০৬:২৭ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৪ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সেপটিক ট্যাংকের পাশে রেহানার লাশ পুঁতে সবজির চারা, চার্জশিটে ভয়াবহ তথ্য

নিউজ ডেস্ক

রেহানা পারভীন হত্যা মামলার চার্জশিটে সেপটিক ট্যাংকের পাশে মরদেহ পুঁতে রাখার তথ্য উঠে এসেছে।

ঢাকা প্রতিনিধি: সম্পত্তি ও পারিবারিক বিরোধের জেরে অস্ট্রেলিয়াপ্রবাসী বাংলাদেশি নারী রেহানা পারভীনকে হত্যার পর আশুলিয়ায় সেপটিক ট্যাংকের পাশে মাটিচাপা দিয়ে তার ওপর সবজির চারা লাগিয়ে লাশ গুম করা হয়েছিল বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে। হত্যাকাণ্ডের প্রায় দুই বছর পর তদন্ত শেষে আদালতে দেওয়া চার্জশিটে হত্যাকাণ্ড ও লাশ গুমের এমন বর্ণনা উঠে এসেছে।

ঢাকার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে রেহানার স্বামী আওলাদ হোসাইনসহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে এ চার্জশিট দাখিল করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা নবাবগঞ্জ থানার উপপরিদর্শক (এসআই) তানভীর হাসান খান।

চার্জশিটভুক্ত অন্য আসামিরা হলেন—আওলাদের দুই বোন পাপিয়া আক্তার ও মাকসুদা বেগম, চাচাতো ভাই কবীর হোসাইন এবং চাচা আমজাদ হোসাইন। ঢাকার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট তানভীর আহমেদ চার্জশিটটি দেখেছেন এবং আগামী ১৯ অক্টোবর এটি পর্যালোচনার পরবর্তী দিন ধার্য করেছেন।

যেভাবে হত্যার অভিযোগ

অভিযোগপত্রের বিবরণ অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৬ জুন ১৩ বছর বয়সী মেয়েকে নিয়ে অস্ট্রেলিয়া থেকে বাংলাদেশে আসেন রেহানা পারভীন। ২৯ জুন তার স্বামী আওলাদও দেশে ফেরেন। অস্ট্রেলিয়া ও বাংলাদেশে থাকা সম্পত্তি এবং পারিবারিক বিরোধকে কেন্দ্র করে রেহানাকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয় বলে চার্জশিটে উল্লেখ করা হয়েছে।

২০২৪ সালের ৫ জুলাই সন্ধ্যার পর রেহানাকে আশুলিয়ার নয়ারহাট চৌরাপাড়ায় আওলাদের বোন পাপিয়ার বাসায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তর্কাতর্কির একপর্যায়ে তাকে মেঝেতে ফেলে দেওয়া হয় বলে অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে।

চার্জশিট অনুযায়ী, আমজাদ রেহানার পা এবং কবীর দুই হাত চেপে ধরেন। এরপর আওলাদ তার পেটের ওপর বসে মুখে বালিশ চাপা দিয়ে শ্বাসরোধে হত্যা করেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

ওই রাতেই পাপিয়ার বাড়ির সামনে সেপটিক ট্যাংকের পাশে গর্ত খুঁড়ে রেহানার মরদেহ পুঁতে রাখা হয়। ঘটনা আড়াল করতে ওই জায়গায় সবজির চারা লাগানো হয়েছিল বলেও চার্জশিটে উল্লেখ রয়েছে।

নিখোঁজের পর উদ্ধার মরদেহ

রেহানা নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় তার মা আইরিন আক্তার মামলা করেন। পরে ১২ সেপ্টেম্বর আশুলিয়া থেকে মাটিচাপা দেওয়া অবস্থায় রেহানার মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এরপর মামলাটি অপহরণ থেকে হত্যা ও মরদেহ গুমের মামলায় রূপান্তর করা হয়।

এ ঘটনায় গ্রেপ্তার পাপিয়া, কবীর ও আমজাদ আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন বলে চার্জশিটে উল্লেখ করা হয়েছে। মামলায় রেহানার নাবালিকা মেয়েও তার বাবার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিয়েছে।

রেহানার মৃত্যুর বিষয়ে বাংলাদেশে তদন্ত চলার পাশাপাশি অস্ট্রেলিয়ান ফেডারেল পুলিশও তদন্ত করছে। ২০২৫ সালে অস্ট্রেলিয়ান ফেডারেল পুলিশ রেহানার মৃত্যুকে সন্দেহজনক হত্যাকাণ্ড হিসেবে তদন্ত করার কথা জানিয়েছিল।

অস্ট্রেলিয়ায় আওলাদ গ্রেপ্তার

হত্যাকাণ্ডের পর আওলাদ অস্ট্রেলিয়ায় ফিরে যান। সম্প্রতি অস্ট্রেলিয়ান ফেডারেল পুলিশ (এএফপি) তাকে ব্রিসবেনে গ্রেপ্তার করেছে। তবে সেখানে তার বিরুদ্ধে রেহানার মৃত্যুর ঘটনায় হত্যা মামলা হয়নি।

এএফপির অভিযোগ, বাংলাদেশের তদন্তে প্রভাব বিস্তার এবং নিজের নাম পুলিশি নথি থেকে বাদ দেওয়ার উদ্দেশ্যে আওলাদ দুই বছরে বাংলাদেশে পরিচিত ব্যক্তিদের কাছে ৯০ হাজার অস্ট্রেলিয়ান ডলারের বেশি অর্থ পাঠানোর চেষ্টা করেছেন। অস্ট্রেলীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এসব অর্থ ঘুষ হিসেবে ব্যবহারের উদ্দেশ্য ছিল বলে অভিযোগ করা হয়েছে। তবে ঘুষের অর্থ বাংলাদেশি কর্মকর্তাদের কাছে পৌঁছেছিল বা তদন্তে প্রভাব ফেলেছিল—এমন প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে এএফপি জানিয়েছে।

আওলাদের আইনজীবী টরিক ডিব জানিয়েছেন, তার মক্কেল ঘুষের অভিযোগ অস্বীকার করছেন এবং আদালতে অভিযোগের বিরুদ্ধে লড়বেন। রেহানার মৃত্যুর ঘটনায় আওলাদকে অস্ট্রেলিয়ায় কোনো অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়নি।

এর আগে রেহানার মৃত্যুসনদ জাল করে অস্ট্রেলিয়ায় থাকা যৌথ সম্পত্তি নিজের নামে নেওয়ার অভিযোগেও আওলাদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে বলে অস্ট্রেলীয় আদালতের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

বর্তমানে আওলাদ অস্ট্রেলিয়ার হেফাজতে রয়েছেন। বাংলাদেশে রেহানা পারভীনের মৃত্যুর তদন্তও চলমান রয়েছে। মামলায় আমজাদ ও কবীর কারাগারে থাকলেও পাপিয়া ও মাকসুদা জামিনে রয়েছেন।

সেপটিক ট্যাংকের পাশে রেহানার লাশ পুঁতে সবজির চারা, চার্জশিটে ভয়াবহ তথ্য

সময় : ০১:০৪:৫৪ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ঢাকা প্রতিনিধি: সম্পত্তি ও পারিবারিক বিরোধের জেরে অস্ট্রেলিয়াপ্রবাসী বাংলাদেশি নারী রেহানা পারভীনকে হত্যার পর আশুলিয়ায় সেপটিক ট্যাংকের পাশে মাটিচাপা দিয়ে তার ওপর সবজির চারা লাগিয়ে লাশ গুম করা হয়েছিল বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে। হত্যাকাণ্ডের প্রায় দুই বছর পর তদন্ত শেষে আদালতে দেওয়া চার্জশিটে হত্যাকাণ্ড ও লাশ গুমের এমন বর্ণনা উঠে এসেছে।

ঢাকার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে রেহানার স্বামী আওলাদ হোসাইনসহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে এ চার্জশিট দাখিল করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা নবাবগঞ্জ থানার উপপরিদর্শক (এসআই) তানভীর হাসান খান।

চার্জশিটভুক্ত অন্য আসামিরা হলেন—আওলাদের দুই বোন পাপিয়া আক্তার ও মাকসুদা বেগম, চাচাতো ভাই কবীর হোসাইন এবং চাচা আমজাদ হোসাইন। ঢাকার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট তানভীর আহমেদ চার্জশিটটি দেখেছেন এবং আগামী ১৯ অক্টোবর এটি পর্যালোচনার পরবর্তী দিন ধার্য করেছেন।

যেভাবে হত্যার অভিযোগ

অভিযোগপত্রের বিবরণ অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৬ জুন ১৩ বছর বয়সী মেয়েকে নিয়ে অস্ট্রেলিয়া থেকে বাংলাদেশে আসেন রেহানা পারভীন। ২৯ জুন তার স্বামী আওলাদও দেশে ফেরেন। অস্ট্রেলিয়া ও বাংলাদেশে থাকা সম্পত্তি এবং পারিবারিক বিরোধকে কেন্দ্র করে রেহানাকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয় বলে চার্জশিটে উল্লেখ করা হয়েছে।

২০২৪ সালের ৫ জুলাই সন্ধ্যার পর রেহানাকে আশুলিয়ার নয়ারহাট চৌরাপাড়ায় আওলাদের বোন পাপিয়ার বাসায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তর্কাতর্কির একপর্যায়ে তাকে মেঝেতে ফেলে দেওয়া হয় বলে অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে।

চার্জশিট অনুযায়ী, আমজাদ রেহানার পা এবং কবীর দুই হাত চেপে ধরেন। এরপর আওলাদ তার পেটের ওপর বসে মুখে বালিশ চাপা দিয়ে শ্বাসরোধে হত্যা করেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

ওই রাতেই পাপিয়ার বাড়ির সামনে সেপটিক ট্যাংকের পাশে গর্ত খুঁড়ে রেহানার মরদেহ পুঁতে রাখা হয়। ঘটনা আড়াল করতে ওই জায়গায় সবজির চারা লাগানো হয়েছিল বলেও চার্জশিটে উল্লেখ রয়েছে।

নিখোঁজের পর উদ্ধার মরদেহ

রেহানা নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় তার মা আইরিন আক্তার মামলা করেন। পরে ১২ সেপ্টেম্বর আশুলিয়া থেকে মাটিচাপা দেওয়া অবস্থায় রেহানার মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এরপর মামলাটি অপহরণ থেকে হত্যা ও মরদেহ গুমের মামলায় রূপান্তর করা হয়।

এ ঘটনায় গ্রেপ্তার পাপিয়া, কবীর ও আমজাদ আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন বলে চার্জশিটে উল্লেখ করা হয়েছে। মামলায় রেহানার নাবালিকা মেয়েও তার বাবার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিয়েছে।

রেহানার মৃত্যুর বিষয়ে বাংলাদেশে তদন্ত চলার পাশাপাশি অস্ট্রেলিয়ান ফেডারেল পুলিশও তদন্ত করছে। ২০২৫ সালে অস্ট্রেলিয়ান ফেডারেল পুলিশ রেহানার মৃত্যুকে সন্দেহজনক হত্যাকাণ্ড হিসেবে তদন্ত করার কথা জানিয়েছিল।

অস্ট্রেলিয়ায় আওলাদ গ্রেপ্তার

হত্যাকাণ্ডের পর আওলাদ অস্ট্রেলিয়ায় ফিরে যান। সম্প্রতি অস্ট্রেলিয়ান ফেডারেল পুলিশ (এএফপি) তাকে ব্রিসবেনে গ্রেপ্তার করেছে। তবে সেখানে তার বিরুদ্ধে রেহানার মৃত্যুর ঘটনায় হত্যা মামলা হয়নি।

এএফপির অভিযোগ, বাংলাদেশের তদন্তে প্রভাব বিস্তার এবং নিজের নাম পুলিশি নথি থেকে বাদ দেওয়ার উদ্দেশ্যে আওলাদ দুই বছরে বাংলাদেশে পরিচিত ব্যক্তিদের কাছে ৯০ হাজার অস্ট্রেলিয়ান ডলারের বেশি অর্থ পাঠানোর চেষ্টা করেছেন। অস্ট্রেলীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এসব অর্থ ঘুষ হিসেবে ব্যবহারের উদ্দেশ্য ছিল বলে অভিযোগ করা হয়েছে। তবে ঘুষের অর্থ বাংলাদেশি কর্মকর্তাদের কাছে পৌঁছেছিল বা তদন্তে প্রভাব ফেলেছিল—এমন প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে এএফপি জানিয়েছে।

আওলাদের আইনজীবী টরিক ডিব জানিয়েছেন, তার মক্কেল ঘুষের অভিযোগ অস্বীকার করছেন এবং আদালতে অভিযোগের বিরুদ্ধে লড়বেন। রেহানার মৃত্যুর ঘটনায় আওলাদকে অস্ট্রেলিয়ায় কোনো অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়নি।

এর আগে রেহানার মৃত্যুসনদ জাল করে অস্ট্রেলিয়ায় থাকা যৌথ সম্পত্তি নিজের নামে নেওয়ার অভিযোগেও আওলাদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে বলে অস্ট্রেলীয় আদালতের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

বর্তমানে আওলাদ অস্ট্রেলিয়ার হেফাজতে রয়েছেন। বাংলাদেশে রেহানা পারভীনের মৃত্যুর তদন্তও চলমান রয়েছে। মামলায় আমজাদ ও কবীর কারাগারে থাকলেও পাপিয়া ও মাকসুদা জামিনে রয়েছেন।