দখল-চাঁদাবাজির অভিযোগে কঠোর বিএনপি, নজরদারিতে নিজ দলের নেতাকর্মীরা
দখল, চাঁদাবাজি ও অনিয়মের অভিযোগে দলীয় নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে বিএনপি।
দখল, চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস ও অনিয়মের অভিযোগে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়ার কথা জানিয়েছে বিএনপি। দলীয় সূত্রের দাবি, অপরাধের ক্ষেত্রে পদ-পদবি বা রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনায় নেওয়া হবে না। অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এরই মধ্যে দলীয় শৃঙ্খলার আওতায় কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ নেতার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। সামনে আরও কয়েকজন এমপি, মন্ত্রী ও দলীয় নেতার কর্মকাণ্ড নজরদারিতে রয়েছে বলে দলীয় সূত্র জানিয়েছে।
বুধবার রাতে ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির আহ্বায়ক কমিটি বিলুপ্ত করা হয়। এর পরদিন সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ-সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির পদত্যাগের খবর প্রকাশ্যে আসে। বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা তৈরি হয়।
দলীয় সূত্রগুলো বলছে, চাঁদাবাজি, দখলবাজি, অনিয়ম, দুর্নীতি কিংবা অনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগে কাউকে সাংগঠনিক সুরক্ষা দেওয়া হবে না। অপরাধের গুরুত্ব বিবেচনা করেই ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে দলটির শীর্ষ নেতৃত্বের পক্ষ থেকে বার্তা দেওয়া হয়েছে।
সম্প্রতি রাজধানীর মিরপুরে রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলা, লুটপাট ও ভাঙচুরের ঘটনায় ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির সম্পৃক্ততার অভিযোগ সামনে আসে। স্থানীয় পর্যায়ের আরও কয়েকজন নেতাকর্মীর বিরুদ্ধেও সম্পৃক্ততার অভিযোগ ওঠে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য প্রতিবেদনে পৃথকভাবে পাওয়া যায়নি।
দলীয় সূত্র জানায়, ঘটনাটি সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহের পর সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়। রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ঘটনায় আরও যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ বা প্রমাণ পাওয়া যাবে, তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।
এ ছাড়া রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় দখল, চাঁদাবাজি কিংবা দলের নাম ব্যবহার করে অনিয়মে জড়িত নেতাকর্মীদের তালিকা তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে দলীয় সূত্র জানিয়েছে। কেন্দ্রীয় দপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট পর্যায় থেকে এসব অভিযোগ ও কর্মকাণ্ডের তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে।
দলীয় সূত্রের দাবি, শৃঙ্খলা রক্ষার এই প্রক্রিয়ায় আরও কয়েকজন জনপ্রতিনিধি ও দলীয় নেতা নজরদারিতে রয়েছেন। তাদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ তদন্ত করা হচ্ছে। পাশাপাশি কয়েকজন মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীকেও সতর্ক করা হয়েছে বলে সূত্র জানিয়েছে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমান বলেন, দলের কেউ বিশৃঙ্খলায় জড়ালে তাকে ছাড় দেওয়া হবে না। তার ভাষ্য, যারা দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গ করেছেন, তাদের ইতোমধ্যে শাস্তির আওতায় আনা হয়েছে এবং অপরাধের ক্ষেত্রে পরিচয় বিবেচনা করা হবে না।
সাম্প্রতিক দখল, হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা প্রসঙ্গে বুধবার এক সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র ও উপদেষ্টা মাহ্দী আমিন বলেন, অপরাধী যে-ই হোক, কোনো রাজনৈতিক ছাড় দেওয়া হচ্ছে না।
এদিকে সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনায় দলের ভাবমূর্তি নিয়ে প্রশ্ন ওঠার পর বিএনপির পক্ষ থেকে সাংগঠনিক তৎপরতা বাড়ানো হয়েছে। এর ধারাবাহিকতায় ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির আহ্বায়ক কমিটি বিলুপ্ত করা হয়। একই সময়ে উত্তর যুবদল ও পশ্চিম ছাত্রদলের কমিটিও বিলুপ্ত করা হয়েছে।
বিএনপির পক্ষ থেকে অনৈতিক ও সংগঠনবিরোধী কর্মকাণ্ডের অভিযোগে কয়েকজন নেতাকে বহিষ্কারের কথাও জানানো হয়েছে। তবে যুবদলের পক্ষ থেকে উত্তর মহানগর কমিটি বিলুপ্তির কারণ হিসেবে মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ার কথা বলা হয়েছে। ছাত্রদলও পশ্চিম মহানগর কমিটি বিলুপ্ত করে নতুন কমিটি দেওয়ার কথা জানিয়েছে।
দলীয় সূত্র জানায়, বুধবার ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টিসহ মহানগর নেতাদের নিয়ে বৈঠক করেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। ওই বৈঠকে মিষ্টিকে পদত্যাগের নির্দেশ দেওয়া হয় বলে সূত্রের দাবি। একই সঙ্গে কয়েকজন সরকারি দলের এমপি ও প্রভাবশালী নেতার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগও দলের শীর্ষ নেতৃত্বের নজরে আনা হয়েছে বলে জানা গেছে। এসব অভিযোগ তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলেও সূত্র জানিয়েছে।
দলের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলার ক্ষেত্রে জনপ্রতিনিধিদেরও ছাড় দেওয়া হবে না বলে বার্তা দেওয়া হয়েছে। সরকার ও বিএনপির একাধিক সূত্রের দাবি, ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকার কয়েকজন এমপি, মন্ত্রী ও দলীয় নেতাকে সতর্ক করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে এলাকায় দখলদারি, প্রভাব বিস্তার ও দলীয় কোন্দলের অভিযোগ রয়েছে বলে সূত্রগুলো জানিয়েছে।
বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের নেতারা বলছেন, সরকারে থাকার কারণে দলের নেতাকর্মীদের আচরণের প্রভাব সরাসরি সরকারের ওপর পড়ছে। তাই দল ও সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়—এমন কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
দলীয় সূত্রের হিসাব অনুযায়ী, সরকার গঠনের পর থেকে মূল দল ও অঙ্গসংগঠনের সহস্রাধিক নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে বহিষ্কার, পদ স্থগিত, অব্যাহতি ও কারণ দর্শানোর মতো সিদ্ধান্ত রয়েছে।
এর আগেও বিএনপি বড় পরিসরে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নিয়েছে। দলীয় দপ্তরের তথ্যের বরাত দিয়ে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট থেকে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগ পর্যন্ত প্রায় সাড়ে চার হাজার নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। তাদের মধ্যে আড়াই হাজারের বেশি নেতাকে বিভিন্ন পদ থেকে বহিষ্কার করা হয়।
দলীয় সূত্র বলছে, শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগের পাশাপাশি দখল, চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস, জমি বা ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ এবং সালিশের নামে হয়রানির অভিযোগও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। গণমাধ্যমে প্রকাশিত ও দলের কাছে জমা পড়া অভিযোগগুলো যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা রয়েছে।
এদিকে সামনে স্থানীয় সরকার নির্বাচন থাকায় দলীয় সংগঠনকে আরও শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে বিএনপি। জুলাইয়ে দলের স্থায়ী কমিটির বৈঠকে স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে সাংগঠনিক তৎপরতা জোরদার ও দলীয় ইউনিটগুলো সক্রিয় করার সিদ্ধান্ত হয়। এর মধ্যে শৃঙ্খলাভঙ্গের ঘটনায় ব্যবস্থা নেওয়াকে সাংগঠনিক পুনর্গঠনের অংশ হিসেবেও দেখছেন দলের নেতারা।
বিএনপির চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল বলেন, দলীয় পরিচয় বা প্রভাব এখানে বড় বিষয় নয়; সবাইকে আইনের আওতায় আসতে হবে। ভবিষ্যতে কেউ অন্যায় কর্মকাণ্ডে জড়ালে তার বিরুদ্ধেও সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে তিনি জানান।
তিনি আরও বলেন, কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিও ভাঙচুরের ঘটনায় মেজর (অব.) গোলাম মহিউদ্দিন চৌধুরীকে আটক করা হয়েছে। একই সঙ্গে কুষ্টিয়ার দৌলতপুরের স্কুলশিক্ষক গোলাম কিবরিয়া লালনকে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।
দলীয় নেতাদের বক্তব্য অনুযায়ী, এসব পদক্ষেপের মাধ্যমে দলীয় পরিচয় বা রাজনৈতিক প্রভাবের বাইরে আইন ও সাংগঠনিক শৃঙ্খলার বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়ার বার্তা দেওয়া হচ্ছে।
















