সৌদিতে আগুনে নিহত ৭ বাংলাদেশির মরদেহ দেশে ফিরল, ঋণের বোঝায় দিশেহারা পরিবার
নওগাঁ প্রতিনিধি: সৌদি আরবের রিয়াদে সোফা তৈরির কারখানায় ভয়াবহ আগুনে পুড়ে মারা যাওয়ার প্রায় পৌনে তিন মাস পর নওগাঁর পাঁচজনসহ সাত বাংলাদেশির মরদেহ দেশে ফিরেছে। শনিবার (৩১ অক্টোবর) বিকেল থেকে সন্ধ্যার মধ্যে মরদেহগুলো একে একে নিহতদের গ্রামের বাড়িতে পৌঁছালে শোকাবহ পরিবেশের সৃষ্টি হয়। স্বজনদের আহাজারি ও কান্নায় ভারী হয়ে ওঠে চারপাশের পরিবেশ।
এর আগে শনিবার সকালে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটে মরদেহগুলো হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আনা হয়। প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া শেষে মরদেহগুলো স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। পরে সেগুলো নিয়ে নিহতদের গ্রামের বাড়ি নওগাঁ ও নাটোরের উদ্দেশে রওনা হন স্বজনেরা।
গত ৯ আগস্ট রিয়াদের একটি সোফা কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে মোট ১৬ জন বাংলাদেশি নিহত হন। তাদের মধ্যে ১২ জনের বাড়ি নওগাঁ জেলায়। ঘটনার পর গত ২৭ আগস্ট প্রথম দফায় নওগাঁর সাতজনের মরদেহ দেশে আনা সম্ভব হয়। তবে আগুনে পুড়ে চেহারা বিকৃত হয়ে যাওয়ায় বাকিদের পরিচয় শনাক্ত করতে জটিলতা তৈরি হয়। দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া ও ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর প্রায় পৌনে তিন মাসের মাথায় বাকি সাতজনের মরদেহ দেশে ফেরানো হলো। শনিবার সন্ধ্যায় নিজ নিজ গ্রামে জানাজা শেষে তাদের দাফন সম্পন্ন হয়।
ডিএনএ পরীক্ষায় শনাক্ত হওয়া নওগাঁর পাঁচজন হলেন—নওগাঁ পৌরসভার পার-নওগাঁ এলাকার শাহিন, আত্রাই উপজেলার ডুবাই গ্রামের হাসিবুল হাসান শুভ, মধ্যবোয়ালিয়া গ্রামের মিনহাজ প্রামাণিক, মাধবপুর গ্রামের মাসিদুল সরদার সজিব এবং সাধনগর গ্রামের সাগর আলী। এ ছাড়া নাটোরের নলডাঙ্গা উপজেলার দিঘীরপাড়া গ্রামের মোহাম্মদ শামীম ও খাজুরা গ্রামের সাব্বির হোসেনের মরদেহও একই সঙ্গে দেশে ফেরানো হয়েছে।
নিহতদের প্রায় প্রত্যেকেই ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। অভাব-অনটনের সংসারে সচ্ছলতা ফেরাতে ভিটেমাটি বন্ধক রেখে ও চড়া সুদে ঋণ নিয়ে তারা সৌদি আরবে পাড়ি জমিয়েছিলেন। স্বজনদের চোখে ছিল সুখের দিনের স্বপ্ন। কিন্তু সেই স্বপ্ন এক মুহূর্তে শেষ হয়ে গেছে। প্রবাস থেকে কফিনে ফিরেছেন তারা, আর পরিবারের সদস্যদের কাঁধে রয়ে গেছে ঋণের বোঝা।
নওগাঁ পৌরসভার পার-নওগাঁ, আত্রাই উপজেলার মাধবপুর, সাধনগর ও মধ্যবোয়ালিয়া গ্রাম ঘুরে দেখা যায়, গ্রামের মেঠোপথ ধরে একে একে লাশবাহী অ্যাম্বুলেন্স প্রবেশ করছিল। অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেনে স্তব্ধ হয়ে পড়ছিল পুরো এলাকা। যে পথ দিয়ে একদিন প্রবাসফেরত স্বজনদের হাসিমুখে ঘরে ফেরার কথা ছিল, সেই পথ দিয়েই ফিরল তাদের নিথর দেহ। অ্যাম্বুলেন্স থামতেই প্রিয়জনের শেষ মুখটি দেখতে ছুটে আসেন স্বজন ও এলাকার মানুষ। তাদের হৃদয়বিদারক আহাজারিতে শোকের আবহ ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে।
পার-নওগাঁ এলাকার নিহত শাহিনের মা নার্গিস বেগম বিলাপ করতে করতে বলেন, ‘তিন মাস আগে এনজিও থেকে ৫ লাখ ৭০ হাজার টাকা ঋণ করে ছেলেকে বিদেশ পাঠিয়েছিলাম। আগুনে আমাদের সব শেষ হয়ে গেল। শাহিনের ছোট ছোট দুটি সন্তান, ওরা এখন কী খাবে? এত টাকা ঋণ কীভাবে শোধ করব?’
আত্রাইয়ের মধ্যবোয়ালিয়া গ্রামের মিনহাজের মা পারুল বিবি কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘ছেলে বলত—আম্মু, কারখানায় কাজ পেয়েছি, দুই বছর পর বাড়ি আসব। আজ ছেলে ফিরে এল, কিন্তু নিথর দেহে।’
ছেলেকে হারিয়ে দিশেহারা মিনহাজের বাবা মজনু সরদার বলেন, ‘ভাবছিলাম জীবনের শেষ বয়সে ছেলে সুখের দিন আনবে। তা না হয়ে এই বয়সে নিজের হাতে ছেলের কফিন নামাতে হলো। এই শোক সহ্য করার ক্ষমতা আমার নেই।’
একই অবস্থা সাধনগর গ্রামের নিহত সাগর আলীর পরিবারেও। সাড়ে ছয় লাখ টাকা ঋণ করে স্বামীকে বিদেশে পাঠিয়েছিলেন স্ত্রী পারভীন খাতুন। তিনি বলেন, ‘ঘরে দুটি অবুঝ বাচ্চা, ঋণের এক টাকাও শোধ হয়নি। ওদের নিয়ে এখন আমি কোথায় গিয়ে দাঁড়াব?’
আত্রাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মনিরুজ্জামান জানান, নিহতদের দাফন-কাফনের জন্য আপাতত পরিবারপ্রতি ৩৫ হাজার টাকা করে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে। তিন মাস পর সরকারিভাবে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে তিন লাখ টাকা করে অনুদান দেওয়া হবে।
নওগাঁর জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম জানান, সম্পূর্ণ সরকারি ব্যবস্থাপনায় ও বিনামূল্যে মরদেহগুলো নিহতদের বাড়িতে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর প্রতি জেলা প্রশাসনের সব ধরনের সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে।









