০৯:০৭ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৩ অগাস্ট ২০২৬, ৮ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

রংপুরে একই পরিবারের চারজন হত্যা, খেজুরের বিচি-শসার সূত্রে গ্রেপ্তার ২

নিউজ ডেস্ক

রংপুরের মাছুয়াপাড়ায় একই পরিবারের চারজনকে হত্যার ঘটনায় দুই যুবককে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।

রংপুর প্রতিনিধি: রংপুর মহানগরীর মাছুয়াপাড়া এলাকায় একই পরিবারের চারজনকে হত্যার ঘটনায় মুগ্ধ দাস (২৩) ও সিদ্ধার্থ দাস (১৯) নামে দুই যুবককে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। ঘটনাস্থল থেকে পাওয়া খেজুরের বিচি, কামড়ানো শসা, পোড়ানো অলংকারসহ বিভিন্ন আলামত এবং স্থানীয়দের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে তাঁদের শনাক্ত করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

রোববার (২৩ আগস্ট) রংপুর মহানগর পুলিশের কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান পুলিশ কমিশনার (ডিআইজি) মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ। তিনি জানান, ঘটনাস্থল থেকে পাওয়া খেজুরের বিচি ডিএনএ পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে। গ্রেপ্তার দুই যুবকের ডিএনএ নমুনাও ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে।

পুলিশ কমিশনার বলেন, হত্যাকাণ্ডের ঘটনাস্থলে ইয়াবা সেবনের আলামত পাওয়া যায়। তদন্তকারীরা ধারণা করেন, হত্যাকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তিরা ঘটনাটির আগে বা পরে সেখানে ইয়াবা সেবন করেছিলেন এবং খেজুর খেয়েছিলেন। পরে ঘটনাস্থলে পাওয়া খেজুরের বিচি ডিএনএ পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়।

পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, হত্যাকাণ্ডের পর অভিযুক্তরা বাড়ির ফ্রিজ থেকে শসা বের করে খান। সেখানে অর্ধেক কামড়ানো একটি শসা পাওয়া যায়, যা গ্রেপ্তার দুই যুবকের দেওয়া বক্তব্যের সঙ্গে মিলে যায়। এরপর তাঁরা বাড়ির বাথরুমে গোসল করেন।

তদন্তে আরও জানা যায়, বাড়িতে থাকা একটি অলংকার আগুনে পুড়িয়ে পরীক্ষা করা হয়েছিল। সিদ্ধার্থ দাস একটি স্বর্ণের দোকানে কারিগর হিসেবে কাজ করেন। এ কারণে পুলিশ ধারণা করে, স্বর্ণের বিষয়ে অভিজ্ঞ কেউ হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকতে পারেন। পরে সিদ্ধার্থকে শনাক্ত করা হয়।

পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ বলেন, হত্যাকাণ্ডকে ডাকাতির ঘটনা হিসেবে দেখাতে ঘরের বিভিন্ন জিনিসপত্র ইচ্ছাকৃতভাবে এলোমেলো করা হয়। বাড়ি থেকে বের হওয়ার আগে দুটি মোবাইল ফোন ডিটারজেন্ট মিশ্রিত পানিতে ভিজিয়ে রাখা হয়েছিল, যাতে ফোনে থাকা সম্ভাব্য আঙুলের ছাপ নষ্ট হয়ে যায়।

পুলিশ জানিয়েছে, গ্রেপ্তার মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ পরস্পরের মামাতো ভাই এবং নিহত পরিবারের প্রতিবেশী। মুগ্ধ মাছুয়াপাড়া এলাকার কানুদাসের ছেলে এবং সিদ্ধার্থ বিনয়চন্দ্র দাসের ছেলে।

পুলিশের দাবি, বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) দিবাগত রাতের শেষ দিকে পাশের একটি ভবনের ওপর দিয়ে মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির ছাদে যান। সেখানে তাঁরা ইয়াবা সেবন করছিলেন। শব্দ শুনে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী ছাদে গিয়ে তাঁদের সেখানে অবস্থানের কারণ জানতে চান। এ সময় নিজেদের পরিচয় প্রকাশ পাওয়ার আশঙ্কায় তাঁরা গণপতিকে হত্যা করেন। পরে পরিবারের অন্য সদস্যদেরও হত্যা করা হয় বলে জানিয়েছে পুলিশ।

নিহতরা হলেন রংপুর জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী জুয়েল (৬৫), তাঁর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী বালা (৫০), মেয়ে আগামী চক্রবর্তী (২৫) ও ছেলে আয়ুশ চক্রবর্তী প্রিয়ম (১২)। তাঁদের মরদেহ শনিবার (২২ আগস্ট) রাতে মাছুয়াপাড়ার বাড়ি থেকে উদ্ধার করা হয়।

রংপুর কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এ কে এম নাজমুল কাদের জানান, ঘটনাস্থলে পাওয়া আলামত বিশ্লেষণের পাশাপাশি স্থানীয়ভাবে তথ্য সংগ্রহ করা হয়। স্থানীয় সোর্সের দেওয়া তথ্য এবং ভুক্তভোগী পরিবারের স্বজনদের তথ্য মিলিয়ে আসামিদের শনাক্ত করা সম্ভব হয়।

তিনি জানান, গ্রেপ্তার দুই আসামির ডিএনএ পরীক্ষার জন্য নমুনা ফরেনসিক ল্যাবে পাঠানো হয়েছে। প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, অভিযানের খবর পেয়ে গ্রেপ্তারদের একজন রেশম উন্নয়ন বোর্ডের তুতবাগান এলাকায় লুকিয়ে ছিলেন। পরে পাশের দখীগঞ্জ শ্মশান এলাকা থেকে তাঁকে আটক করা হয়।

গণপতি চক্রবর্তী গত বছরের ডিসেম্বরে রংপুর জিলা স্কুল থেকে শিক্ষকতা পেশা থেকে অবসর নেন। এরপর তিনি রংপুর সমবায় মার্কেটে একটি হোমিওপ্যাথি চেম্বারে চিকিৎসাসেবা দিতেন। তাঁর মেয়ে আগামী চক্রবর্তী কারমাইকেল কলেজের ইংরেজি বিভাগের ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষের মাস্টার্সের শিক্ষার্থী ছিলেন এবং সম্প্রতি মাস্টার্স সম্পন্ন করেন। ১২ বছর বয়সী ছেলে আয়ুশ চক্রবর্তী প্রিয়ম রংপুর জিলা স্কুলের পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ত।

পুলিশ কমিশনারের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রাথমিক তদন্তে ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়াকে হত্যাকাণ্ডের মূল কারণ হিসেবে পাওয়া গেছে। একই সঙ্গে হত্যাকাণ্ডকে ডাকাতি হিসেবে দেখানোর জন্য আলামত সাজানোর চেষ্টা করা হয়েছিল বলেও জানিয়েছে পুলিশ।

রংপুরে একই পরিবারের চারজন হত্যা, খেজুরের বিচি-শসার সূত্রে গ্রেপ্তার ২

সময় : ০৫:১৯:৩২ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৩ অগাস্ট ২০২৬

রংপুর প্রতিনিধি: রংপুর মহানগরীর মাছুয়াপাড়া এলাকায় একই পরিবারের চারজনকে হত্যার ঘটনায় মুগ্ধ দাস (২৩) ও সিদ্ধার্থ দাস (১৯) নামে দুই যুবককে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। ঘটনাস্থল থেকে পাওয়া খেজুরের বিচি, কামড়ানো শসা, পোড়ানো অলংকারসহ বিভিন্ন আলামত এবং স্থানীয়দের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে তাঁদের শনাক্ত করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

রোববার (২৩ আগস্ট) রংপুর মহানগর পুলিশের কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান পুলিশ কমিশনার (ডিআইজি) মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ। তিনি জানান, ঘটনাস্থল থেকে পাওয়া খেজুরের বিচি ডিএনএ পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে। গ্রেপ্তার দুই যুবকের ডিএনএ নমুনাও ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে।

পুলিশ কমিশনার বলেন, হত্যাকাণ্ডের ঘটনাস্থলে ইয়াবা সেবনের আলামত পাওয়া যায়। তদন্তকারীরা ধারণা করেন, হত্যাকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তিরা ঘটনাটির আগে বা পরে সেখানে ইয়াবা সেবন করেছিলেন এবং খেজুর খেয়েছিলেন। পরে ঘটনাস্থলে পাওয়া খেজুরের বিচি ডিএনএ পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়।

পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, হত্যাকাণ্ডের পর অভিযুক্তরা বাড়ির ফ্রিজ থেকে শসা বের করে খান। সেখানে অর্ধেক কামড়ানো একটি শসা পাওয়া যায়, যা গ্রেপ্তার দুই যুবকের দেওয়া বক্তব্যের সঙ্গে মিলে যায়। এরপর তাঁরা বাড়ির বাথরুমে গোসল করেন।

তদন্তে আরও জানা যায়, বাড়িতে থাকা একটি অলংকার আগুনে পুড়িয়ে পরীক্ষা করা হয়েছিল। সিদ্ধার্থ দাস একটি স্বর্ণের দোকানে কারিগর হিসেবে কাজ করেন। এ কারণে পুলিশ ধারণা করে, স্বর্ণের বিষয়ে অভিজ্ঞ কেউ হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকতে পারেন। পরে সিদ্ধার্থকে শনাক্ত করা হয়।

পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ বলেন, হত্যাকাণ্ডকে ডাকাতির ঘটনা হিসেবে দেখাতে ঘরের বিভিন্ন জিনিসপত্র ইচ্ছাকৃতভাবে এলোমেলো করা হয়। বাড়ি থেকে বের হওয়ার আগে দুটি মোবাইল ফোন ডিটারজেন্ট মিশ্রিত পানিতে ভিজিয়ে রাখা হয়েছিল, যাতে ফোনে থাকা সম্ভাব্য আঙুলের ছাপ নষ্ট হয়ে যায়।

পুলিশ জানিয়েছে, গ্রেপ্তার মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ পরস্পরের মামাতো ভাই এবং নিহত পরিবারের প্রতিবেশী। মুগ্ধ মাছুয়াপাড়া এলাকার কানুদাসের ছেলে এবং সিদ্ধার্থ বিনয়চন্দ্র দাসের ছেলে।

পুলিশের দাবি, বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) দিবাগত রাতের শেষ দিকে পাশের একটি ভবনের ওপর দিয়ে মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির ছাদে যান। সেখানে তাঁরা ইয়াবা সেবন করছিলেন। শব্দ শুনে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী ছাদে গিয়ে তাঁদের সেখানে অবস্থানের কারণ জানতে চান। এ সময় নিজেদের পরিচয় প্রকাশ পাওয়ার আশঙ্কায় তাঁরা গণপতিকে হত্যা করেন। পরে পরিবারের অন্য সদস্যদেরও হত্যা করা হয় বলে জানিয়েছে পুলিশ।

নিহতরা হলেন রংপুর জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী জুয়েল (৬৫), তাঁর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী বালা (৫০), মেয়ে আগামী চক্রবর্তী (২৫) ও ছেলে আয়ুশ চক্রবর্তী প্রিয়ম (১২)। তাঁদের মরদেহ শনিবার (২২ আগস্ট) রাতে মাছুয়াপাড়ার বাড়ি থেকে উদ্ধার করা হয়।

রংপুর কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এ কে এম নাজমুল কাদের জানান, ঘটনাস্থলে পাওয়া আলামত বিশ্লেষণের পাশাপাশি স্থানীয়ভাবে তথ্য সংগ্রহ করা হয়। স্থানীয় সোর্সের দেওয়া তথ্য এবং ভুক্তভোগী পরিবারের স্বজনদের তথ্য মিলিয়ে আসামিদের শনাক্ত করা সম্ভব হয়।

তিনি জানান, গ্রেপ্তার দুই আসামির ডিএনএ পরীক্ষার জন্য নমুনা ফরেনসিক ল্যাবে পাঠানো হয়েছে। প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, অভিযানের খবর পেয়ে গ্রেপ্তারদের একজন রেশম উন্নয়ন বোর্ডের তুতবাগান এলাকায় লুকিয়ে ছিলেন। পরে পাশের দখীগঞ্জ শ্মশান এলাকা থেকে তাঁকে আটক করা হয়।

গণপতি চক্রবর্তী গত বছরের ডিসেম্বরে রংপুর জিলা স্কুল থেকে শিক্ষকতা পেশা থেকে অবসর নেন। এরপর তিনি রংপুর সমবায় মার্কেটে একটি হোমিওপ্যাথি চেম্বারে চিকিৎসাসেবা দিতেন। তাঁর মেয়ে আগামী চক্রবর্তী কারমাইকেল কলেজের ইংরেজি বিভাগের ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষের মাস্টার্সের শিক্ষার্থী ছিলেন এবং সম্প্রতি মাস্টার্স সম্পন্ন করেন। ১২ বছর বয়সী ছেলে আয়ুশ চক্রবর্তী প্রিয়ম রংপুর জিলা স্কুলের পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ত।

পুলিশ কমিশনারের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রাথমিক তদন্তে ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়াকে হত্যাকাণ্ডের মূল কারণ হিসেবে পাওয়া গেছে। একই সঙ্গে হত্যাকাণ্ডকে ডাকাতি হিসেবে দেখানোর জন্য আলামত সাজানোর চেষ্টা করা হয়েছিল বলেও জানিয়েছে পুলিশ।