০৪:২৮ অপরাহ্ন, বুধবার, ২২ জুলাই ২০২৬, ৭ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

রূপপুর পারমাণবিক প্রকল্পে ২৯ হাজার কোটি টাকার অনিয়মের অডিট আপত্তি, প্রশ্নে ক্রয়প্রক্রিয়া

নিউজ ডেস্ক

রূপপুর প্রকল্পে ব্যয়, ক্রয়প্রক্রিয়া ও তদারকি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে বিশেষ নিরীক্ষা।

রূপপুর প্রকল্পে বড় অঙ্কের অডিট আপত্তি

দেশের সবচেয়ে ব্যয়বহুল মেগা প্রকল্প রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পে সরকারি মূল্যের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি দামে যন্ত্রপাতি কেনার অভিযোগ উঠেছে।

বৈদেশিক সাহায্যপুষ্ট প্রকল্প অডিট অধিদপ্তরের (ফাপাড) বিশেষ নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মাত্র ২৭ কোটি টাকার বৈদ্যুতিক সরঞ্জামের বিপরীতে বিল পরিশোধ করা হয়েছে ২১৩ কোটি ৮৮ লাখ টাকা।

একই সঙ্গে ২০১৬-১৭ থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছর পর্যন্ত প্রকল্পের প্রায় ৯৪ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের মধ্যে ২৯ হাজার ৬০০ কোটি টাকার আর্থিক অনিয়মের অডিট আপত্তি পাওয়া গেছে।

প্রকল্প বাস্তবায়ন নিয়েও প্রশ্ন

শুধু অর্থ ব্যয় নয়, প্রকল্পের অগ্রগতি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি)।

পরিদর্শন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরুর হালনাগাদ কর্মপরিকল্পনা প্রকল্প কার্যালয়ে পাওয়া যায়নি।

এ ছাড়া অসমাপ্ত কাজের পূর্ণাঙ্গ তালিকাও সংরক্ষণ করা হয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

১ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার প্রকল্প

দুই ইউনিটে ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নিয়ে ২০১৬ সালের জুলাইয়ে রূপপুর প্রকল্পের কাজ শুরু হয়।

প্রথমে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে কাজ শেষ করার পরিকল্পনা থাকলেও পরে প্রকল্পের মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়েছে।

প্রকল্পের মূল অনুমোদিত ব্যয় ছিল ১ লাখ ১৩ হাজার কোটি টাকার বেশি। পরে ২২ শতাংশ ব্যয় বাড়িয়ে তা প্রায় ১ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা করা হয়।

২৩০টি অডিট আপত্তি

ফাপাডের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৬-১৭ থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছর পর্যন্ত মোট ২৩০টি অডিট আপত্তি তোলা হয়েছে।

এসব আপত্তির আর্থিক মূল্য প্রায় ২৯ হাজার ৬০০ কোটি টাকা।

সবচেয়ে বেশি অডিট আপত্তি উঠেছে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে। ওই সময়ে ১৬ হাজার ৬৪৮ কোটি টাকা ব্যয়ের বিপরীতে প্রায় ১৫ হাজার ২০৭ কোটি টাকার অনিয়মের অভিযোগ করা হয়েছে।

গ্রিন সিটি আবাসনে সবচেয়ে বেশি অভিযোগ

রূপপুর প্রকল্পের আওতায় নির্মিত গ্রিন সিটি আবাসন এলাকায় সবচেয়ে বেশি অনিয়মের তথ্য পাওয়া গেছে।

রাশিয়ার বিশেষজ্ঞ ও কর্মকর্তাদের জন্য নির্মিত এই আবাসন প্রকল্পকে ঘিরে ২৩০টি অডিট আপত্তির মধ্যে ১২০টি আপত্তি করা হয়েছে।

এসব অভিযোগের বড় অংশ নির্মাণকাজ, যন্ত্রপাতি, আসবাব কেনা এবং অতিরিক্ত বিল পরিশোধসংক্রান্ত।

২৭ কোটি টাকার সরঞ্জামে বিল ২১৩ কোটি

নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গ্রিন সিটির ১১টি ভবনের বৈদ্যুতিক উপকেন্দ্রের সরঞ্জাম ও জেনারেটর কেনায় সরকারি মূল্যের তুলনায় অতিরিক্ত অর্থ পরিশোধ করা হয়েছে।

এসব সরঞ্জামের সরকারি মূল্য ছিল প্রায় ২৭ কোটি টাকা।

কিন্তু একই সরঞ্জামের জন্য বিল পরিশোধ করা হয়েছে ২১৩ কোটি ৮৮ লাখ টাকা।

অর্থাৎ শুধু এই খাতেই অতিরিক্ত ব্যয়ের পরিমাণ প্রায় ১৮৭ কোটি টাকা।

আলোচিত বালিশ কেনাকাণ্ড

রূপপুর প্রকল্পের আলোচিত বালিশ কেনাকাণ্ডও বিশেষ নিরীক্ষায় উঠে এসেছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রকল্পে ৪ হাজার ৭০২টি বালিশ কেনা হয়।

এর মধ্যে ৬০টি বালিশের প্রতিটির দাম ধরা হয় ৮৯ হাজার ৯০০ টাকা।

বালিশগুলোর প্রকৃত মূল্য ছিল ১ কোটি ৪৮ লাখ টাকা। তবে কেনা হয় ৫ কোটি ৪১ লাখ টাকায়।

এতে সরকারের প্রায় ৩ কোটি ৯২ লাখ টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কর্মপরিকল্পনা নিয়েও প্রশ্ন

আইএমইডির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চুক্তি অনুযায়ী রাশিয়ার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান অ্যাটমস্ট্রয় এক্সপোর্টের প্রতিবছর প্রকল্প বাস্তবায়নের কর্মপরিকল্পনা দেওয়ার কথা থাকলেও ২০১২ সালের ডিসেম্বরের পর আর কোনো হালনাগাদ পরিকল্পনা জমা দেওয়া হয়নি।

এ বিষয়ে প্রকল্প কার্যালয় থেকে একাধিকবার তাগাদা দেওয়া হলেও নতুন কর্মপরিকল্পনা পাওয়া যায়নি বলে জানানো হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ

সাবেক পরিকল্পনা সচিব মো. মামুন আল রশিদ বলেন, এত বড় অঙ্কের অডিট আপত্তি প্রকল্প বাস্তবায়নে বিধিগত দুর্বলতার ইঙ্গিত দেয়।

তার মতে, সরকারি ক্রয় আইন (পিপিএ) ও সরকারি ক্রয় বিধিমালা (পিপিআর) যথাযথভাবে অনুসরণ করা হলে এমন পরিস্থিতি তৈরি হতো না।

তিনি আরও বলেন, প্রকল্প তদারকি ও সুপারভিশন ব্যবস্থাতেও দুর্বলতার বিষয়টি সামনে এসেছে।

তদন্ত ও জবাবদিহির দাবি

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) পক্ষ থেকেও প্রকল্পের অনিয়মের বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।

সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, নিরীক্ষায় উঠে আসা অনিয়মের যথাযথ তদন্ত করে দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনা প্রয়োজন।

একই সঙ্গে প্রকল্পের বাকি কাজ বাস্তবায়নের প্রতিটি ধাপে দুর্নীতি প্রতিরোধ ব্যবস্থা নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়েছে।

রূপপুর পারমাণবিক প্রকল্পে ২৯ হাজার কোটি টাকার অনিয়মের অডিট আপত্তি, প্রশ্নে ক্রয়প্রক্রিয়া

সময় : ০৩:১৭:৪৮ অপরাহ্ন, বুধবার, ২২ জুলাই ২০২৬

রূপপুর প্রকল্পে বড় অঙ্কের অডিট আপত্তি

দেশের সবচেয়ে ব্যয়বহুল মেগা প্রকল্প রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পে সরকারি মূল্যের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি দামে যন্ত্রপাতি কেনার অভিযোগ উঠেছে।

বৈদেশিক সাহায্যপুষ্ট প্রকল্প অডিট অধিদপ্তরের (ফাপাড) বিশেষ নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মাত্র ২৭ কোটি টাকার বৈদ্যুতিক সরঞ্জামের বিপরীতে বিল পরিশোধ করা হয়েছে ২১৩ কোটি ৮৮ লাখ টাকা।

একই সঙ্গে ২০১৬-১৭ থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছর পর্যন্ত প্রকল্পের প্রায় ৯৪ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের মধ্যে ২৯ হাজার ৬০০ কোটি টাকার আর্থিক অনিয়মের অডিট আপত্তি পাওয়া গেছে।

প্রকল্প বাস্তবায়ন নিয়েও প্রশ্ন

শুধু অর্থ ব্যয় নয়, প্রকল্পের অগ্রগতি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি)।

পরিদর্শন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরুর হালনাগাদ কর্মপরিকল্পনা প্রকল্প কার্যালয়ে পাওয়া যায়নি।

এ ছাড়া অসমাপ্ত কাজের পূর্ণাঙ্গ তালিকাও সংরক্ষণ করা হয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

১ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার প্রকল্প

দুই ইউনিটে ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নিয়ে ২০১৬ সালের জুলাইয়ে রূপপুর প্রকল্পের কাজ শুরু হয়।

প্রথমে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে কাজ শেষ করার পরিকল্পনা থাকলেও পরে প্রকল্পের মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়েছে।

প্রকল্পের মূল অনুমোদিত ব্যয় ছিল ১ লাখ ১৩ হাজার কোটি টাকার বেশি। পরে ২২ শতাংশ ব্যয় বাড়িয়ে তা প্রায় ১ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা করা হয়।

২৩০টি অডিট আপত্তি

ফাপাডের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৬-১৭ থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছর পর্যন্ত মোট ২৩০টি অডিট আপত্তি তোলা হয়েছে।

এসব আপত্তির আর্থিক মূল্য প্রায় ২৯ হাজার ৬০০ কোটি টাকা।

সবচেয়ে বেশি অডিট আপত্তি উঠেছে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে। ওই সময়ে ১৬ হাজার ৬৪৮ কোটি টাকা ব্যয়ের বিপরীতে প্রায় ১৫ হাজার ২০৭ কোটি টাকার অনিয়মের অভিযোগ করা হয়েছে।

গ্রিন সিটি আবাসনে সবচেয়ে বেশি অভিযোগ

রূপপুর প্রকল্পের আওতায় নির্মিত গ্রিন সিটি আবাসন এলাকায় সবচেয়ে বেশি অনিয়মের তথ্য পাওয়া গেছে।

রাশিয়ার বিশেষজ্ঞ ও কর্মকর্তাদের জন্য নির্মিত এই আবাসন প্রকল্পকে ঘিরে ২৩০টি অডিট আপত্তির মধ্যে ১২০টি আপত্তি করা হয়েছে।

এসব অভিযোগের বড় অংশ নির্মাণকাজ, যন্ত্রপাতি, আসবাব কেনা এবং অতিরিক্ত বিল পরিশোধসংক্রান্ত।

২৭ কোটি টাকার সরঞ্জামে বিল ২১৩ কোটি

নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গ্রিন সিটির ১১টি ভবনের বৈদ্যুতিক উপকেন্দ্রের সরঞ্জাম ও জেনারেটর কেনায় সরকারি মূল্যের তুলনায় অতিরিক্ত অর্থ পরিশোধ করা হয়েছে।

এসব সরঞ্জামের সরকারি মূল্য ছিল প্রায় ২৭ কোটি টাকা।

কিন্তু একই সরঞ্জামের জন্য বিল পরিশোধ করা হয়েছে ২১৩ কোটি ৮৮ লাখ টাকা।

অর্থাৎ শুধু এই খাতেই অতিরিক্ত ব্যয়ের পরিমাণ প্রায় ১৮৭ কোটি টাকা।

আলোচিত বালিশ কেনাকাণ্ড

রূপপুর প্রকল্পের আলোচিত বালিশ কেনাকাণ্ডও বিশেষ নিরীক্ষায় উঠে এসেছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রকল্পে ৪ হাজার ৭০২টি বালিশ কেনা হয়।

এর মধ্যে ৬০টি বালিশের প্রতিটির দাম ধরা হয় ৮৯ হাজার ৯০০ টাকা।

বালিশগুলোর প্রকৃত মূল্য ছিল ১ কোটি ৪৮ লাখ টাকা। তবে কেনা হয় ৫ কোটি ৪১ লাখ টাকায়।

এতে সরকারের প্রায় ৩ কোটি ৯২ লাখ টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কর্মপরিকল্পনা নিয়েও প্রশ্ন

আইএমইডির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চুক্তি অনুযায়ী রাশিয়ার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান অ্যাটমস্ট্রয় এক্সপোর্টের প্রতিবছর প্রকল্প বাস্তবায়নের কর্মপরিকল্পনা দেওয়ার কথা থাকলেও ২০১২ সালের ডিসেম্বরের পর আর কোনো হালনাগাদ পরিকল্পনা জমা দেওয়া হয়নি।

এ বিষয়ে প্রকল্প কার্যালয় থেকে একাধিকবার তাগাদা দেওয়া হলেও নতুন কর্মপরিকল্পনা পাওয়া যায়নি বলে জানানো হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ

সাবেক পরিকল্পনা সচিব মো. মামুন আল রশিদ বলেন, এত বড় অঙ্কের অডিট আপত্তি প্রকল্প বাস্তবায়নে বিধিগত দুর্বলতার ইঙ্গিত দেয়।

তার মতে, সরকারি ক্রয় আইন (পিপিএ) ও সরকারি ক্রয় বিধিমালা (পিপিআর) যথাযথভাবে অনুসরণ করা হলে এমন পরিস্থিতি তৈরি হতো না।

তিনি আরও বলেন, প্রকল্প তদারকি ও সুপারভিশন ব্যবস্থাতেও দুর্বলতার বিষয়টি সামনে এসেছে।

তদন্ত ও জবাবদিহির দাবি

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) পক্ষ থেকেও প্রকল্পের অনিয়মের বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।

সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, নিরীক্ষায় উঠে আসা অনিয়মের যথাযথ তদন্ত করে দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনা প্রয়োজন।

একই সঙ্গে প্রকল্পের বাকি কাজ বাস্তবায়নের প্রতিটি ধাপে দুর্নীতি প্রতিরোধ ব্যবস্থা নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়েছে।