০২:৪০ অপরাহ্ন, বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬, ৬ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

১২ বছরে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ১ লাখ ২৫ হাজার, দাবি যাত্রী কল্যাণ সমিতির

নিউজ ডেস্ক

২০১৪ সাল থেকে ২০২৬ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় ১ লাখ ২৫ হাজার ৪০৫ জন নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি।

দেশে ২০১৪ সাল থেকে ২০২৬ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত ৭২ হাজার ৭৩৬টি সড়ক দুর্ঘটনায় ১ লাখ ২৫ হাজার ৪০৫ জন নিহত হয়েছেন। এসব দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন ১ লাখ ৭৬ হাজার ২৪৯ জন। সড়ক দুর্ঘটনা বৃদ্ধির জন্য বিগত সরকারের ভুলনীতি, রেল ও নৌপথ সংকুচিত করা এবং সড়কনির্ভর যাতায়াতব্যবস্থাকে দায়ী করেছে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি।

বুধবার (২১ অক্টোবর) জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস উপলক্ষে গণমাধ্যমে পাঠানো এক বার্তায় এসব তথ্য তুলে ধরেন সংগঠনটির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী।

সড়কনির্ভর যাতায়াতব্যবস্থাকে দায়ী করছে সংগঠনটি

মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, স্বাধীনতার আগে দেশের প্রধান যাতায়াতমাধ্যম ছিল নৌপথ এবং দ্বিতীয় অবস্থানে ছিল রেলপথ। নিরাপদ ও সাশ্রয়ী এই দুই মাধ্যমে তখন ৮০ শতাংশ মানুষের যাতায়াত হতো। অন্যদিকে সড়কপথে যাতায়াত করতেন ২০ শতাংশ মানুষ।

তার বক্তব্য অনুযায়ী, স্বাধীনতার পর রেল ও নৌপথ সংকুচিত করে একের পর এক সড়ক নির্মাণ ও সম্প্রসারণের ফলে মানুষের যাতায়াত সড়কনির্ভর হয়ে পড়েছে। এর প্রভাব পড়েছে সড়ক দুর্ঘটনার ওপরও।

তিনি বলেন, সড়ক খাতে অনিয়ম-দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা, পরিবহন খাতে চাঁদাবাজি, ফিটনেসবিহীন যানবাহন চলাচল, লাইসেন্সবিহীন ও অদক্ষ চালক, সড়ক নির্মাণে ত্রুটি, বেপরোয়া গতি এবং মাদক সেবন করে যানবাহন চালানোর মতো কারণে দুর্ঘটনা বাড়ছে।

চালকদের প্রশিক্ষণ ও যোগ্যতা যাচাইয়ে দুর্বলতা এবং অযোগ্য যানবাহনকে ফিটনেস সনদ দেওয়ার বিষয়টিও দুর্ঘটনার জন্য দায়ী বলে উল্লেখ করেন তিনি।

প্রকৃত হতাহতের সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে

বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির দাবি, গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য পর্যবেক্ষণ করে তারা দুর্ঘটনা ও হতাহতের এই পরিসংখ্যান পেয়েছে। তবে দেশের হাসপাতালগুলোর চিত্র অনুযায়ী, প্রকৃত হতাহতের সংখ্যা আরও কয়েক গুণ বেশি হতে পারে বলে মনে করে সংগঠনটি।

সংগঠনটির পর্যবেক্ষণে, মোটরসাইকেল, ব্যাটারিচালিত রিকশা ও সিএনজিচালিত অটোরিকশার বেপরোয়া বৃদ্ধি ও চলাচল, সড়কে ডিভাইডার না থাকা, গাছপালার কারণে বাঁকে দৃষ্টিসীমা বাধাগ্রস্ত হওয়া এবং মহাসড়কের নির্মাণত্রুটি দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ।

এ ছাড়া ট্রাফিক আইন অমান্য, উল্টোপথে যানবাহন চলাচল, সড়কে চাঁদাবাজি, পণ্যবাহী যানে যাত্রী পরিবহন, অতিরিক্ত যাত্রী বহন, ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং এবং চালকদের বিরামহীনভাবে গাড়ি চালানোর কারণে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে বলে জানিয়েছে সংগঠনটি।

উন্নত গণপরিবহনের অভাবেও বাড়ছে ঝুঁকি

যাত্রী কল্যাণ সমিতির অভিযোগ, উন্নত গণপরিবহন ও সমন্বিত যাতায়াতব্যবস্থার অভাবে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা, রাইডশেয়ারিং মোটরসাইকেল, সিএনজিচালিত অটোরিকশা, নসিমন-করিমন ও লেগুনাসহ বিভিন্ন যানবাহনের ওপর মানুষের নির্ভরতা বেড়েছে।

সংগঠনটির মতে, এসব যানবাহনের ওপর নির্ভরতা বৃদ্ধির ফলে সড়কে যানজট ও দুর্ঘটনা—দুটিই বাড়ছে।

সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে যাত্রী কল্যাণ সমিতির সুপারিশ

সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষকে (বিআরটিএ) দেশি-বিদেশি পরিবহন বিশেষজ্ঞদের তত্ত্বাবধানে পরিচালনার সুপারিশ করেছে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি।

এ ছাড়া প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক বাস নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা এবং প্রযুক্তিনির্ভর সড়ক নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা চালুর ওপর গুরুত্ব দিয়েছে সংগঠনটি।

সুপারিশগুলোর মধ্যে আরও রয়েছে—

  • চালকদের উন্নত প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং যথাযথ প্রক্রিয়ায় লাইসেন্স প্রদান।
  • গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়কে ফুটপাত ও সার্ভিস লেন নির্মাণ।
  • পথচারীদের নিরাপদে সড়ক পারাপারের ব্যবস্থা করা।
  • সড়কে চাঁদাবাজি বন্ধ করা।
  • চালকদের বেতন ও কর্মঘণ্টা নির্ধারণ করা।
  • মানসম্মত সড়ক নির্মাণ ও নিয়মিত মেরামত নিশ্চিত করা।
  • নিয়মিত সড়ক নিরাপত্তা নিরীক্ষা করা।
  • পর্যাপ্ত রোড সাইন ও রোড মার্কিং স্থাপন করা।
  • যানবাহনের ফিটনেস সনদ দেওয়ার পদ্ধতি আধুনিকায়ন করা।
  • মেয়াদোত্তীর্ণ গণপরিবহন চলাচল বন্ধ করা।
  • বিআরটিএর সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং ট্রাফিক ট্রেনিং একাডেমি প্রতিষ্ঠা করা।

সংগঠনটির মতে, সমন্বিত গণপরিবহনব্যবস্থা, দক্ষ চালক, মানসম্মত সড়ক ও কার্যকর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে সড়ক দুর্ঘটনা কমানোর উদ্যোগ আরও কার্যকর হতে পারে।

১২ বছরে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ১ লাখ ২৫ হাজার, দাবি যাত্রী কল্যাণ সমিতির

সময় : ০১:১১:১৯ অপরাহ্ন, বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬

দেশে ২০১৪ সাল থেকে ২০২৬ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত ৭২ হাজার ৭৩৬টি সড়ক দুর্ঘটনায় ১ লাখ ২৫ হাজার ৪০৫ জন নিহত হয়েছেন। এসব দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন ১ লাখ ৭৬ হাজার ২৪৯ জন। সড়ক দুর্ঘটনা বৃদ্ধির জন্য বিগত সরকারের ভুলনীতি, রেল ও নৌপথ সংকুচিত করা এবং সড়কনির্ভর যাতায়াতব্যবস্থাকে দায়ী করেছে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি।

বুধবার (২১ অক্টোবর) জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস উপলক্ষে গণমাধ্যমে পাঠানো এক বার্তায় এসব তথ্য তুলে ধরেন সংগঠনটির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী।

সড়কনির্ভর যাতায়াতব্যবস্থাকে দায়ী করছে সংগঠনটি

মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, স্বাধীনতার আগে দেশের প্রধান যাতায়াতমাধ্যম ছিল নৌপথ এবং দ্বিতীয় অবস্থানে ছিল রেলপথ। নিরাপদ ও সাশ্রয়ী এই দুই মাধ্যমে তখন ৮০ শতাংশ মানুষের যাতায়াত হতো। অন্যদিকে সড়কপথে যাতায়াত করতেন ২০ শতাংশ মানুষ।

তার বক্তব্য অনুযায়ী, স্বাধীনতার পর রেল ও নৌপথ সংকুচিত করে একের পর এক সড়ক নির্মাণ ও সম্প্রসারণের ফলে মানুষের যাতায়াত সড়কনির্ভর হয়ে পড়েছে। এর প্রভাব পড়েছে সড়ক দুর্ঘটনার ওপরও।

তিনি বলেন, সড়ক খাতে অনিয়ম-দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা, পরিবহন খাতে চাঁদাবাজি, ফিটনেসবিহীন যানবাহন চলাচল, লাইসেন্সবিহীন ও অদক্ষ চালক, সড়ক নির্মাণে ত্রুটি, বেপরোয়া গতি এবং মাদক সেবন করে যানবাহন চালানোর মতো কারণে দুর্ঘটনা বাড়ছে।

চালকদের প্রশিক্ষণ ও যোগ্যতা যাচাইয়ে দুর্বলতা এবং অযোগ্য যানবাহনকে ফিটনেস সনদ দেওয়ার বিষয়টিও দুর্ঘটনার জন্য দায়ী বলে উল্লেখ করেন তিনি।

প্রকৃত হতাহতের সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে

বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির দাবি, গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য পর্যবেক্ষণ করে তারা দুর্ঘটনা ও হতাহতের এই পরিসংখ্যান পেয়েছে। তবে দেশের হাসপাতালগুলোর চিত্র অনুযায়ী, প্রকৃত হতাহতের সংখ্যা আরও কয়েক গুণ বেশি হতে পারে বলে মনে করে সংগঠনটি।

সংগঠনটির পর্যবেক্ষণে, মোটরসাইকেল, ব্যাটারিচালিত রিকশা ও সিএনজিচালিত অটোরিকশার বেপরোয়া বৃদ্ধি ও চলাচল, সড়কে ডিভাইডার না থাকা, গাছপালার কারণে বাঁকে দৃষ্টিসীমা বাধাগ্রস্ত হওয়া এবং মহাসড়কের নির্মাণত্রুটি দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ।

এ ছাড়া ট্রাফিক আইন অমান্য, উল্টোপথে যানবাহন চলাচল, সড়কে চাঁদাবাজি, পণ্যবাহী যানে যাত্রী পরিবহন, অতিরিক্ত যাত্রী বহন, ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং এবং চালকদের বিরামহীনভাবে গাড়ি চালানোর কারণে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে বলে জানিয়েছে সংগঠনটি।

উন্নত গণপরিবহনের অভাবেও বাড়ছে ঝুঁকি

যাত্রী কল্যাণ সমিতির অভিযোগ, উন্নত গণপরিবহন ও সমন্বিত যাতায়াতব্যবস্থার অভাবে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা, রাইডশেয়ারিং মোটরসাইকেল, সিএনজিচালিত অটোরিকশা, নসিমন-করিমন ও লেগুনাসহ বিভিন্ন যানবাহনের ওপর মানুষের নির্ভরতা বেড়েছে।

সংগঠনটির মতে, এসব যানবাহনের ওপর নির্ভরতা বৃদ্ধির ফলে সড়কে যানজট ও দুর্ঘটনা—দুটিই বাড়ছে।

সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে যাত্রী কল্যাণ সমিতির সুপারিশ

সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষকে (বিআরটিএ) দেশি-বিদেশি পরিবহন বিশেষজ্ঞদের তত্ত্বাবধানে পরিচালনার সুপারিশ করেছে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি।

এ ছাড়া প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক বাস নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা এবং প্রযুক্তিনির্ভর সড়ক নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা চালুর ওপর গুরুত্ব দিয়েছে সংগঠনটি।

সুপারিশগুলোর মধ্যে আরও রয়েছে—

  • চালকদের উন্নত প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং যথাযথ প্রক্রিয়ায় লাইসেন্স প্রদান।
  • গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়কে ফুটপাত ও সার্ভিস লেন নির্মাণ।
  • পথচারীদের নিরাপদে সড়ক পারাপারের ব্যবস্থা করা।
  • সড়কে চাঁদাবাজি বন্ধ করা।
  • চালকদের বেতন ও কর্মঘণ্টা নির্ধারণ করা।
  • মানসম্মত সড়ক নির্মাণ ও নিয়মিত মেরামত নিশ্চিত করা।
  • নিয়মিত সড়ক নিরাপত্তা নিরীক্ষা করা।
  • পর্যাপ্ত রোড সাইন ও রোড মার্কিং স্থাপন করা।
  • যানবাহনের ফিটনেস সনদ দেওয়ার পদ্ধতি আধুনিকায়ন করা।
  • মেয়াদোত্তীর্ণ গণপরিবহন চলাচল বন্ধ করা।
  • বিআরটিএর সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং ট্রাফিক ট্রেনিং একাডেমি প্রতিষ্ঠা করা।

সংগঠনটির মতে, সমন্বিত গণপরিবহনব্যবস্থা, দক্ষ চালক, মানসম্মত সড়ক ও কার্যকর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে সড়ক দুর্ঘটনা কমানোর উদ্যোগ আরও কার্যকর হতে পারে।