০৩:৩৫ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৫ জুলাই ২০২৬, ৯ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

২৩ বছরেও শেষ হয়নি জামাল উদ্দিন হত্যা মামলার বিচার, এখন আর বিচারও চান না পরিবার

নিউজ ডেস্ক

২৩ বছরেও শেষ হয়নি চট্টগ্রামের আলোচিত জামাল উদ্দিন হত্যা মামলার বিচার।

২৩ বছরেও শেষ হয়নি জামাল উদ্দিন হত্যা মামলার বিচার, এখন আর বিচারও চান না পরিবার

চট্টগ্রাম: ২৩ বছর ধরে আদালতের বারান্দায় ঘুরছে একটি পরিবার। অপহরণ, মুক্তিপণের টাকা পরিশোধ, দুই বছর পর কঙ্কাল উদ্ধার, বিদেশে ডিএনএ পরীক্ষায় পরিচয় নিশ্চিত হওয়া, পুলিশের দীর্ঘ তদন্ত, উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশ ও বিচারিক জটিলতা—সবকিছুর পরও শেষ হয়নি চট্টগ্রামের আলোচিত ব্যবসায়ী ও বিএনপি নেতা জামাল উদ্দিন চৌধুরী হত্যা মামলার বিচার

এমনকি এখন নিহতের পরিবারের সদস্যরাও এই বিচারিক প্রক্রিয়ায় আস্থা রাখছেন না। তাঁদের অভিযোগ, প্রকৃত অভিযুক্তদের বাদ দিয়েই মামলার বিচার চলছে। ফলে এই বিচার অর্থবহ হবে না বলে মনে করছেন তারা।


কীভাবে অপহরণ করা হয়েছিল?

২০০৩ সালের ২৪ জুলাই রাতে চট্টগ্রাম নগরের চকবাজারে নিজ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান থেকে চান্দগাঁওয়ের বাসায় ফেরার পথে অপহৃত হন দক্ষিণ জেলা বিএনপির তৎকালীন সহসভাপতি ও ব্যবসায়ী জামাল উদ্দিন চৌধুরী।

অপহরণের পর পরিবারের কাছে ৫০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হয়। প্রশাসনের পরামর্শে পরিবার ২৫ লাখ টাকা দিলেও জীবিত ফেরত আসেননি তিনি।

পরিবারের অভিযোগ, প্রথম দিকে পুলিশ ঘটনাটিকে সাজানো নাটক হিসেবে দেখেছিল এবং মামলা নিতেও গড়িমসি করেছিল।


দুই বছর পর উদ্ধার হয় কঙ্কাল

অপহরণের প্রায় দুই বছর পর, ২০০৫ সালে সাবেক ইউপি সদস্য মো. শহীদুল ইসলামকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ফটিকছড়ির কাঞ্চননগর এলাকার পাহাড় থেকে জামাল উদ্দিনের কঙ্কাল উদ্ধার করে র‍্যাব।

পরে সিঙ্গাপুরে ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত করা হয় যে সেটি জামাল উদ্দিনেরই মরদেহ।


জবানবন্দিতে উঠে আসে অপহরণের বর্ণনা

আদালতে দেওয়া দুই আসামির স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে উঠে আসে অপহরণ, মুক্তিপণ দাবি ও হত্যার বিস্তারিত তথ্য।

জবানবন্দিতে ৫০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি এবং ২৫ লাখ টাকা গ্রহণের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়। পাশাপাশি অপহরণে জড়িত একাধিক ব্যক্তির নামও উঠে আসে।

তবে নিহতের পরিবারের অভিযোগ, এসব নামের অনেককেই তদন্তে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।


দীর্ঘ তদন্ত, দীর্ঘ বিচার

মামলাটির তদন্ত করেন পুলিশের মোট ৯ কর্মকর্তা।

সাড়ে তিন বছর তদন্ত শেষে ২০০৬ সালে সিআইডি ২৪ জনকে অব্যাহতি দিয়ে ১৬ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র জমা দেয়।

অভিযোগপত্রের বিরুদ্ধে নিহতের বড় ছেলে চৌধুরী ফরমান রেজা লিটন নারাজি আবেদন করেন।

এরপর মামলাটি উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশ, লিভ টু আপিলসহ বিভিন্ন আইনি জটিলতায় পড়ে যায়।

অবশেষে ২০১৭ সালে আদালত অভিযোগপত্র গ্রহণ করেন এবং ২০১৮ সালে ১৪ আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে বিচার শুরু হয়।

কিন্তু বিচার শুরু হওয়ার আট বছর পরও মামলাটি এখনো সাক্ষ্যগ্রহণ পর্যায়েই রয়েছে।


৮৪ সাক্ষীর মধ্যে সাক্ষ্য দিয়েছেন মাত্র ৩ জন

আদালত সূত্র জানায়, মামলায় মোট ৮৪ জন সাক্ষীর মধ্যে এখন পর্যন্ত মাত্র তিনজন সাক্ষ্য দিয়েছেন।

মামলার ১৪ আসামির মধ্যে—

  • ১০ জন জামিনে
  • ১ জন কারাগারে
  • ৪ জন পলাতক

৯ বছর ধরে আদালতে যাচ্ছেন না বাদী

মামলার বাদী ও নিহতের বড় ছেলে চৌধুরী ফরমান রেজা লিটন গত নয় বছর ধরে আদালতে সাক্ষ্য দিতে যাচ্ছেন না।

তিনি বলেন,

“মূল আসামিরা কেউ নেই। তাঁদের বাদ দেওয়া হয়েছে। বারবার নারাজি দিয়েছি, শেষ পর্যন্ত পারিনি। তাই আদালতে যাওয়া ছেড়ে দিয়েছি।”

তিনি আরও দাবি করেন, প্রকৃত আসামিদের আইনের আওতায় আনা হলে তবেই ন্যায়বিচার সম্ভব।


কী বলছেন অভিযুক্ত ব্যক্তিরা?

যাঁদের নাম বিভিন্ন সময় আলোচনায় এসেছে, তাঁদের সবাই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

একজন বলেন, তদন্তে তাঁর নাম আসেনি এবং অভিযোগ রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র।

অন্যদিকে বিএনপির স্থানীয় নেতারাও জামাল উদ্দিন হত্যার সুষ্ঠু বিচার দাবি করেছেন।


বিচার দেখে যেতে পারেননি ছোট ছেলে

জামাল উদ্দিনের ছোট ছেলে চৌধুরী আরমান রেজা গত বছর মারা গেছেন। বাবার হত্যার বিচার দেখে যেতে পারেননি তিনি।

নিহতের স্ত্রী নাজমা আক্তার বলেন, দীর্ঘদিনেও ন্যায়বিচার পাননি তাঁরা। নতুন করে সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত আসামিদের বিচারের আওতায় আনার দাবি জানান তিনি।


অধিকতর তদন্তের সুযোগ আছে

আইনজীবীদের মতে, আদালতের মাধ্যমে এখনো অধিকতর তদন্তের আবেদন করার সুযোগ রয়েছে।

আগেও ১০ ট্রাক অস্ত্র মামলা ও চট্টগ্রাম বন্দরের কোকেন মামলাসহ কয়েকটি আলোচিত মামলায় এমন নজির রয়েছে।

তবে এই মামলায় পরিবার এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি।


দীর্ঘ অপেক্ষার প্রতীক

২৩ বছরেও শেষ হয়নি জামাল উদ্দিন হত্যা মামলার বিচার।

মুক্তিপণের টাকা দিয়েও স্বামীকে ফিরে পাননি নাজমা আক্তার।

বাবার হত্যার বিচার দেখে যেতে পারেননি ছোট ছেলে।

আর বড় ছেলে আদালতে যাওয়া ছেড়ে দিয়েছেন।

দুই দশকেরও বেশি সময় পর এই মামলা এখন শুধু একটি অপহরণ ও হত্যাকাণ্ড নয়; এটি বিচারিক দীর্ঘসূত্রতা, তদন্ত নিয়ে বিতর্ক এবং ন্যায়বিচারের দীর্ঘ অপেক্ষার প্রতীক হয়ে উঠেছে।

২৩ বছরেও শেষ হয়নি জামাল উদ্দিন হত্যা মামলার বিচার, এখন আর বিচারও চান না পরিবার

সময় : ০৪:৫২:০৭ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৪ জুলাই ২০২৬

২৩ বছরেও শেষ হয়নি জামাল উদ্দিন হত্যা মামলার বিচার, এখন আর বিচারও চান না পরিবার

চট্টগ্রাম: ২৩ বছর ধরে আদালতের বারান্দায় ঘুরছে একটি পরিবার। অপহরণ, মুক্তিপণের টাকা পরিশোধ, দুই বছর পর কঙ্কাল উদ্ধার, বিদেশে ডিএনএ পরীক্ষায় পরিচয় নিশ্চিত হওয়া, পুলিশের দীর্ঘ তদন্ত, উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশ ও বিচারিক জটিলতা—সবকিছুর পরও শেষ হয়নি চট্টগ্রামের আলোচিত ব্যবসায়ী ও বিএনপি নেতা জামাল উদ্দিন চৌধুরী হত্যা মামলার বিচার

এমনকি এখন নিহতের পরিবারের সদস্যরাও এই বিচারিক প্রক্রিয়ায় আস্থা রাখছেন না। তাঁদের অভিযোগ, প্রকৃত অভিযুক্তদের বাদ দিয়েই মামলার বিচার চলছে। ফলে এই বিচার অর্থবহ হবে না বলে মনে করছেন তারা।


কীভাবে অপহরণ করা হয়েছিল?

২০০৩ সালের ২৪ জুলাই রাতে চট্টগ্রাম নগরের চকবাজারে নিজ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান থেকে চান্দগাঁওয়ের বাসায় ফেরার পথে অপহৃত হন দক্ষিণ জেলা বিএনপির তৎকালীন সহসভাপতি ও ব্যবসায়ী জামাল উদ্দিন চৌধুরী।

অপহরণের পর পরিবারের কাছে ৫০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হয়। প্রশাসনের পরামর্শে পরিবার ২৫ লাখ টাকা দিলেও জীবিত ফেরত আসেননি তিনি।

পরিবারের অভিযোগ, প্রথম দিকে পুলিশ ঘটনাটিকে সাজানো নাটক হিসেবে দেখেছিল এবং মামলা নিতেও গড়িমসি করেছিল।


দুই বছর পর উদ্ধার হয় কঙ্কাল

অপহরণের প্রায় দুই বছর পর, ২০০৫ সালে সাবেক ইউপি সদস্য মো. শহীদুল ইসলামকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ফটিকছড়ির কাঞ্চননগর এলাকার পাহাড় থেকে জামাল উদ্দিনের কঙ্কাল উদ্ধার করে র‍্যাব।

পরে সিঙ্গাপুরে ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত করা হয় যে সেটি জামাল উদ্দিনেরই মরদেহ।


জবানবন্দিতে উঠে আসে অপহরণের বর্ণনা

আদালতে দেওয়া দুই আসামির স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে উঠে আসে অপহরণ, মুক্তিপণ দাবি ও হত্যার বিস্তারিত তথ্য।

জবানবন্দিতে ৫০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি এবং ২৫ লাখ টাকা গ্রহণের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়। পাশাপাশি অপহরণে জড়িত একাধিক ব্যক্তির নামও উঠে আসে।

তবে নিহতের পরিবারের অভিযোগ, এসব নামের অনেককেই তদন্তে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।


দীর্ঘ তদন্ত, দীর্ঘ বিচার

মামলাটির তদন্ত করেন পুলিশের মোট ৯ কর্মকর্তা।

সাড়ে তিন বছর তদন্ত শেষে ২০০৬ সালে সিআইডি ২৪ জনকে অব্যাহতি দিয়ে ১৬ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র জমা দেয়।

অভিযোগপত্রের বিরুদ্ধে নিহতের বড় ছেলে চৌধুরী ফরমান রেজা লিটন নারাজি আবেদন করেন।

এরপর মামলাটি উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশ, লিভ টু আপিলসহ বিভিন্ন আইনি জটিলতায় পড়ে যায়।

অবশেষে ২০১৭ সালে আদালত অভিযোগপত্র গ্রহণ করেন এবং ২০১৮ সালে ১৪ আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে বিচার শুরু হয়।

কিন্তু বিচার শুরু হওয়ার আট বছর পরও মামলাটি এখনো সাক্ষ্যগ্রহণ পর্যায়েই রয়েছে।


৮৪ সাক্ষীর মধ্যে সাক্ষ্য দিয়েছেন মাত্র ৩ জন

আদালত সূত্র জানায়, মামলায় মোট ৮৪ জন সাক্ষীর মধ্যে এখন পর্যন্ত মাত্র তিনজন সাক্ষ্য দিয়েছেন।

মামলার ১৪ আসামির মধ্যে—

  • ১০ জন জামিনে
  • ১ জন কারাগারে
  • ৪ জন পলাতক

৯ বছর ধরে আদালতে যাচ্ছেন না বাদী

মামলার বাদী ও নিহতের বড় ছেলে চৌধুরী ফরমান রেজা লিটন গত নয় বছর ধরে আদালতে সাক্ষ্য দিতে যাচ্ছেন না।

তিনি বলেন,

“মূল আসামিরা কেউ নেই। তাঁদের বাদ দেওয়া হয়েছে। বারবার নারাজি দিয়েছি, শেষ পর্যন্ত পারিনি। তাই আদালতে যাওয়া ছেড়ে দিয়েছি।”

তিনি আরও দাবি করেন, প্রকৃত আসামিদের আইনের আওতায় আনা হলে তবেই ন্যায়বিচার সম্ভব।


কী বলছেন অভিযুক্ত ব্যক্তিরা?

যাঁদের নাম বিভিন্ন সময় আলোচনায় এসেছে, তাঁদের সবাই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

একজন বলেন, তদন্তে তাঁর নাম আসেনি এবং অভিযোগ রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র।

অন্যদিকে বিএনপির স্থানীয় নেতারাও জামাল উদ্দিন হত্যার সুষ্ঠু বিচার দাবি করেছেন।


বিচার দেখে যেতে পারেননি ছোট ছেলে

জামাল উদ্দিনের ছোট ছেলে চৌধুরী আরমান রেজা গত বছর মারা গেছেন। বাবার হত্যার বিচার দেখে যেতে পারেননি তিনি।

নিহতের স্ত্রী নাজমা আক্তার বলেন, দীর্ঘদিনেও ন্যায়বিচার পাননি তাঁরা। নতুন করে সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত আসামিদের বিচারের আওতায় আনার দাবি জানান তিনি।


অধিকতর তদন্তের সুযোগ আছে

আইনজীবীদের মতে, আদালতের মাধ্যমে এখনো অধিকতর তদন্তের আবেদন করার সুযোগ রয়েছে।

আগেও ১০ ট্রাক অস্ত্র মামলা ও চট্টগ্রাম বন্দরের কোকেন মামলাসহ কয়েকটি আলোচিত মামলায় এমন নজির রয়েছে।

তবে এই মামলায় পরিবার এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি।


দীর্ঘ অপেক্ষার প্রতীক

২৩ বছরেও শেষ হয়নি জামাল উদ্দিন হত্যা মামলার বিচার।

মুক্তিপণের টাকা দিয়েও স্বামীকে ফিরে পাননি নাজমা আক্তার।

বাবার হত্যার বিচার দেখে যেতে পারেননি ছোট ছেলে।

আর বড় ছেলে আদালতে যাওয়া ছেড়ে দিয়েছেন।

দুই দশকেরও বেশি সময় পর এই মামলা এখন শুধু একটি অপহরণ ও হত্যাকাণ্ড নয়; এটি বিচারিক দীর্ঘসূত্রতা, তদন্ত নিয়ে বিতর্ক এবং ন্যায়বিচারের দীর্ঘ অপেক্ষার প্রতীক হয়ে উঠেছে।