলে কৃষি উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
প্রশাসনের প্রস্তুতি
সরকার ইতোমধ্যে শতাধিক আশ্রয়কেন্দ্র চালু করেছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় শুকনো খাবার, বিশুদ্ধ পানি, শিশু খাদ্য ও জরুরি ওষুধ পাঠানো হয়েছে। জেলা প্রশাসনগুলোকে সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণে থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। যেসব এলাকায় ভূমিধসের ঝুঁকি রয়েছে, সেখানকার বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে সরে যেতে অনুরোধ করা হয়েছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাস
আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী কয়েক দিন দেশের উত্তর, উত্তর-পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে। ফলে নদ-নদীর পানি আরও বাড়তে পারে এবং নতুন এলাকায় স্বল্পমেয়াদি বন্যা দেখা দেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে পাহাড়ি অঞ্চলে ভূমিধসের ঝুঁকিও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
জনগণের প্রতি সতর্কবার্তা
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ জনগণকে অপ্রয়োজনীয়ভাবে বন্যাকবলিত এলাকায় যাতায়াত না করার পরামর্শ দিয়েছে। শিশু ও বয়স্কদের নিরাপদ স্থানে রাখার পাশাপাশি বিশুদ্ধ পানি ব্যবহার, বিদ্যুৎ সংযোগে সতর্কতা এবং সরকারি নির্দেশনা অনুসরণ করার আহ্বান জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে গুজবে কান না দিয়ে শুধুমাত্র সরকারি তথ্যের ওপর নির্ভর করার অনুরোধ করা হয়েছে।




















