০৭:৫৩ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬, ৩০ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

চট্টগ্রামে প্রথম বিয়ের তথ্য গোপন, স্ত্রী হত্যার রহস্য উদ্‌ঘাটন করল পিবিআই

নিউজ ডেস্ক

জান্নাতুল ফেরদৌস হত্যা মামলার তদন্তে দুইজনকে গ্রেপ্তার ও হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত সাম্পান নৌকা জব্দের কথা জানিয়েছে পিবিআই চট্টগ্রাম মেট্রো।

চট্টগ্রাম প্রতিনিধি: দ্বিতীয় বিয়ের সময় প্রথম বিয়ের তথ্য গোপন করেছিলেন স্বামী রাজা মিয়া ওরফে রাজু। বিষয়টি জানার পর স্ত্রী জান্নাতুল ফেরদৌসের (২৮) সঙ্গে তার বিরোধ শুরু হয়। একপর্যায়ে স্ত্রীকে হত্যার পরিকল্পনা করেন তিনি। বেড়ানোর কথা বলে সাম্পান নৌকায় তুলে শিকলবাহা খালে নিয়ে সহযোগীদের সহায়তায় জান্নাতুলকে হত্যার পর তার মরদেহ বস্তাবন্দি করে ফেলে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে স্বামী ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে।

ঘটনার প্রায় আড়াই মাস পর এ হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্‌ঘাটনের কথা জানিয়েছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) চট্টগ্রাম মেট্রো ইউনিট। বুধবার (১৪ অক্টোবর) পিবিআই চট্টগ্রাম মেট্রোর পুলিশ সুপার এম কে এইচ জাহাঙ্গীর হোসেন এ তথ্য জানান।

পিবিআই সূত্রে জানা গেছে, জান্নাতুল ফেরদৌস চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার শিলকূপ ইউনিয়নের বাসিন্দা ছিলেন। তিনি একটি জুতার কারখানায় চাকরি করতেন। সাত বছর বয়সী মেয়েকে নিয়ে চান্দগাঁও থানাধীন বাহির সিগন্যালের ব্যাপারীপাড়ায় একটি ভাড়া বাসায় দ্বিতীয় স্বামী রাজা মিয়ার সঙ্গে বসবাস করতেন।

প্রথম স্বামীর সঙ্গে বিবাহবিচ্ছেদের পর ২০২৫ সালের ৪ সেপ্টেম্বর রাজা মিয়াকে বিয়ে করেন জান্নাতুল। বিয়ের সময় রাজা মিয়া নিজেকে অবিবাহিত বলে পরিচয় দেন। তবে বিয়ের কিছুদিন পর জান্নাতুল জানতে পারেন, তার স্বামীর প্রথম স্ত্রী রয়েছেন। এ নিয়ে দুজনের মধ্যে বিরোধ সৃষ্টি হয়।

যেভাবে হত্যার পরিকল্পনা

তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, স্ত্রীকে হত্যার পরিকল্পনা করে রাজা মিয়া তার পূর্বপরিচিত মো. মুসলিম উদ্দিনের সঙ্গে পরামর্শ করেন। পরে তারা কালুরঘাট সেতু এলাকার এক কবিরাজের মাধ্যমে ঝাড়ফুঁক ও তান্ত্রিক পদ্ধতির আশ্রয় নেন। এতে সমাধান না হওয়ায় জান্নাতুলকে হত্যার পরিকল্পনা করেন তারা বলে তদন্তে উঠে এসেছে।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, গত ২৮ জুলাই সন্ধ্যা ৬টার দিকে বেড়ানোর কথা বলে জান্নাতুলকে কর্ণফুলী নদীর অন্য পাড়ে ব্রিজঘাট এলাকায় নিয়ে যান রাজা মিয়া। সেখানে আগে থেকেই মুসলিম উদ্দিন, রাজা মিয়ার প্রথম স্ত্রীর ভাই শুকুর আহম্মদ এবং অজ্ঞাতনামা আরেক ব্যক্তি সাম্পান নৌকা নিয়ে অপেক্ষা করছিলেন। পরে জান্নাতুলকে নিয়ে তারা নৌকায় ওঠেন। নৌকাটি কর্ণফুলী সেতুর নিচ দিয়ে শিকলবাহা খালে প্রবেশ করে।

পিবিআইয়ের তথ্য অনুযায়ী, রাত ৮টার পর নৌকায় রাজা মিয়ার সঙ্গে জান্নাতুলের বাকবিতণ্ডা হয়। একপর্যায়ে তিনি জান্নাতুলের মুঠোফোন কেড়ে নিয়ে খালে ফেলে দেন। এরপর তার মুখ চেপে ধরেন। এ সময় পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী এক সহযোগী নৌকায় রাখা ব্যাগ থেকে রশি ও বস্তা বের করেন।

তদন্তে বলা হয়েছে, রশি দিয়ে জান্নাতুলের গলা পেঁচিয়ে ধরার পর তার মৃত্যু হয়। পরে হাত-পা বেঁধে বস্তাবন্দি করে মরদেহটি কর্ণফুলী থানাধীন কালারপোল এলাকায় এস আলম কোল্ড রোল্ড স্টিলস লিমিটেডের পেছনের অংশে শিকলবাহা খালে ফেলে দেওয়া হয়।

যেভাবে সামনে আসে হত্যার ঘটনা

হত্যাকাণ্ডের পর আসামিরা নৌকাটি নিয়ে ব্রিজঘাট এলাকায় ফিরে যান। পরে তারা আত্মগোপনে চলে যান। ২ আগস্ট দুপুর ১২টার দিকে শিকলবাহা বিদ্যুৎকেন্দ্রের লঞ্চঘাটসংলগ্ন খালে ভাসমান অবস্থায় বস্তাবন্দি ও হাত-পা বাঁধা এক নারীর মরদেহ উদ্ধার করে সদরঘাট নৌ-পুলিশ।

পরিবারের সদস্যরা মরদেহটি নিখোঁজ জান্নাতুল ফেরদৌসের বলে শনাক্ত করেন। এ ঘটনায় তার মা ছায়রা খাতুন বাদী হয়ে রাজা মিয়া ওরফে রাজু এবং অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে কর্ণফুলী থানায় হত্যা মামলা করেন।

দুইজন গ্রেপ্তার, নৌকা জব্দ

গত ৬ অক্টোবর মামলাটির তদন্তভার গ্রহণ করে পিবিআই চট্টগ্রাম মেট্রো ইউনিট। পুলিশ সুপারের তত্ত্বাবধান ও নির্দেশনায় মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা উপপরিদর্শক আব্দুর রহিম তথ্যপ্রযুক্তি ও গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান চালান।

এরপর গত ১৩ অক্টোবর টেকনাফ থানা এলাকায় আত্মগোপনে থাকা মো. মুসলিম উদ্দিনকে (৩৯) গ্রেপ্তার করা হয়। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে শুকুর আহম্মদকে (২৪) গ্রেপ্তার করা হয়। এ ছাড়া হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত সাম্পান নৌকাটিও উদ্ধার করে জব্দ করা হয়েছে।

পিবিআই চট্টগ্রাম মেট্রোর পুলিশ সুপার এম কে এইচ জাহাঙ্গীর হোসেন জানান, ১৪ অক্টোবর মুসলিম উদ্দিন আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। এতে তিনি নিজের সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করে হত্যাকাণ্ডের বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছেন বলে জানান তিনি।

গ্রেপ্তার শুকুর আহম্মদকে পুলিশ হেফাজতে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। মামলাটির তদন্ত এখনো চলমান রয়েছে।

চট্টগ্রামে প্রথম বিয়ের তথ্য গোপন, স্ত্রী হত্যার রহস্য উদ্‌ঘাটন করল পিবিআই

সময় : ০২:২৮:১৩ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬

চট্টগ্রাম প্রতিনিধি: দ্বিতীয় বিয়ের সময় প্রথম বিয়ের তথ্য গোপন করেছিলেন স্বামী রাজা মিয়া ওরফে রাজু। বিষয়টি জানার পর স্ত্রী জান্নাতুল ফেরদৌসের (২৮) সঙ্গে তার বিরোধ শুরু হয়। একপর্যায়ে স্ত্রীকে হত্যার পরিকল্পনা করেন তিনি। বেড়ানোর কথা বলে সাম্পান নৌকায় তুলে শিকলবাহা খালে নিয়ে সহযোগীদের সহায়তায় জান্নাতুলকে হত্যার পর তার মরদেহ বস্তাবন্দি করে ফেলে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে স্বামী ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে।

ঘটনার প্রায় আড়াই মাস পর এ হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্‌ঘাটনের কথা জানিয়েছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) চট্টগ্রাম মেট্রো ইউনিট। বুধবার (১৪ অক্টোবর) পিবিআই চট্টগ্রাম মেট্রোর পুলিশ সুপার এম কে এইচ জাহাঙ্গীর হোসেন এ তথ্য জানান।

পিবিআই সূত্রে জানা গেছে, জান্নাতুল ফেরদৌস চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার শিলকূপ ইউনিয়নের বাসিন্দা ছিলেন। তিনি একটি জুতার কারখানায় চাকরি করতেন। সাত বছর বয়সী মেয়েকে নিয়ে চান্দগাঁও থানাধীন বাহির সিগন্যালের ব্যাপারীপাড়ায় একটি ভাড়া বাসায় দ্বিতীয় স্বামী রাজা মিয়ার সঙ্গে বসবাস করতেন।

প্রথম স্বামীর সঙ্গে বিবাহবিচ্ছেদের পর ২০২৫ সালের ৪ সেপ্টেম্বর রাজা মিয়াকে বিয়ে করেন জান্নাতুল। বিয়ের সময় রাজা মিয়া নিজেকে অবিবাহিত বলে পরিচয় দেন। তবে বিয়ের কিছুদিন পর জান্নাতুল জানতে পারেন, তার স্বামীর প্রথম স্ত্রী রয়েছেন। এ নিয়ে দুজনের মধ্যে বিরোধ সৃষ্টি হয়।

যেভাবে হত্যার পরিকল্পনা

তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, স্ত্রীকে হত্যার পরিকল্পনা করে রাজা মিয়া তার পূর্বপরিচিত মো. মুসলিম উদ্দিনের সঙ্গে পরামর্শ করেন। পরে তারা কালুরঘাট সেতু এলাকার এক কবিরাজের মাধ্যমে ঝাড়ফুঁক ও তান্ত্রিক পদ্ধতির আশ্রয় নেন। এতে সমাধান না হওয়ায় জান্নাতুলকে হত্যার পরিকল্পনা করেন তারা বলে তদন্তে উঠে এসেছে।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, গত ২৮ জুলাই সন্ধ্যা ৬টার দিকে বেড়ানোর কথা বলে জান্নাতুলকে কর্ণফুলী নদীর অন্য পাড়ে ব্রিজঘাট এলাকায় নিয়ে যান রাজা মিয়া। সেখানে আগে থেকেই মুসলিম উদ্দিন, রাজা মিয়ার প্রথম স্ত্রীর ভাই শুকুর আহম্মদ এবং অজ্ঞাতনামা আরেক ব্যক্তি সাম্পান নৌকা নিয়ে অপেক্ষা করছিলেন। পরে জান্নাতুলকে নিয়ে তারা নৌকায় ওঠেন। নৌকাটি কর্ণফুলী সেতুর নিচ দিয়ে শিকলবাহা খালে প্রবেশ করে।

পিবিআইয়ের তথ্য অনুযায়ী, রাত ৮টার পর নৌকায় রাজা মিয়ার সঙ্গে জান্নাতুলের বাকবিতণ্ডা হয়। একপর্যায়ে তিনি জান্নাতুলের মুঠোফোন কেড়ে নিয়ে খালে ফেলে দেন। এরপর তার মুখ চেপে ধরেন। এ সময় পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী এক সহযোগী নৌকায় রাখা ব্যাগ থেকে রশি ও বস্তা বের করেন।

তদন্তে বলা হয়েছে, রশি দিয়ে জান্নাতুলের গলা পেঁচিয়ে ধরার পর তার মৃত্যু হয়। পরে হাত-পা বেঁধে বস্তাবন্দি করে মরদেহটি কর্ণফুলী থানাধীন কালারপোল এলাকায় এস আলম কোল্ড রোল্ড স্টিলস লিমিটেডের পেছনের অংশে শিকলবাহা খালে ফেলে দেওয়া হয়।

যেভাবে সামনে আসে হত্যার ঘটনা

হত্যাকাণ্ডের পর আসামিরা নৌকাটি নিয়ে ব্রিজঘাট এলাকায় ফিরে যান। পরে তারা আত্মগোপনে চলে যান। ২ আগস্ট দুপুর ১২টার দিকে শিকলবাহা বিদ্যুৎকেন্দ্রের লঞ্চঘাটসংলগ্ন খালে ভাসমান অবস্থায় বস্তাবন্দি ও হাত-পা বাঁধা এক নারীর মরদেহ উদ্ধার করে সদরঘাট নৌ-পুলিশ।

পরিবারের সদস্যরা মরদেহটি নিখোঁজ জান্নাতুল ফেরদৌসের বলে শনাক্ত করেন। এ ঘটনায় তার মা ছায়রা খাতুন বাদী হয়ে রাজা মিয়া ওরফে রাজু এবং অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে কর্ণফুলী থানায় হত্যা মামলা করেন।

দুইজন গ্রেপ্তার, নৌকা জব্দ

গত ৬ অক্টোবর মামলাটির তদন্তভার গ্রহণ করে পিবিআই চট্টগ্রাম মেট্রো ইউনিট। পুলিশ সুপারের তত্ত্বাবধান ও নির্দেশনায় মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা উপপরিদর্শক আব্দুর রহিম তথ্যপ্রযুক্তি ও গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান চালান।

এরপর গত ১৩ অক্টোবর টেকনাফ থানা এলাকায় আত্মগোপনে থাকা মো. মুসলিম উদ্দিনকে (৩৯) গ্রেপ্তার করা হয়। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে শুকুর আহম্মদকে (২৪) গ্রেপ্তার করা হয়। এ ছাড়া হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত সাম্পান নৌকাটিও উদ্ধার করে জব্দ করা হয়েছে।

পিবিআই চট্টগ্রাম মেট্রোর পুলিশ সুপার এম কে এইচ জাহাঙ্গীর হোসেন জানান, ১৪ অক্টোবর মুসলিম উদ্দিন আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। এতে তিনি নিজের সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করে হত্যাকাণ্ডের বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছেন বলে জানান তিনি।

গ্রেপ্তার শুকুর আহম্মদকে পুলিশ হেফাজতে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। মামলাটির তদন্ত এখনো চলমান রয়েছে।