০৫:৪৩ অপরাহ্ন, শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৮ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

পদ্মার ভাঙনে ঝুঁকিতে ১০ হাজার পরিবার, নিজের ৫০ লাখ টাকায় বাঁধ দিচ্ছেন ইমরান

নিউজ ডেস্ক

মুন্সীগঞ্জের টঙ্গীবাড়ীর বানারী গ্রামে পদ্মার ভাঙন ঠেকাতে নিজের অর্থায়নে অস্থায়ী বাঁধ নির্মাণ করছেন প্রবাসী ইমরান মিয়া।

আমেরিকাপ্রবাসী ইমরান মিয়া মুন্সীগঞ্জের টঙ্গীবাড়ী উপজেলার বানারী গ্রামের সন্তান। ১৯৯০ সালে পদ্মা নদী গ্রাস করে নেয় তার পৈতৃক ভিটা। পাঁচ বছর পর সেই পদ্মার বুকেই আবার জেগে ওঠে চর। প্রায় ২০ বছর আগে সেই চরেই নতুন করে বসতি গড়েন ইমরান।

সেখানেই গড়ে তোলেন অত্যাধুনিক পার্কের আদলে একটি বাড়ি। দুই পাশে পদ্মা নদী, আর মাঝখানে তার স্বপ্নের বাড়ি। বাড়িতে ময়ূরসহ বিভিন্ন প্রজাতির পাখি পালন করতেন তিনি। পার্কের আদলে সাজানো স্থানটি সবার জন্য টিকিট ছাড়াই উন্মুক্ত করে দিয়েছিলেন। দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ সেখানে ঘুরতে আসতেন। স্থানটি পিকনিক স্পট হিসেবেও পরিচিতি পেয়েছিল।

প্রতিবছর আমেরিকা থেকে এসে স্ত্রীকে নিয়ে ওই বাড়িতেই থাকতেন ইমরান। তবে গত ১০ দিনের ভয়াবহ পদ্মার ভাঙনে এখন তার সেই স্বপ্নের বাড়িসহ পুরো বানারী গ্রাম ঝুঁকির মুখে পড়েছে।

গ্রামের অসহায় মানুষের কথা চিন্তা করে আর দেরি করেননি ইমরান। নিজের অর্থায়নেই শুরু করেন নদীভাঙন রোধে অস্থায়ী বাঁধ নির্মাণের কাজ। তার এই উদ্যোগ দেখে পাশে দাঁড়িয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ডও।

৫০ লাখ টাকা খরচ করে বাঁধ নির্মাণ

সরেজমিনে দেখা যায়, মিয়া বাড়ির বেশ কিছু অংশ ইতোমধ্যে পদ্মা নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। নদীর পাড়ে দিন-রাত চলছে বালুর বস্তা ফেলার কাজ।

ইমরান মিয়া বলেন, ১৯৯০ সালে তাদের পৈতৃক ভিটা পদ্মায় বিলীন হয়ে গিয়েছিল। পাঁচ বছর পর আবার চর জেগে ওঠে। চর জেগে ওঠার পর দুই পাশেই পদ্মা নদী কয়েক কিলোমিটার দূরে ছিল।

তিনি বলেন, একসময় নদী পার হয়ে ২০০ টাকা মোটরসাইকেল ভাড়া দিয়ে বাড়িতে আসতে হতো। কিন্তু এখন নদী বাড়ির গোড়ায় চলে এসেছে।

ইমরান মিয়া বলেন, নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী প্রায় ৫০ লাখ টাকা খরচ করে ভাঙন ঠেকানোর চেষ্টা করছেন তিনি। তবে পুরো এলাকার মানুষকে রক্ষা করতে সরকারি উদ্যোগে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ প্রয়োজন।

ঝুঁকিতে স্কুল, মসজিদ ও গুচ্ছগ্রাম

স্থানীয়দের মতে, বানারী গ্রামে রয়েছে বানারী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, গুচ্ছগ্রাম ও একাধিক মসজিদ। এর পাশেই রয়েছে বিধুয়াইল, নগর ও জোয়ার এলাকা। কাছেই ফরিদপুরের জাজিরা ইউনিয়ন।

টঙ্গীবাড়ী ও জাজিরা মিলিয়ে এই অঞ্চলে প্রায় ১০ হাজার পরিবারের বসবাস। ফলে নদীভাঙন অব্যাহত থাকলে বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।

বানারী গ্রামের বাসিন্দা হৃদয় বলেন, গ্রামে কয়েকটি মসজিদ, গুচ্ছগ্রাম ও স্কুল রয়েছে। আগে পদ্মা নদী অনেক দূরে ছিল। ভাঙতে ভাঙতে নদী এখন বসতির কাছে চলে এসেছে।

আরেক বাসিন্দা তাজুল ইসলাম বলেন, কয়েক বছর আগেও নদী অনেক দূরে ছিল। অল্প অল্প করে ভাঙতে ভাঙতে এখন বাড়ির কাছে চলে এসেছে। এরই মধ্যে অনেক জমি নদীতে বিলীন হয়েছে। বর্ষার শুরু থেকেই এ বছর ভাঙন তীব্র হয়েছে।

তিনি বলেন, দ্রুত বালুর বস্তা ফেলা না হলে সবকিছু নদীতে চলে যেতে পারে।

স্থায়ী বাঁধ চান স্থানীয়রা

স্থানীয়দের দাবি, অস্থায়ী বাঁধ দিয়ে এই সংকটের স্থায়ী সমাধান হবে না। পুরো গ্রাম রক্ষায় স্থায়ী ব্লক বাঁধ নির্মাণ করতে হবে।

তাদের আশঙ্কা, দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া না হলে যেকোনো সময় স্কুল, মসজিদ, গুচ্ছগ্রামসহ পুরো জনপদ নদীতে তলিয়ে যেতে পারে।

পাশে দাঁড়িয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড

ভাঙনরোধে শুধু ইমরান মিয়াই নন, পাশে দাঁড়িয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ডও।

পাউবোর মাঠ কর্মকর্তা ইমরান হোসেন বলেন, আগস্টের মাঝামাঝি থেকে এখানে ভাঙন চলছে। এর আগে বালুর বস্তা ফেলা হলেও নদীর স্রোতে সেগুলো সরে গেছে।

তিনি বলেন, বর্তমানে ব্যক্তি উদ্যোগে ইমরান মিয়া বাঁধ নির্মাণ করছেন। পাশাপাশি পানি উন্নয়ন বোর্ডও ভাঙনরোধে কাজ করছে।

মুন্সীগঞ্জের আরও কয়েকটি এলাকায় ভাঙন

শুধু বানারী গ্রামেই নয়, উজান থেকে নেমে আসা ঢলে মুন্সীগঞ্জ সংলগ্ন পদ্মা নদীতেও তীব্র স্রোতের কারণে ভাঙন দেখা দিয়েছে।

সদর উপজেলার শিলই, রাকির কান্দিসহ নদীতীরের কয়েকটি এলাকায় ভাঙন দেখা দিয়েছে। পাশাপাশি ধলেশ্বরী নদীসহ মেঘনার পানিও বাড়ছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্যমতে, জেলার নদীগুলোতে পানির স্তর বৃদ্ধির প্রবণতা রয়েছে। তবে এখনো পানি বিপৎসীমার নিচে রয়েছে।

সরেজমিনে পদ্মা নদীর পাড়ের টঙ্গীবাড়ী ও সদর উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, নদীতে পানির তীব্র প্রবাহ রয়েছে। স্রোতের কারণে ছোট নৌযান চলাচলেও বেগ পেতে হচ্ছে।

স্থানীয় কয়েকজন জানান, গত দুই দিনে নদীতে স্রোতের তীব্রতা আরও বেড়েছে।

স্থানীয় ট্রলারচালক শহিদুল বলেন, কয়েকদিন ধরে নদীতে তীব্র স্রোত রয়েছে। পানি বাড়ছে। পানি বাড়ার সঙ্গে তারাও ভাঙন-আতঙ্কে রয়েছেন।

ভাঙনরোধে কাজ চলছে: পাউবো

মুন্সীগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী শেখ এনামুল হক বলেন, উজান থেকে পদ্মা দিয়ে পানি নামছে। এতে নদীতে স্রোতের তীব্রতা বেড়েছে এবং ভাঙন দেখা দিয়েছে।

তিনি বলেন, ভাঙনরোধে সর্বাত্মক চেষ্টা চলছে। জনবল ও আর্থিক সীমাবদ্ধতা থাকলেও নদীভাঙনের বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। ভাঙনরোধে পানি উন্নয়ন বোর্ডের কাজ অব্যাহত রয়েছে।

পদ্মার ভাঙনে ঝুঁকিতে ১০ হাজার পরিবার, নিজের ৫০ লাখ টাকায় বাঁধ দিচ্ছেন ইমরান

সময় : ০৩:৪৬:৩২ অপরাহ্ন, শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

আমেরিকাপ্রবাসী ইমরান মিয়া মুন্সীগঞ্জের টঙ্গীবাড়ী উপজেলার বানারী গ্রামের সন্তান। ১৯৯০ সালে পদ্মা নদী গ্রাস করে নেয় তার পৈতৃক ভিটা। পাঁচ বছর পর সেই পদ্মার বুকেই আবার জেগে ওঠে চর। প্রায় ২০ বছর আগে সেই চরেই নতুন করে বসতি গড়েন ইমরান।

সেখানেই গড়ে তোলেন অত্যাধুনিক পার্কের আদলে একটি বাড়ি। দুই পাশে পদ্মা নদী, আর মাঝখানে তার স্বপ্নের বাড়ি। বাড়িতে ময়ূরসহ বিভিন্ন প্রজাতির পাখি পালন করতেন তিনি। পার্কের আদলে সাজানো স্থানটি সবার জন্য টিকিট ছাড়াই উন্মুক্ত করে দিয়েছিলেন। দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ সেখানে ঘুরতে আসতেন। স্থানটি পিকনিক স্পট হিসেবেও পরিচিতি পেয়েছিল।

প্রতিবছর আমেরিকা থেকে এসে স্ত্রীকে নিয়ে ওই বাড়িতেই থাকতেন ইমরান। তবে গত ১০ দিনের ভয়াবহ পদ্মার ভাঙনে এখন তার সেই স্বপ্নের বাড়িসহ পুরো বানারী গ্রাম ঝুঁকির মুখে পড়েছে।

গ্রামের অসহায় মানুষের কথা চিন্তা করে আর দেরি করেননি ইমরান। নিজের অর্থায়নেই শুরু করেন নদীভাঙন রোধে অস্থায়ী বাঁধ নির্মাণের কাজ। তার এই উদ্যোগ দেখে পাশে দাঁড়িয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ডও।

৫০ লাখ টাকা খরচ করে বাঁধ নির্মাণ

সরেজমিনে দেখা যায়, মিয়া বাড়ির বেশ কিছু অংশ ইতোমধ্যে পদ্মা নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। নদীর পাড়ে দিন-রাত চলছে বালুর বস্তা ফেলার কাজ।

ইমরান মিয়া বলেন, ১৯৯০ সালে তাদের পৈতৃক ভিটা পদ্মায় বিলীন হয়ে গিয়েছিল। পাঁচ বছর পর আবার চর জেগে ওঠে। চর জেগে ওঠার পর দুই পাশেই পদ্মা নদী কয়েক কিলোমিটার দূরে ছিল।

তিনি বলেন, একসময় নদী পার হয়ে ২০০ টাকা মোটরসাইকেল ভাড়া দিয়ে বাড়িতে আসতে হতো। কিন্তু এখন নদী বাড়ির গোড়ায় চলে এসেছে।

ইমরান মিয়া বলেন, নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী প্রায় ৫০ লাখ টাকা খরচ করে ভাঙন ঠেকানোর চেষ্টা করছেন তিনি। তবে পুরো এলাকার মানুষকে রক্ষা করতে সরকারি উদ্যোগে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ প্রয়োজন।

ঝুঁকিতে স্কুল, মসজিদ ও গুচ্ছগ্রাম

স্থানীয়দের মতে, বানারী গ্রামে রয়েছে বানারী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, গুচ্ছগ্রাম ও একাধিক মসজিদ। এর পাশেই রয়েছে বিধুয়াইল, নগর ও জোয়ার এলাকা। কাছেই ফরিদপুরের জাজিরা ইউনিয়ন।

টঙ্গীবাড়ী ও জাজিরা মিলিয়ে এই অঞ্চলে প্রায় ১০ হাজার পরিবারের বসবাস। ফলে নদীভাঙন অব্যাহত থাকলে বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।

বানারী গ্রামের বাসিন্দা হৃদয় বলেন, গ্রামে কয়েকটি মসজিদ, গুচ্ছগ্রাম ও স্কুল রয়েছে। আগে পদ্মা নদী অনেক দূরে ছিল। ভাঙতে ভাঙতে নদী এখন বসতির কাছে চলে এসেছে।

আরেক বাসিন্দা তাজুল ইসলাম বলেন, কয়েক বছর আগেও নদী অনেক দূরে ছিল। অল্প অল্প করে ভাঙতে ভাঙতে এখন বাড়ির কাছে চলে এসেছে। এরই মধ্যে অনেক জমি নদীতে বিলীন হয়েছে। বর্ষার শুরু থেকেই এ বছর ভাঙন তীব্র হয়েছে।

তিনি বলেন, দ্রুত বালুর বস্তা ফেলা না হলে সবকিছু নদীতে চলে যেতে পারে।

স্থায়ী বাঁধ চান স্থানীয়রা

স্থানীয়দের দাবি, অস্থায়ী বাঁধ দিয়ে এই সংকটের স্থায়ী সমাধান হবে না। পুরো গ্রাম রক্ষায় স্থায়ী ব্লক বাঁধ নির্মাণ করতে হবে।

তাদের আশঙ্কা, দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া না হলে যেকোনো সময় স্কুল, মসজিদ, গুচ্ছগ্রামসহ পুরো জনপদ নদীতে তলিয়ে যেতে পারে।

পাশে দাঁড়িয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড

ভাঙনরোধে শুধু ইমরান মিয়াই নন, পাশে দাঁড়িয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ডও।

পাউবোর মাঠ কর্মকর্তা ইমরান হোসেন বলেন, আগস্টের মাঝামাঝি থেকে এখানে ভাঙন চলছে। এর আগে বালুর বস্তা ফেলা হলেও নদীর স্রোতে সেগুলো সরে গেছে।

তিনি বলেন, বর্তমানে ব্যক্তি উদ্যোগে ইমরান মিয়া বাঁধ নির্মাণ করছেন। পাশাপাশি পানি উন্নয়ন বোর্ডও ভাঙনরোধে কাজ করছে।

মুন্সীগঞ্জের আরও কয়েকটি এলাকায় ভাঙন

শুধু বানারী গ্রামেই নয়, উজান থেকে নেমে আসা ঢলে মুন্সীগঞ্জ সংলগ্ন পদ্মা নদীতেও তীব্র স্রোতের কারণে ভাঙন দেখা দিয়েছে।

সদর উপজেলার শিলই, রাকির কান্দিসহ নদীতীরের কয়েকটি এলাকায় ভাঙন দেখা দিয়েছে। পাশাপাশি ধলেশ্বরী নদীসহ মেঘনার পানিও বাড়ছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্যমতে, জেলার নদীগুলোতে পানির স্তর বৃদ্ধির প্রবণতা রয়েছে। তবে এখনো পানি বিপৎসীমার নিচে রয়েছে।

সরেজমিনে পদ্মা নদীর পাড়ের টঙ্গীবাড়ী ও সদর উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, নদীতে পানির তীব্র প্রবাহ রয়েছে। স্রোতের কারণে ছোট নৌযান চলাচলেও বেগ পেতে হচ্ছে।

স্থানীয় কয়েকজন জানান, গত দুই দিনে নদীতে স্রোতের তীব্রতা আরও বেড়েছে।

স্থানীয় ট্রলারচালক শহিদুল বলেন, কয়েকদিন ধরে নদীতে তীব্র স্রোত রয়েছে। পানি বাড়ছে। পানি বাড়ার সঙ্গে তারাও ভাঙন-আতঙ্কে রয়েছেন।

ভাঙনরোধে কাজ চলছে: পাউবো

মুন্সীগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী শেখ এনামুল হক বলেন, উজান থেকে পদ্মা দিয়ে পানি নামছে। এতে নদীতে স্রোতের তীব্রতা বেড়েছে এবং ভাঙন দেখা দিয়েছে।

তিনি বলেন, ভাঙনরোধে সর্বাত্মক চেষ্টা চলছে। জনবল ও আর্থিক সীমাবদ্ধতা থাকলেও নদীভাঙনের বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। ভাঙনরোধে পানি উন্নয়ন বোর্ডের কাজ অব্যাহত রয়েছে।