গাইবান্ধায় বাড়ছে ডেঙ্গু, মশারি ছাড়াই হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন রোগীরা
গাইবান্ধা জেনারেল হাসপাতালে শয্যাসংকটের মধ্যে মশারি ছাড়াই চিকিৎসা নিচ্ছেন ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীদের অনেকে।
গাইবান্ধা প্রতিনিধি: ঢাকা বা আশপাশের এলাকা থেকে আক্রান্ত হয়ে আসার পাশাপাশি গাইবান্ধাতেও বাড়ছে ডেঙ্গুর সংক্রমণ। এতে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। এর মধ্যে গাইবান্ধা জেনারেল হাসপাতালে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীদের অনেকেই মশারি ছাড়াই চিকিৎসা নিচ্ছেন। শয্যাসংকটের কারণে রোগীদের করিডোর, বারান্দা ও মেঝেতে থাকতে হচ্ছে। একই সঙ্গে ডেঙ্গু রোগীদের আলাদা করে চিকিৎসা দেওয়াও কঠিন হয়ে পড়েছে।
গাইবান্ধা সিভিল সার্জন কার্যালয়, জেনারেল হাসপাতাল ও সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, রোববার (২৫ অক্টোবর) গত ২৪ ঘণ্টায় জেলার সরকারি চিকিৎসাকেন্দ্রগুলোতে নতুন করে ৪৩ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্যে গাইবান্ধা জেনারেল হাসপাতালে নতুন ৭ জনসহ মোট ৩১ জন ভর্তি রয়েছেন। তাদের মধ্যে বেশ কয়েকজন গাইবান্ধাতেই আক্রান্ত হয়েছেন।
এ ছাড়া সাঘাটা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ৭ জন এবং পলাশবাড়ী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ৫ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি রয়েছেন।
চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত জেলায় ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫৮৯ জনে। এ সময়ে ডেঙ্গুতে একজনের মৃত্যুও হয়েছে। তবে এ হিসাব শুধু সরকারি হাসপাতাল ও চিকিৎসাকেন্দ্রে চিকিৎসা নেওয়া রোগীদের। স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর ধারণা, বাস্তবে আক্রান্তের সংখ্যা আরও বেশি।
মশারি ছাড়াই চিকিৎসা নিচ্ছেন ডেঙ্গু রোগীরা
সরেজমিনে রোববার দুপুরে গাইবান্ধা জেনারেল হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের সঙ্গে একই ওয়ার্ডে মশারি ছাড়াই চিকিৎসা নিচ্ছেন ডেঙ্গু রোগীরা। তারা বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকায় সহজে শনাক্ত করা যাচ্ছে না। এমনকি দায়িত্বে থাকা নার্সদের পক্ষেও তাদের অবস্থান নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ছে। এতে হাসপাতালের ভেতরেও ডেঙ্গু সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
গাইবান্ধা জেনারেল হাসপাতালে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ভর্তি থাকা রোগীদের মধ্যে পুরুষ ওয়ার্ডে ২২ জন, মহিলা ওয়ার্ডে ৮ জন এবং শিশু ওয়ার্ডে একজন রয়েছেন। মোট ৩১ জন রোগীর মধ্যে কয়েকজনকে খুঁজে পেতে নার্সদের সহায়তা নিতে হয়েছে।
যাদের পাওয়া গেছে, তাদের মধ্যে ছকিনা (৫০), রোমানা (২০), সাদিয়া (২৩), আনিসুর রহমান (৪৫), আব্দুর রশিদ (৩২), ছন্দা (৩৫) ও রায়হান (৮) রয়েছেন। তারা সবাই গাইবান্ধায় আক্রান্ত হয়েছেন বলে জানা গেছে। তাদের মধ্যে আব্দুর রশিদ ছাড়া অন্য কারও মশারি টানানো দেখা যায়নি। কারও কাছে মশারি ছিল না, আবার কারও কাছে থাকলেও তা টানানো হয়নি।
হাসপাতালের মূল ফটক থেকে ভেতরে ঢুকতেই মেঝেতে শয্যা পেতে চিকিৎসা নিতে দেখা যায় বল্লমঝাড় ইউনিয়নের খোলাবাড়ি গ্রামের বস্তা ব্যবসায়ী আব্দুর রশিদকে। গত বুধবার পরীক্ষায় তার ডেঙ্গু শনাক্ত হয়। পরদিন বৃহস্পতিবার হাসপাতালে ভর্তি হন তিনি।
মহিলা ওয়ার্ডের ২৩ নম্বর বেডে চিকিৎসা নিচ্ছেন সদর উপজেলার বোয়ালী ইউনিয়নের খামার বোয়ালী গ্রামের রোমানা খাতুন (২০)। গত ১০ অক্টোবর থেকে অসুস্থ থাকার পর ২০ অক্টোবর পরীক্ষায় তার ডেঙ্গু শনাক্ত হয়। ওইদিন দুপুরে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
অন্যদিকে, শিশু ওয়ার্ডের ৪ নম্বর বেডে চিকিৎসা নিচ্ছে সুন্দরগঞ্জ উপজেলার ধর্মপুরের ধোপাডাঙ্গার পোড়া গ্রামের ৮ বছর বয়সী শিশু রায়হান। গত ২০ অক্টোবর রাতে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
রোমানা খাতুনের মা রায়হানা বেগম বলেন, গত মঙ্গলবার পরীক্ষায় তার মেয়ের ডেঙ্গু শনাক্ত হয়। এর আগে ১০ দিন ধরে হাসপাতালে ভর্তি থেকে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে রোমানাকে। তিনি অভিযোগ করেন, তার মেয়ের শারীরিক অবস্থার তেমন উন্নতি বোঝা যাচ্ছে না। গত শুক্রবার ও শনিবার তাকে কোনো স্যালাইন বা ইনজেকশন দেওয়া হয়নি বলেও দাবি করেন তিনি।
আব্দুর রশিদের শাশুড়ি কামরুন্নাহার বলেন, গত বুধবার পরীক্ষায় তার জামাতার ডেঙ্গু শনাক্ত হয়। পরদিন বৃহস্পতিবার বিকেলে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এর ৪-৫ দিন আগে সাধারণ জ্বরের চিকিৎসা নেওয়া হয়েছিল। তিনি বাড়িতেই ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন।
শিশু রায়হানের দাদি মোর্শেদা বেগম বলেন, মঙ্গলবার রাত ৮টার দিকে রায়হানকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। সেদিন দুপুরে তার ডেঙ্গু শনাক্ত হয়। এখন সে অনেকটা ভালো আছে। মশারি না থাকার বিষয়ে তিনি জানান, বাড়িতে মশারি রেখে এসেছেন। সঙ্গে আনার কথা মনে ছিল না। হাসপাতাল থেকে মশারি দেওয়া হয় কি না, সে বিষয়েও তিনি জানতেন না।
ঢাকায় আক্রান্ত রোগীও মশারি ছাড়া
অন্যদিকে, ঢাকায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়া সদর উপজেলার পুলিশ লাইন্স এলাকার রাশেদা বেগমকে মহিলা ওয়ার্ডের মেঝেতে চিকিৎসা নিতে দেখা যায়। নার্সদের ভর্তি রেকর্ডে তার অবস্থান এক্সট্রা-৩ নম্বর বেডে উল্লেখ থাকলেও তিনি ছিলেন ওয়ার্ডের ২২ নম্বর বেডের স্থানে। সেখানে আবার ২২ নম্বর বেডটিও ছিল না। তার কাছেও মশারি দেখা যায়নি।
ডেঙ্গু রোগীদের সঙ্গে একই ওয়ার্ডে চিকিৎসা নিতে বাধ্য হওয়া সাধারণ রোগীদের মধ্যেও আতঙ্ক ও উৎকণ্ঠা দেখা গেছে। কেউ কেউ ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
শিশু ওয়ার্ডের ৪ নম্বর বেডে ডেঙ্গু আক্রান্ত রায়হানের পাশের ৩ নম্বর বেডে চিকিৎসা নিচ্ছে ৫ মাস বয়সী শিশু আয়ান। সর্দি-কাশি নিয়ে রোববার দুপুরে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
আয়ানের মা শাকিলা বেগম বলেন, তাদের পাশেই ডেঙ্গু রোগী রয়েছেন, অথচ তাদের মশারি নেই। এতে হাসপাতালে এসে আতঙ্ক আরও বেড়েছে। তিনি ডেঙ্গু আক্রান্ত সব রোগীর জন্য মশারি নিশ্চিত করার দাবি জানান।
বেসরকারি একটি এনজিওতে কর্মরত সিরাজ উদ্দিন বলেন, এতদিন তিনি শুধু ঢাকা ও বিভিন্ন এলাকার ডেঙ্গু আক্রান্তের খবর জানতেন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে গাইবান্ধাতেও ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে, যা উদ্বেগের কারণ। বিশেষ করে শিশু সন্তানদের নিয়ে তারা আতঙ্কে রয়েছেন।
১০০ শয্যার হাসপাতালে ভর্তি ৩৯৩ রোগী
হাসপাতালের মহিলা ওয়ার্ডে দায়িত্বে থাকা নার্স ফারহানা খাতুন বলেন, রোগীরা সুযোগ পেলেই বেডে উঠে যাচ্ছেন এবং নিজের ইচ্ছামতো স্থান পরিবর্তন করছেন। তাদের এভাবে স্থান বদলানোর কারণে কে কোথায় আছেন, তা সহজে বলা যাচ্ছে না।
হাসপাতালের নার্সিং ইনচার্জ স্বপ্না রানী বলেন, রোববার হাসপাতালে মোট ৩৯৩ জন রোগী ভর্তি ছিলেন। অথচ হাসপাতালটি ১০০ শয্যার। শয্যাসংকটের কারণে রোগীদের করিডোর, বারান্দা ও মেঝেতে শয্যা পেতে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে।
তিনি জানান, মশারি থাকলেও অনেক ক্ষেত্রে তা টানানোর সুযোগ নেই। আবার ওয়ার্ডে থাকা রোগীরাও নানা অজুহাতে মশারি টানাতে চান না।
গাইবান্ধা জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) আসিফ রহমান ঢাকা পোস্টকে বলেন, হাসপাতালের অবকাঠামোগত সংকটের কারণে ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও কাঙ্ক্ষিত সেবা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। নতুন ভবন থাকলেও জনবল ও অন্যান্য সমস্যার কারণে সেটি পুরোপুরি চালু করা যাচ্ছে না। একই কারণে জরুরি হলেও ডেঙ্গু রোগীদের জন্য আলাদা ওয়ার্ড করা সম্ভব হচ্ছে না। তবে তারা আন্তরিকভাবে চিকিৎসাসেবা দেওয়ার চেষ্টা করছেন।
ফুলছড়ি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জুনিয়র কনসালটেন্ট পদের বিপরীতে অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর ডা. তানভীর রহমান কল্লোল ডেঙ্গু প্রসঙ্গে বলেন, সারা দেশেই ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ছে। হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীদের অবশ্যই আলাদা রাখতে হবে এবং মশারি নিশ্চিত করতে হবে।
তিনি বলেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধে সচেতনতা অত্যন্ত জরুরি। বাসাবাড়ির আশপাশের ঝোপঝাড় পরিষ্কার করতে হবে এবং যেসব পাত্রে পানি জমে থাকতে পারে, সেগুলো অপসারণ করতে হবে।
গাইবান্ধার সিভিল সার্জন ডা. রফিকুজ্জামান ঢাকা পোস্টকে বলেন, এসব রোগের ঝুঁকি সবারই রয়েছে। হাম ও ডেঙ্গু রোগীদের আলাদা বিভাগে রাখতে অধিদপ্তরের নির্দেশনা রয়েছে। জনসচেতনতায় বিভিন্ন কর্মসূচিও অব্যাহত রয়েছে।


















