০৫:৫৪ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৯ অগাস্ট ২০২৬, ৪ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

র‍্যাব বিলুপ্ত করে এসআরবি, থাকছে পুরোনো কাঠামো ও বিস্তৃত ক্ষমতা

নিউজ ডেস্ক

র‍্যাব বিলুপ্ত করে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন বা এসআরবি নামে নতুন ইউনিট গঠনের খসড়া অনুমোদন করেছে মন্ত্রিসভা।

গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা ও গোপন বন্দিশালা পরিচালনার মতো গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ রয়েছে র‍্যাবের বিরুদ্ধে। জাতিসংঘ, গুম–সংক্রান্ত তদন্ত কমিশনসহ বিভিন্ন মহল থেকে বাহিনীটি বিলুপ্ত করার দাবি ও সুপারিশও এসেছিল। এমনকি জাতীয় নির্বাচনের আগে বিএনপিও র‍্যাব বিলুপ্তির দাবি জানিয়েছিল। তবে র‍্যাবকে পুরোপুরি বিলুপ্ত না করে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন বা এসআরবি নামে নতুন কাঠামোয় রাখার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

গত সোমবার মন্ত্রিসভার বৈঠকে ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) আইন, ২০২৬’-এর খসড়া লেজিসলেটিভ ও সংসদবিষয়ক বিভাগের ভেটিং সাপেক্ষে নীতিগত ও চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়। সরকারের তথ্যবিবরণীতে বলা হয়েছে, বিদ্যমান র‍্যাব বিলুপ্ত করে পুলিশ বাহিনীর আওতায় এসআরবি নামে একটি বিশেষায়িত ইউনিট প্রতিষ্ঠা করা হবে।

মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত আইনের খসড়া পর্যালোচনায় দেখা গেছে, কাগজে র‍্যাব বিলুপ্ত হলেও বাহিনীটির প্রাতিষ্ঠানিক ধারাবাহিকতার বড় অংশই নতুন ইউনিটে থাকছে। র‍্যাবের বর্তমান জনবল, ক্ষমতা, কর্তৃত্ব, সুবিধা, তহবিল, সম্পত্তি, হিসাব, নথি ও অন্যান্য সম্পদ এসআরবিতে চলে যাবে। র‍্যাবের কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও নতুন ইউনিটের সদস্য হিসেবে গণ্য হবেন।

র‍্যাবের দায়দায়িত্ব, চুক্তি এবং পক্ষে বা বিপক্ষে চলমান মামলাও এসআরবির নামে চলবে। ফলে বাহিনীটি ভেঙে সম্পূর্ণ নতুন কাঠামো তৈরির বদলে মূলত নতুন নাম ও পৃথক আইনি ভিত্তিতে র‍্যাবের কার্যক্রম অব্যাহত রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

একই সঙ্গে নতুন ইউনিটকে ফৌজদারি অপরাধ তদন্ত, তল্লাশি, গ্রেপ্তার ও জব্দের ক্ষমতা দেওয়ার পাশাপাশি নিজস্ব হাজতখানা, মালখানা ও জিজ্ঞাসাবাদ কক্ষ রাখার বিধানও রাখা হয়েছে।

রাষ্ট্রের প্রয়োজনে নতুন বাহিনী দরকার

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, র‍্যাবের পুরোনো কাঠামো রেখে শুধু নাম পরিবর্তন করা হচ্ছে—বিষয়টি এমন নয়। তাঁর ভাষ্য, নাগরিকদের অভিযোগ এবং বাহিনীর সদস্যদের অভ্যন্তরীণ অভিযোগ নিষ্পত্তির জন্য আইনের মধ্যেই কমিটি রাখার বিধান করা হয়েছে। সদস্যদের কোন কোন কাজ শৃঙ্খলাভঙ্গ হিসেবে গণ্য হবে এবং কীভাবে ব্যবস্থা নেওয়া হবে, সেসব বিষয়ও আইনে নির্দিষ্ট করা হয়েছে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মতে, র‍্যাবের ক্ষেত্রে আগে জবাবদিহি ও স্বচ্ছতার ঘাটতি ছিল। নতুন আইনে সেই জায়গাগুলোতে পরিবর্তন আনা হয়েছে।

বিএনপিসহ বিভিন্ন মহল থেকে র‍্যাব বিলুপ্তির দাবি উঠলেও কেন অন্য নামে বাহিনীটি রাখা হচ্ছে—এমন প্রশ্নের জবাবে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, র‍্যাব বিলুপ্ত করা হচ্ছে এবং এসআরবি একটি নতুন ব্যাটালিয়ন। রাষ্ট্রের প্রয়োজনে মানবাধিকার সমুন্নত রেখে এমন বাহিনী প্রয়োজন। সাইবার অপরাধ, মাদক ও সংঘবদ্ধ অপরাধসহ নতুন ধরনের অপরাধ মোকাবিলায় বিশেষ প্রশিক্ষণ, সরঞ্জাম, জনবল ও সক্ষমতা দরকার বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

সশস্ত্র বাহিনী থেকে সদস্য নেওয়ার সুযোগ বহাল রাখার বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আগে জবাবদিহি ও স্বচ্ছতা ছিল না এবং রাজনৈতিক সরকার বাহিনীটিকে যেভাবে চেয়েছে, সেভাবে ব্যবহার করেছে। তাঁর দাবি, এখন সরকার চাইলেই তাদের সেভাবে ব্যবহার করতে পারবে না।

তবে প্রস্তাবিত আইনটি সমর্থনযোগ্য নয় বলে মনে করেন মানবাধিকারকর্মী মো. নূর খান। তাঁর মতে, সরকার র‍্যাব বিলুপ্ত করে এসআরবি করার কথা বললেও এখানে মৌলিকভাবে নতুন কিছু নেই। পুরোনো কাঠামো ও ক্ষমতা বহাল থাকলে এসআরবি আরেকটি ভয়ংকর বাহিনী হিসেবে সামনে আসতে পারে।

র‍্যাবের প্রায় সবই যাবে এসআরবিতে

মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত খসড়ায় ২৭টি ধারা রয়েছে। এর ২৬ ধারাতেই র‍্যাব রহিত করার পাশাপাশি নতুন ইউনিটে তার ধারাবাহিকতা কীভাবে থাকবে, তা বিস্তারিত বলা হয়েছে।

আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (সংশোধনী) আইন, ২০০৩-এর মাধ্যমে র‍্যাব গঠন করা হয়েছিল। নতুন এসআরবি আইনের খসড়া অনুযায়ী, আইনটি কার্যকর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে যে সংশোধনী আইনের মাধ্যমে র‍্যাব গঠন করা হয়েছিল, সেটি রহিত হবে।

তবে র‍্যাবের সব সম্পদ, অধিকার, ক্ষমতা, কর্তৃত্ব, সুবিধা, তহবিল, নগদ ও ব্যাংকে রাখা অর্থ, দায়, স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি, হিসাব বই, রেজিস্টার, রেকর্ড ও অন্যান্য সম্পদ এসআরবিতে স্থানান্তরিত হবে।

র‍্যাবে বর্তমানে কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও এসআরবির সদস্য হবেন। তাঁদের চাকরির শর্ত পরিবর্তন না হওয়া পর্যন্ত আগের শর্তেই তাঁরা কাজ করবেন।

র‍্যাবের সব দায়দায়িত্ব এবং তাদের করা বা তাদের সঙ্গে করা চুক্তিও এসআরবির দায় ও চুক্তি হিসেবে গণ্য হবে। র‍্যাবের পক্ষে বা বিপক্ষে আদালতে চলমান মামলা বা অন্য আইনি কার্যক্রমও এসআরবির নামে অব্যাহত থাকবে। একইভাবে র‍্যাব সদস্যদের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলা বা আইনি কার্যক্রম শুধু বাহিনীর নাম পরিবর্তনের কারণে বাতিল হবে না।

বিদ্যমান আইনে র‍্যাব সদস্যদের ‘সৎ উদ্দেশ্যে’ করা কাজের জন্য যে দায়মুক্তির বিধান রয়েছে, এসআরবি আইনের খসড়ায় সে ধরনের কোনো দায়মুক্তির ধারা রাখা হয়নি। নতুন বিধি না হওয়া পর্যন্ত র‍্যাবের বিদ্যমান বিভাগীয় কার্যধারা ও শৃঙ্খলাসংক্রান্ত বিধিও প্রয়োজনীয় সংশোধনসহ নতুন ইউনিটে বহাল থাকবে।

বহু বাহিনীর পুরোনো কাঠামোও থাকছে

র‍্যাবের কাঠামো নিয়ে সমালোচনার অন্যতম বিষয় ছিল সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষার কাজে ব্যবহার। গুম–সংক্রান্ত তদন্ত কমিশন ও মানবাধিকারকর্মীদের পক্ষ থেকে নতুন কোনো বিশেষায়িত বাহিনী গঠন করা হলে সেটি শুধু প্রশিক্ষিত পুলিশ সদস্যদের নিয়ে করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল।

তবে মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত খসড়ায় সেই সুপারিশ প্রতিফলিত হয়নি।

এসআরবি বাংলাদেশ পুলিশের অধীন একটি বিশেষায়িত ইউনিট হবে। এর মহাপরিচালক হবেন পুলিশে কর্মরত অতিরিক্ত পুলিশ মহাপরিদর্শক পদমর্যাদার একজন কর্মকর্তা। তবে প্রয়োজন অনুযায়ী পুলিশের পাশাপাশি সশস্ত্র বাহিনী ও অন্যান্য শৃঙ্খলা বাহিনী থেকে কর্মকর্তা ও সদস্যদের প্রেষণ বা অস্থায়ীভাবে সংযুক্ত করার সুযোগ রাখা হয়েছে খসড়ার ৪(৩) ধারায়।

খসড়ায় ‘শৃঙ্খলা বাহিনী’ বলতে সংবিধানের ১৫২ অনুচ্ছেদে ব্যবহৃত অর্থে সশস্ত্র বাহিনীকে বোঝানো হয়েছে। অর্থাৎ সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীর সদস্যদের এসআরবিতে নেওয়ার আইনি সুযোগ থাকছে।

গুম–সংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের সভাপতির দায়িত্ব পালন করা বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী বলেছেন, তাঁদের কমিশনের সুপারিশ ছিল র‍্যাব বিলুপ্ত করে কোনো বিশেষায়িত বাহিনী রাখা হলে সেটি শুধু পুলিশ সদস্যদের নিয়ে গঠন করতে হবে। সেখানে সেনা, নৌ, বিমানবাহিনী বা অন্য কোনো বাহিনীর সদস্য রাখা উচিত নয়।

ক্ষমতা কমছে না, তদন্তও করবে

নতুন ইউনিটের দায়িত্বের পরিধিও বিস্তৃত রাখা হয়েছে। দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা রক্ষা, গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, বেআইনি অস্ত্র-গোলাবারুদ ও বিস্ফোরক উদ্ধার, মাদক উদ্ধার, সাইবার অপরাধ দমন, মানব পাচার ও সংঘবদ্ধ অপরাধ দমনের দায়িত্ব থাকবে এসআরবির।

নারী ও শিশু নির্যাতন, ধর্ষণ, পাচার ও অপরাধমূলক মানবতাবিরোধী কাজে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া এবং সন্ত্রাসী কার্যক্রম ও অন্যান্য অপরাধ দমনে কাজ করবে নতুন ইউনিটটি। পাশাপাশি অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সহায়তা এবং আদালত, সরকার বা পুলিশ মহাপরিদর্শকের নির্দেশে মামলা দায়ের ও তদন্তের দায়িত্বও দেওয়া হয়েছে।

অনুমোদিত খসড়ার ১২ ধারা অনুযায়ী, নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে পরোয়ানা ছাড়াই কোনো স্থানে প্রবেশ, তল্লাশি, জব্দ ও গ্রেপ্তার করতে পারবে এসআরবি। মাদক, অস্ত্র, বিস্ফোরক, সন্ত্রাসী সংগঠন বা আশ্রয়স্থল, মানব পাচার, সংঘবদ্ধ অপরাধ, সাইবার অপরাধ এবং রাষ্ট্রের নিরাপত্তাবিরোধী অপরাধের ক্ষেত্রে এই ক্ষমতা প্রয়োগ করা যাবে।

সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে এসআরবির কর্মকর্তারা তদন্তকারী পুলিশ কর্মকর্তার ক্ষমতাও প্রয়োগ করতে পারবেন।

আগে শুধু সরকার র‍্যাবকে তদন্তের নির্দেশ দিতে পারত। নতুন খসড়া অনুযায়ী, আদালত, সরকার বা পুলিশ মহাপরিদর্শক যেকোনো সময় এসআরবির মহাপরিচালককে কোনো ফৌজদারি অপরাধ তদন্তের নির্দেশ দিতে পারবেন। মহাপরিচালক পুলিশের উপপরিদর্শক বা তার ওপরের পদমর্যাদার কর্মকর্তাকে তদন্তের দায়িত্ব দিতে পারবেন।

হাজতখানা ও জিজ্ঞাসাবাদ কক্ষ নিয়ে প্রশ্ন

এসআরবির নিজস্ব হাজতখানা, মালখানা ও জিজ্ঞাসাবাদ কক্ষ রাখার বিধান রাখা হয়েছে। খসড়ায় বলা হয়েছে, তদন্তকাজ পরিচালনার প্রয়োজনে এসব স্থাপনা থাকবে এবং মামলা আদালতে পাঠানো বা অভিযোগপত্র দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রচলিত বিধি অনুসরণ করতে হবে।

খসড়ার ১৪ ধারা বলছে, গ্রেপ্তার ব্যক্তিকে ‘অনতিবিলম্বে’ নিকটবর্তী থানার হেফাজতে দিতে হবে। আবার ১৫(৪) ধারায় এসআরবির নিজস্ব হাজতখানা ও জিজ্ঞাসাবাদ কক্ষ থাকার কথা বলা হয়েছে। ফলে এই দুই বিধান পাশাপাশি কীভাবে কার্যকর হবে—কাকে, কোন পরিস্থিতিতে এবং কত সময় এসআরবির হাজতে রাখা যাবে—তা খসড়ায় স্পষ্ট নয়।

র‍্যাবের অতীত কর্মকাণ্ডের কারণে বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর র‍্যাবের বিরুদ্ধে গোপন বন্দিশালা, বেআইনি আটক ও নির্যাতনের অভিযোগ নতুন করে সামনে আসে।

গুম–সংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের হিসাবে, তাদের অনুসন্ধানে উঠে আসা গুমের ঘটনার প্রায় ২৫ শতাংশের সঙ্গে র‍্যাবের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে। কমিশন সারা দেশে যে ৪০টি গোপন বন্দিশালার সন্ধান পেয়েছিল, তার মধ্যে ২২ থেকে ২৩টি র‍্যাবের বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

২০২৪ সালের ১২ ডিসেম্বর র‍্যাবের তৎকালীন মহাপরিচালক এ কে এম শহিদুর রহমান বাহিনীটির অতীত কর্মকাণ্ডের জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমা চেয়েছিলেন। একই সঙ্গে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে র‍্যাবের গোপন বন্দিশালা থাকার কথাও তিনি স্বীকার করেছিলেন।

পাঁচ সদস্যের অভিযোগ কমিটি

নতুন আইনে র‍্যাবের তুলনায় একটি উল্লেখযোগ্য সংযোজন হচ্ছে ‘অভিযোগ প্রতিকার কমিটি’। নাগরিকদের করা অভিযোগ এবং এসআরবির সদস্যদের অভ্যন্তরীণ সংক্ষোভ নিষ্পত্তিতে পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি থাকবে।

তবে পাঁচ সদস্যের মধ্যে চারজনই হবেন সরকার, পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট ইউনিটের কর্মকর্তা। পঞ্চম সদস্য হবেন সরকার মনোনীত মানবাধিকার, আইন বা বিচার প্রশাসন বিষয়ে কমপক্ষে ১০ বছরের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন একজন ব্যক্তি।

অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার পর কমিটি সরাসরি শাস্তি দেওয়ার বদলে সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষের কাছে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করবে। ফলে কমিটি কতটা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারবে এবং এর সুপারিশ কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন থাকছে।

পুরোনো কাঠামোতেই কেন থাকবে

২০০৪ সালে বিএনপি সরকারের সময় পুলিশ, সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনী, তৎকালীন বিডিআর, কোস্টগার্ড ও আনসারের সদস্যদের সমন্বয়ে র‍্যাব গঠন করা হয়। শুরুতে শীর্ষ সন্ত্রাসী ও সংঘবদ্ধ অপরাধীদের বিরুদ্ধে অভিযানের কারণে বাহিনীটি আলোচনায় আসে। পরে গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা, নির্যাতন এবং রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত বিরোধে ব্যবহারের গুরুতর অভিযোগ ওঠে।

এরপর থেকেই র‍্যাব বিলুপ্তির দাবি জোরালো হয়। এবার সরকারের তথ্যবিবরণীতে নতুন আইনকে র‍্যাব বিলুপ্ত করে এসআরবি প্রতিষ্ঠার আইন হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, র‍্যাবের বর্তমান কাঠামো ও ক্ষমতা অক্ষুণ্ন রেখে নতুন নামে চালু করার সিদ্ধান্ত অনেকটা পুরোনো কাঠামোকেই নতুন আইনি ভিত্তি দেওয়ার মতো।

মানবাধিকারকর্মী নূর খানের মতে, একটি বাহিনীর বিরুদ্ধে যখন গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা ও অন্যান্য গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরে জমা হয়, তখন সেই বাহিনীকে নতুন নামে চালু করলে সমস্যার সমাধান হবে—এমন মনে করার কারণ নেই।

র‍্যাব বিলুপ্ত করে এসআরবি, থাকছে পুরোনো কাঠামো ও বিস্তৃত ক্ষমতা

সময় : ০১:০৮:৪০ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৯ অগাস্ট ২০২৬

গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা ও গোপন বন্দিশালা পরিচালনার মতো গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ রয়েছে র‍্যাবের বিরুদ্ধে। জাতিসংঘ, গুম–সংক্রান্ত তদন্ত কমিশনসহ বিভিন্ন মহল থেকে বাহিনীটি বিলুপ্ত করার দাবি ও সুপারিশও এসেছিল। এমনকি জাতীয় নির্বাচনের আগে বিএনপিও র‍্যাব বিলুপ্তির দাবি জানিয়েছিল। তবে র‍্যাবকে পুরোপুরি বিলুপ্ত না করে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন বা এসআরবি নামে নতুন কাঠামোয় রাখার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

গত সোমবার মন্ত্রিসভার বৈঠকে ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) আইন, ২০২৬’-এর খসড়া লেজিসলেটিভ ও সংসদবিষয়ক বিভাগের ভেটিং সাপেক্ষে নীতিগত ও চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়। সরকারের তথ্যবিবরণীতে বলা হয়েছে, বিদ্যমান র‍্যাব বিলুপ্ত করে পুলিশ বাহিনীর আওতায় এসআরবি নামে একটি বিশেষায়িত ইউনিট প্রতিষ্ঠা করা হবে।

মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত আইনের খসড়া পর্যালোচনায় দেখা গেছে, কাগজে র‍্যাব বিলুপ্ত হলেও বাহিনীটির প্রাতিষ্ঠানিক ধারাবাহিকতার বড় অংশই নতুন ইউনিটে থাকছে। র‍্যাবের বর্তমান জনবল, ক্ষমতা, কর্তৃত্ব, সুবিধা, তহবিল, সম্পত্তি, হিসাব, নথি ও অন্যান্য সম্পদ এসআরবিতে চলে যাবে। র‍্যাবের কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও নতুন ইউনিটের সদস্য হিসেবে গণ্য হবেন।

র‍্যাবের দায়দায়িত্ব, চুক্তি এবং পক্ষে বা বিপক্ষে চলমান মামলাও এসআরবির নামে চলবে। ফলে বাহিনীটি ভেঙে সম্পূর্ণ নতুন কাঠামো তৈরির বদলে মূলত নতুন নাম ও পৃথক আইনি ভিত্তিতে র‍্যাবের কার্যক্রম অব্যাহত রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

একই সঙ্গে নতুন ইউনিটকে ফৌজদারি অপরাধ তদন্ত, তল্লাশি, গ্রেপ্তার ও জব্দের ক্ষমতা দেওয়ার পাশাপাশি নিজস্ব হাজতখানা, মালখানা ও জিজ্ঞাসাবাদ কক্ষ রাখার বিধানও রাখা হয়েছে।

রাষ্ট্রের প্রয়োজনে নতুন বাহিনী দরকার

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, র‍্যাবের পুরোনো কাঠামো রেখে শুধু নাম পরিবর্তন করা হচ্ছে—বিষয়টি এমন নয়। তাঁর ভাষ্য, নাগরিকদের অভিযোগ এবং বাহিনীর সদস্যদের অভ্যন্তরীণ অভিযোগ নিষ্পত্তির জন্য আইনের মধ্যেই কমিটি রাখার বিধান করা হয়েছে। সদস্যদের কোন কোন কাজ শৃঙ্খলাভঙ্গ হিসেবে গণ্য হবে এবং কীভাবে ব্যবস্থা নেওয়া হবে, সেসব বিষয়ও আইনে নির্দিষ্ট করা হয়েছে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মতে, র‍্যাবের ক্ষেত্রে আগে জবাবদিহি ও স্বচ্ছতার ঘাটতি ছিল। নতুন আইনে সেই জায়গাগুলোতে পরিবর্তন আনা হয়েছে।

বিএনপিসহ বিভিন্ন মহল থেকে র‍্যাব বিলুপ্তির দাবি উঠলেও কেন অন্য নামে বাহিনীটি রাখা হচ্ছে—এমন প্রশ্নের জবাবে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, র‍্যাব বিলুপ্ত করা হচ্ছে এবং এসআরবি একটি নতুন ব্যাটালিয়ন। রাষ্ট্রের প্রয়োজনে মানবাধিকার সমুন্নত রেখে এমন বাহিনী প্রয়োজন। সাইবার অপরাধ, মাদক ও সংঘবদ্ধ অপরাধসহ নতুন ধরনের অপরাধ মোকাবিলায় বিশেষ প্রশিক্ষণ, সরঞ্জাম, জনবল ও সক্ষমতা দরকার বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

সশস্ত্র বাহিনী থেকে সদস্য নেওয়ার সুযোগ বহাল রাখার বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আগে জবাবদিহি ও স্বচ্ছতা ছিল না এবং রাজনৈতিক সরকার বাহিনীটিকে যেভাবে চেয়েছে, সেভাবে ব্যবহার করেছে। তাঁর দাবি, এখন সরকার চাইলেই তাদের সেভাবে ব্যবহার করতে পারবে না।

তবে প্রস্তাবিত আইনটি সমর্থনযোগ্য নয় বলে মনে করেন মানবাধিকারকর্মী মো. নূর খান। তাঁর মতে, সরকার র‍্যাব বিলুপ্ত করে এসআরবি করার কথা বললেও এখানে মৌলিকভাবে নতুন কিছু নেই। পুরোনো কাঠামো ও ক্ষমতা বহাল থাকলে এসআরবি আরেকটি ভয়ংকর বাহিনী হিসেবে সামনে আসতে পারে।

র‍্যাবের প্রায় সবই যাবে এসআরবিতে

মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত খসড়ায় ২৭টি ধারা রয়েছে। এর ২৬ ধারাতেই র‍্যাব রহিত করার পাশাপাশি নতুন ইউনিটে তার ধারাবাহিকতা কীভাবে থাকবে, তা বিস্তারিত বলা হয়েছে।

আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (সংশোধনী) আইন, ২০০৩-এর মাধ্যমে র‍্যাব গঠন করা হয়েছিল। নতুন এসআরবি আইনের খসড়া অনুযায়ী, আইনটি কার্যকর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে যে সংশোধনী আইনের মাধ্যমে র‍্যাব গঠন করা হয়েছিল, সেটি রহিত হবে।

তবে র‍্যাবের সব সম্পদ, অধিকার, ক্ষমতা, কর্তৃত্ব, সুবিধা, তহবিল, নগদ ও ব্যাংকে রাখা অর্থ, দায়, স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি, হিসাব বই, রেজিস্টার, রেকর্ড ও অন্যান্য সম্পদ এসআরবিতে স্থানান্তরিত হবে।

র‍্যাবে বর্তমানে কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও এসআরবির সদস্য হবেন। তাঁদের চাকরির শর্ত পরিবর্তন না হওয়া পর্যন্ত আগের শর্তেই তাঁরা কাজ করবেন।

র‍্যাবের সব দায়দায়িত্ব এবং তাদের করা বা তাদের সঙ্গে করা চুক্তিও এসআরবির দায় ও চুক্তি হিসেবে গণ্য হবে। র‍্যাবের পক্ষে বা বিপক্ষে আদালতে চলমান মামলা বা অন্য আইনি কার্যক্রমও এসআরবির নামে অব্যাহত থাকবে। একইভাবে র‍্যাব সদস্যদের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলা বা আইনি কার্যক্রম শুধু বাহিনীর নাম পরিবর্তনের কারণে বাতিল হবে না।

বিদ্যমান আইনে র‍্যাব সদস্যদের ‘সৎ উদ্দেশ্যে’ করা কাজের জন্য যে দায়মুক্তির বিধান রয়েছে, এসআরবি আইনের খসড়ায় সে ধরনের কোনো দায়মুক্তির ধারা রাখা হয়নি। নতুন বিধি না হওয়া পর্যন্ত র‍্যাবের বিদ্যমান বিভাগীয় কার্যধারা ও শৃঙ্খলাসংক্রান্ত বিধিও প্রয়োজনীয় সংশোধনসহ নতুন ইউনিটে বহাল থাকবে।

বহু বাহিনীর পুরোনো কাঠামোও থাকছে

র‍্যাবের কাঠামো নিয়ে সমালোচনার অন্যতম বিষয় ছিল সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষার কাজে ব্যবহার। গুম–সংক্রান্ত তদন্ত কমিশন ও মানবাধিকারকর্মীদের পক্ষ থেকে নতুন কোনো বিশেষায়িত বাহিনী গঠন করা হলে সেটি শুধু প্রশিক্ষিত পুলিশ সদস্যদের নিয়ে করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল।

তবে মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত খসড়ায় সেই সুপারিশ প্রতিফলিত হয়নি।

এসআরবি বাংলাদেশ পুলিশের অধীন একটি বিশেষায়িত ইউনিট হবে। এর মহাপরিচালক হবেন পুলিশে কর্মরত অতিরিক্ত পুলিশ মহাপরিদর্শক পদমর্যাদার একজন কর্মকর্তা। তবে প্রয়োজন অনুযায়ী পুলিশের পাশাপাশি সশস্ত্র বাহিনী ও অন্যান্য শৃঙ্খলা বাহিনী থেকে কর্মকর্তা ও সদস্যদের প্রেষণ বা অস্থায়ীভাবে সংযুক্ত করার সুযোগ রাখা হয়েছে খসড়ার ৪(৩) ধারায়।

খসড়ায় ‘শৃঙ্খলা বাহিনী’ বলতে সংবিধানের ১৫২ অনুচ্ছেদে ব্যবহৃত অর্থে সশস্ত্র বাহিনীকে বোঝানো হয়েছে। অর্থাৎ সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীর সদস্যদের এসআরবিতে নেওয়ার আইনি সুযোগ থাকছে।

গুম–সংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের সভাপতির দায়িত্ব পালন করা বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী বলেছেন, তাঁদের কমিশনের সুপারিশ ছিল র‍্যাব বিলুপ্ত করে কোনো বিশেষায়িত বাহিনী রাখা হলে সেটি শুধু পুলিশ সদস্যদের নিয়ে গঠন করতে হবে। সেখানে সেনা, নৌ, বিমানবাহিনী বা অন্য কোনো বাহিনীর সদস্য রাখা উচিত নয়।

ক্ষমতা কমছে না, তদন্তও করবে

নতুন ইউনিটের দায়িত্বের পরিধিও বিস্তৃত রাখা হয়েছে। দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা রক্ষা, গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, বেআইনি অস্ত্র-গোলাবারুদ ও বিস্ফোরক উদ্ধার, মাদক উদ্ধার, সাইবার অপরাধ দমন, মানব পাচার ও সংঘবদ্ধ অপরাধ দমনের দায়িত্ব থাকবে এসআরবির।

নারী ও শিশু নির্যাতন, ধর্ষণ, পাচার ও অপরাধমূলক মানবতাবিরোধী কাজে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া এবং সন্ত্রাসী কার্যক্রম ও অন্যান্য অপরাধ দমনে কাজ করবে নতুন ইউনিটটি। পাশাপাশি অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সহায়তা এবং আদালত, সরকার বা পুলিশ মহাপরিদর্শকের নির্দেশে মামলা দায়ের ও তদন্তের দায়িত্বও দেওয়া হয়েছে।

অনুমোদিত খসড়ার ১২ ধারা অনুযায়ী, নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে পরোয়ানা ছাড়াই কোনো স্থানে প্রবেশ, তল্লাশি, জব্দ ও গ্রেপ্তার করতে পারবে এসআরবি। মাদক, অস্ত্র, বিস্ফোরক, সন্ত্রাসী সংগঠন বা আশ্রয়স্থল, মানব পাচার, সংঘবদ্ধ অপরাধ, সাইবার অপরাধ এবং রাষ্ট্রের নিরাপত্তাবিরোধী অপরাধের ক্ষেত্রে এই ক্ষমতা প্রয়োগ করা যাবে।

সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে এসআরবির কর্মকর্তারা তদন্তকারী পুলিশ কর্মকর্তার ক্ষমতাও প্রয়োগ করতে পারবেন।

আগে শুধু সরকার র‍্যাবকে তদন্তের নির্দেশ দিতে পারত। নতুন খসড়া অনুযায়ী, আদালত, সরকার বা পুলিশ মহাপরিদর্শক যেকোনো সময় এসআরবির মহাপরিচালককে কোনো ফৌজদারি অপরাধ তদন্তের নির্দেশ দিতে পারবেন। মহাপরিচালক পুলিশের উপপরিদর্শক বা তার ওপরের পদমর্যাদার কর্মকর্তাকে তদন্তের দায়িত্ব দিতে পারবেন।

হাজতখানা ও জিজ্ঞাসাবাদ কক্ষ নিয়ে প্রশ্ন

এসআরবির নিজস্ব হাজতখানা, মালখানা ও জিজ্ঞাসাবাদ কক্ষ রাখার বিধান রাখা হয়েছে। খসড়ায় বলা হয়েছে, তদন্তকাজ পরিচালনার প্রয়োজনে এসব স্থাপনা থাকবে এবং মামলা আদালতে পাঠানো বা অভিযোগপত্র দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রচলিত বিধি অনুসরণ করতে হবে।

খসড়ার ১৪ ধারা বলছে, গ্রেপ্তার ব্যক্তিকে ‘অনতিবিলম্বে’ নিকটবর্তী থানার হেফাজতে দিতে হবে। আবার ১৫(৪) ধারায় এসআরবির নিজস্ব হাজতখানা ও জিজ্ঞাসাবাদ কক্ষ থাকার কথা বলা হয়েছে। ফলে এই দুই বিধান পাশাপাশি কীভাবে কার্যকর হবে—কাকে, কোন পরিস্থিতিতে এবং কত সময় এসআরবির হাজতে রাখা যাবে—তা খসড়ায় স্পষ্ট নয়।

র‍্যাবের অতীত কর্মকাণ্ডের কারণে বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর র‍্যাবের বিরুদ্ধে গোপন বন্দিশালা, বেআইনি আটক ও নির্যাতনের অভিযোগ নতুন করে সামনে আসে।

গুম–সংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের হিসাবে, তাদের অনুসন্ধানে উঠে আসা গুমের ঘটনার প্রায় ২৫ শতাংশের সঙ্গে র‍্যাবের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে। কমিশন সারা দেশে যে ৪০টি গোপন বন্দিশালার সন্ধান পেয়েছিল, তার মধ্যে ২২ থেকে ২৩টি র‍্যাবের বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

২০২৪ সালের ১২ ডিসেম্বর র‍্যাবের তৎকালীন মহাপরিচালক এ কে এম শহিদুর রহমান বাহিনীটির অতীত কর্মকাণ্ডের জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমা চেয়েছিলেন। একই সঙ্গে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে র‍্যাবের গোপন বন্দিশালা থাকার কথাও তিনি স্বীকার করেছিলেন।

পাঁচ সদস্যের অভিযোগ কমিটি

নতুন আইনে র‍্যাবের তুলনায় একটি উল্লেখযোগ্য সংযোজন হচ্ছে ‘অভিযোগ প্রতিকার কমিটি’। নাগরিকদের করা অভিযোগ এবং এসআরবির সদস্যদের অভ্যন্তরীণ সংক্ষোভ নিষ্পত্তিতে পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি থাকবে।

তবে পাঁচ সদস্যের মধ্যে চারজনই হবেন সরকার, পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট ইউনিটের কর্মকর্তা। পঞ্চম সদস্য হবেন সরকার মনোনীত মানবাধিকার, আইন বা বিচার প্রশাসন বিষয়ে কমপক্ষে ১০ বছরের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন একজন ব্যক্তি।

অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার পর কমিটি সরাসরি শাস্তি দেওয়ার বদলে সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষের কাছে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করবে। ফলে কমিটি কতটা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারবে এবং এর সুপারিশ কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন থাকছে।

পুরোনো কাঠামোতেই কেন থাকবে

২০০৪ সালে বিএনপি সরকারের সময় পুলিশ, সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনী, তৎকালীন বিডিআর, কোস্টগার্ড ও আনসারের সদস্যদের সমন্বয়ে র‍্যাব গঠন করা হয়। শুরুতে শীর্ষ সন্ত্রাসী ও সংঘবদ্ধ অপরাধীদের বিরুদ্ধে অভিযানের কারণে বাহিনীটি আলোচনায় আসে। পরে গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা, নির্যাতন এবং রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত বিরোধে ব্যবহারের গুরুতর অভিযোগ ওঠে।

এরপর থেকেই র‍্যাব বিলুপ্তির দাবি জোরালো হয়। এবার সরকারের তথ্যবিবরণীতে নতুন আইনকে র‍্যাব বিলুপ্ত করে এসআরবি প্রতিষ্ঠার আইন হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, র‍্যাবের বর্তমান কাঠামো ও ক্ষমতা অক্ষুণ্ন রেখে নতুন নামে চালু করার সিদ্ধান্ত অনেকটা পুরোনো কাঠামোকেই নতুন আইনি ভিত্তি দেওয়ার মতো।

মানবাধিকারকর্মী নূর খানের মতে, একটি বাহিনীর বিরুদ্ধে যখন গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা ও অন্যান্য গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরে জমা হয়, তখন সেই বাহিনীকে নতুন নামে চালু করলে সমস্যার সমাধান হবে—এমন মনে করার কারণ নেই।