সিফিলিস রোগের লক্ষণ কী, কীভাবে বুঝবেন এবং প্রতিরোধের উপায়
সিফিলিস একটি চিকিৎসাযোগ্য যৌনবাহিত সংক্রমণ। প্রাথমিক লক্ষণ শনাক্ত করে পরীক্ষা ও চিকিৎসা নেওয়া জরুরি।
সিফিলিস একটি যৌনবাহিত সংক্রমণ, যা ট্রেপোনেমা প্যালিডাম (Treponema pallidum) নামের ব্যাকটেরিয়ার কারণে হয়। সাধারণত সংক্রমিত ব্যক্তির সঙ্গে যৌন সংস্পর্শের মাধ্যমে এই রোগ ছড়ায়। এ ছাড়া গর্ভাবস্থায় আক্রান্ত মায়ের কাছ থেকে গর্ভস্থ সন্তানের শরীরেও সংক্রমণ ছড়াতে পারে।
সিফিলিসের প্রাথমিক লক্ষণ অনেক সময় স্পষ্ট হয় না। আবার কিছু উপসর্গ দেখা দিয়ে চিকিৎসা ছাড়াই কমে যেতে পারে। তবে এর অর্থ এই নয় যে সংক্রমণ সেরে গেছে। সময়মতো পরীক্ষা ও চিকিৎসা না করালে রোগটি শরীরের বিভিন্ন অঙ্গের ক্ষতি করতে পারে।
সিফিলিস কীভাবে ছড়ায়?
সিফিলিস সাধারণত সংক্রমিত ব্যক্তির ঘা বা ক্ষতের সঙ্গে সরাসরি সংস্পর্শের মাধ্যমে যৌনমিলনের সময় ছড়ায়। যোনিপথে, পায়ুপথে বা মুখমেহনের সময় সংক্রমণ হতে পারে।
গর্ভাবস্থায় আক্রান্ত মায়ের কাছ থেকে শিশুর শরীরে সংক্রমণ ছড়াতে পারে। রক্তের মাধ্যমে সংক্রমণ সম্ভব হলেও বর্তমানে পরীক্ষিত রক্ত সঞ্চালনের ব্যবস্থায় এ ঝুঁকি অনেক কম।
একাধিক যৌনসঙ্গীর সঙ্গে সুরক্ষাহীন যৌনসম্পর্ক এবং কনডম ব্যবহার না করা সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। তবে কারও জীবনযাপন বা যৌনসঙ্গীর সংখ্যা দেখে নিশ্চিতভাবে বলা যায় না যে তিনি সিফিলিসে আক্রান্ত।
সিফিলিস রোগের লক্ষণ কী?
সিফিলিসের লক্ষণ রোগের পর্যায় অনুযায়ী আলাদা হতে পারে। সংক্রমণের পর অনেকের উপসর্গ দেরিতে দেখা দেয়, আবার কারও ক্ষেত্রে লক্ষণ খুবই সামান্য হয় বা চোখে পড়ে না।
১. প্রাথমিক পর্যায়ের লক্ষণ
সংক্রমণের স্থানে সাধারণত একটি বা একাধিক ঘা দেখা দিতে পারে। এগুলোকে শ্যাঙ্কার (chancre) বলা হয়। ঘা সাধারণত ব্যথাহীন হয় এবং যৌনাঙ্গ, যোনি, পায়ুপথ, মলদ্বার, ঠোঁট বা মুখের ভেতরে হতে পারে।
সাধারণত সংক্রমণের প্রায় তিন সপ্তাহ পর ঘা দেখা দেয়। তবে ১০ থেকে ৯০ দিনের মধ্যেও লক্ষণ প্রকাশ পেতে পারে।
এই ঘা কয়েক সপ্তাহের মধ্যে চিকিৎসা ছাড়াই সেরে যেতে পারে। কিন্তু ঘা সেরে যাওয়া মানেই শরীর থেকে ব্যাকটেরিয়া দূর হয়ে যাওয়া নয়।
২. দ্বিতীয় পর্যায়ের লক্ষণ
চিকিৎসা না হলে পরবর্তী সময়ে শরীরের বিভিন্ন অংশে ফুসকুড়ি দেখা দিতে পারে। হাতের তালু ও পায়ের তলাতেও এ ধরনের ফুসকুড়ি হতে পারে। সাধারণত এগুলোতে চুলকানি থাকে না, যদিও সব ক্ষেত্রে একই রকম উপসর্গ দেখা যায় না।
এ ছাড়া জ্বর, গলাব্যথা, লসিকাগ্রন্থি ফুলে যাওয়া, মাথাব্যথা, ক্লান্তি, শরীরব্যথা এবং চুল পড়ার মতো লক্ষণ দেখা দিতে পারে।
এই উপসর্গগুলো অন্য রোগের কারণেও হতে পারে। তাই শুধু লক্ষণ দেখে সিফিলিস নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
৩. সুপ্ত পর্যায়
এই পর্যায়ে সংক্রমণ শরীরে থাকলেও দৃশ্যমান কোনো লক্ষণ নাও থাকতে পারে। রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে অনেক ক্ষেত্রে সংক্রমণ শনাক্ত করা যায়।
লক্ষণ না থাকলেও এই পর্যায়ে চিকিৎসা নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। চিকিৎসা না করালে কিছু রোগীর ক্ষেত্রে পরবর্তী সময়ে গুরুতর জটিলতা দেখা দিতে পারে।
৪. পরবর্তী পর্যায়ের জটিলতা
দীর্ঘদিন চিকিৎসা না করা সিফিলিস হৃদ্যন্ত্র ও রক্তনালি, মস্তিষ্ক, স্নায়ুতন্ত্র এবং শরীরের অন্যান্য অঙ্গের ক্ষতি করতে পারে। এর ফলে দৃষ্টিশক্তি বা শ্রবণশক্তি কমে যাওয়া, চলাফেরায় সমস্যা, স্মৃতিশক্তি ও চিন্তাভাবনায় পরিবর্তনসহ গুরুতর জটিলতা দেখা দিতে পারে।
এসব জটিলতা সবার ক্ষেত্রে হয় না। তবে রোগটি অবহেলা করলে স্থায়ী ক্ষতির ঝুঁকি থাকে।
কীভাবে সিফিলিস শনাক্ত করবেন?
সিফিলিস শনাক্ত করতে চিকিৎসকের পরামর্শে রক্ত পরীক্ষা করা হয়। সাধারণত RPR বা VDRL-এর মতো পরীক্ষা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী নির্দিষ্ট ট্রেপোনেমাল পরীক্ষা ব্যবহার করা হয়। কিছু ক্ষেত্রে ঘা থেকে সংগৃহীত নমুনাও পরীক্ষা করা যেতে পারে।
প্রাথমিক পর্যায়ে সংক্রমণ থাকলেও কখনো কখনো পরীক্ষার ফল নেগেটিভ আসতে পারে। তাই উপসর্গ বা সংক্রমণের ঝুঁকি থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শে পুনরায় পরীক্ষা প্রয়োজন হতে পারে।
যৌনাঙ্গে অস্বাভাবিক ঘা, শরীরে অজানা ফুসকুড়ি বা সংক্রমিত ব্যক্তির সঙ্গে যৌনসম্পর্কের ইতিহাস থাকলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
সিফিলিসের চিকিৎসা কী?
সিফিলিসের চিকিৎসায় পেনিসিলিনসহ উপযুক্ত অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করা হয়। রোগের পর্যায়, সংক্রমণের সময়কাল এবং রোগীর শারীরিক অবস্থা অনুযায়ী চিকিৎসক ওষুধ ও চিকিৎসার মেয়াদ নির্ধারণ করেন।
নিজে থেকে অ্যান্টিবায়োটিক গ্রহণ করা বা লক্ষণ কমে যাওয়ায় চিকিৎসা বন্ধ করা উচিত নয়। চিকিৎসা সম্পন্ন করার পরও সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে এসেছে কি না, তা নিশ্চিত করতে নির্ধারিত সময়ে ফলোআপ পরীক্ষা প্রয়োজন হতে পারে।
সিফিলিস ধরা পড়লে যৌনসঙ্গীরও পরীক্ষা ও প্রয়োজনে চিকিৎসা নেওয়া জরুরি। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী উভয়ের চিকিৎসা সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত যৌনসম্পর্ক এড়িয়ে চলা উচিত।
সিফিলিস প্রতিরোধের উপায়
সিফিলিস প্রতিরোধে কয়েকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ।
- প্রতিবার যৌনসম্পর্কের সময় সঠিকভাবে কনডম ব্যবহার করুন। তবে কনডমে ঢাকা পড়ে না এমন সংক্রমিত ঘা থেকেও রোগ ছড়াতে পারে।
- নতুন বা একাধিক যৌনসঙ্গী থাকলে ঝুঁকি অনুযায়ী যৌনবাহিত সংক্রমণের পরীক্ষা করান।
- সঙ্গীর সিফিলিস শনাক্ত হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী পরীক্ষা করান।
- গর্ভাবস্থায় নিয়মিত প্রসবপূর্ব সেবা গ্রহণ করুন এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী সিফিলিস পরীক্ষা করান।
- সংক্রমণের সন্দেহ হলে লজ্জা বা সামাজিক সংকোচের কারণে চিকিৎসা নিতে দেরি করবেন না।
কখন চিকিৎসকের কাছে যাবেন?
যৌনাঙ্গ, পায়ুপথ বা মুখে অস্বাভাবিক ঘা দেখা দিলে, হাতের তালু বা পায়ের তলায় অজানা ফুসকুড়ি হলে কিংবা সিফিলিসে আক্রান্ত কারও সঙ্গে যৌনসম্পর্ক হয়ে থাকলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
হঠাৎ দৃষ্টিশক্তি কমে যাওয়া, চোখে ব্যথা, শ্রবণশক্তির পরিবর্তন বা স্নায়বিক উপসর্গ দেখা দিলে জরুরি চিকিৎসা প্রয়োজন।
সিফিলিস নিয়ে সামাজিক লজ্জা বা কুসংস্কারের কারণে চিকিৎসা এড়িয়ে যাওয়া উচিত নয়। সঠিক পরীক্ষা, উপযুক্ত অ্যান্টিবায়োটিক এবং নিয়মিত ফলোআপের মাধ্যমে এই সংক্রমণের চিকিৎসা করা সম্ভব। দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হলে গুরুতর জটিলতার ঝুঁকিও কমানো যায়।























