০৭:১৭ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১৭ জুলাই ২০২৬, ২ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ভেনেজুয়েলায় ভূমিকম্প: বাবাকে ধ্বংসস্তূপ থেকে জীবিত উদ্ধার করলেন ছেলে

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

জোসে গার্সিয়া (বাঁয়ে) ও ছেলে জেসুস গার্সিয়া (ডানে)। ছবি : সংগৃহীত

ভেনেজুয়েলার ভয়াবহ ভূমিকম্পে মুহূর্তেই ধসে পড়ে ১১ তলা একটি আবাসিক ভবন। ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়েন বাবা ও তার দুই শিশুসন্তান। প্রায় ২০ ঘণ্টার শ্বাসরুদ্ধকর অপেক্ষার পর নিজের বাবাকে জীবিত উদ্ধার করেন তারই বড় ছেলে, যিনি একসময় স্থানীয় দমকল বাহিনীর সদস্য ছিলেন।

গত ২৪ জুন সন্ধ্যায় উপকূলীয় শহর লা গুয়াইরার কারাবালেদা এলাকায় অবস্থিত রিতাসোল প্যালেসের দ্বিতীয় তলার ফ্ল্যাটে স্ত্রী ও দুই ছোট ছেলেকে নিয়ে ছিলেন ৪৬ বছর বয়সী জোসে গার্সিয়া। স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ছয়টার কিছু পরপরই পরপর দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্পে মুহূর্তের মধ্যে ধসে পড়ে পুরো ভবনটি।

ধসের পর জোসে গার্সিয়া নিজেকে ভবনের বেজমেন্টে ধ্বংসস্তূপের নিচে আবিষ্কার করেন। তার সঙ্গে আটকা পড়ে সাত বছর বয়সী দিয়েগো এবং ১২ বছর বয়সী সান্তিয়াগো।

এ সময় তাদের উদ্ধারে এগিয়ে আসেন হোসের বড় ছেলে ২৬ বছর বয়সী জেসুস গার্সিয়া। একসময় তিনি লা গুয়াইরার দমকল বাহিনীতে কর্মরত ছিলেন। চাকরি ছেড়ে দিলেও এক সহকর্মী তার ব্যবহৃত হেলমেট ও নিরাপত্তা পোশাক সংরক্ষণ করে রেখেছিলেন। সেই সরঞ্জাম নিয়েই তিনি ছুটে যান ধসে পড়া ভবনের সামনে।

জেসুস বলেন, ঘটনাস্থলে পৌঁছে তিনি জানতেন না তার পরিবারের কেউ বেঁচে আছেন কি না। সেখানে এক দমকলকর্মী তাকে জানান, তার বাবা ও দুই ভাই এখনো জীবিত এবং ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে আছেন।

প্রথমে বিশ্বাস করতে পারেননি তিনি। পরে ধ্বংসস্তূপের ভেতর থেকে বাবার কণ্ঠ শুনতে পান। হোসে চিৎকার করে বলছিলেন, আমাকে এখানে রেখে যেও না।

জবাবে জেসুস বলেন, শান্ত থাকুন। শিশুদেরও শান্ত রাখুন। আমি আপনাদের না নিয়ে কোথাও যাব না।

তবে সঙ্গে সঙ্গে উদ্ধার সম্ভব হয়নি। ধ্বংসস্তূপ ভাঙার প্রয়োজনীয় যন্ত্র না থাকায় পুরো রাত অপেক্ষা করতে হয়। পরদিন সকালে বিশেষ উদ্ধারকারী দল ভারী যন্ত্রপাতি নিয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। এরপর সাবেক সহকর্মীদের সহযোগিতায় প্রায় ২০ ঘণ্টা পর ধ্বংসস্তূপ ভেদ করে বাবা ও দুই ভাইকে জীবিত উদ্ধার করেন জেসুস।

তিনি বলেন, দুই ভাইকে জীবিত দেখে জড়িয়ে ধরেছিলাম। তাদের বলেছিলাম, আমি তোমাদের ভালোবাসি। এরপর নিজেকে আর ধরে রাখতে পারিনি, কেঁদে ফেলেছিলাম।

জোসে গার্সিয়া বলেন, নতুন জীবন পাওয়ার জন্য তিনি সারাজীবন কৃতজ্ঞ থাকবেন। তবে তার স্ত্রী এখনো ধ্বংসস্তূপের নিচে নিখোঁজ। ঘটনার ১১ দিন পেরিয়ে গেলেও তিনি আশা ছাড়েননি।

তিনি বলেন, যেভাবে বিশ্বাস করেছিলাম আমি আর আমার সন্তানরা জীবিত বের হতে পারব, এখনো তেমনি বিশ্বাস করি, আমার স্ত্রীও জীবিত ফিরবেন।

ধ্বংসস্তূপের পাশে দাঁড়িয়ে প্রতিদিন উদ্ধারকাজ দেখেন জোসে গার্সিয়া। সামনে কীভাবে জীবন শুরু করবেন, তার কোনো উত্তর তার জানা নেই।

তিনি বলেন, আমাদের আবার শূন্য থেকে শুরু করতে হবে। কিন্তু কীভাবে, কতটা মূল্য দিয়ে সেটা এখনো জানি না।

সরকারের তথ্য অনুযায়ী, ভূমিকম্পে অন্তত ৮৫৬টি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার মধ্যে ১৯০টি পুরোপুরি ধসে পড়েছে। তবে স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণ করে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আরও বেশি হতে পারে।

মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ইয়ান কোস্তা বলেন, হাজার হাজার মানুষ এখনো জানেন না তারা কোথায় থাকবেন বা কীভাবে নতুন করে জীবন শুরু করবেন। এই অনিশ্চয়তা মানুষের মানসিক কষ্ট আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

তিনি বলেন, অনেক মানুষের অভিযোগ, দুর্যোগ মোকাবিলায় সরকারের ধীরগতির কারণে ক্ষোভ ও হতাশা আরও বেড়েছে।

সূত্র: আলজাজিরা

 

ভেনেজুয়েলায় ভূমিকম্প: বাবাকে ধ্বংসস্তূপ থেকে জীবিত উদ্ধার করলেন ছেলে

সময় : ০৪:১৮:০৮ অপরাহ্ন, শনিবার, ১১ জুলাই ২০২৬

ভেনেজুয়েলার ভয়াবহ ভূমিকম্পে মুহূর্তেই ধসে পড়ে ১১ তলা একটি আবাসিক ভবন। ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়েন বাবা ও তার দুই শিশুসন্তান। প্রায় ২০ ঘণ্টার শ্বাসরুদ্ধকর অপেক্ষার পর নিজের বাবাকে জীবিত উদ্ধার করেন তারই বড় ছেলে, যিনি একসময় স্থানীয় দমকল বাহিনীর সদস্য ছিলেন।

গত ২৪ জুন সন্ধ্যায় উপকূলীয় শহর লা গুয়াইরার কারাবালেদা এলাকায় অবস্থিত রিতাসোল প্যালেসের দ্বিতীয় তলার ফ্ল্যাটে স্ত্রী ও দুই ছোট ছেলেকে নিয়ে ছিলেন ৪৬ বছর বয়সী জোসে গার্সিয়া। স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ছয়টার কিছু পরপরই পরপর দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্পে মুহূর্তের মধ্যে ধসে পড়ে পুরো ভবনটি।

ধসের পর জোসে গার্সিয়া নিজেকে ভবনের বেজমেন্টে ধ্বংসস্তূপের নিচে আবিষ্কার করেন। তার সঙ্গে আটকা পড়ে সাত বছর বয়সী দিয়েগো এবং ১২ বছর বয়সী সান্তিয়াগো।

এ সময় তাদের উদ্ধারে এগিয়ে আসেন হোসের বড় ছেলে ২৬ বছর বয়সী জেসুস গার্সিয়া। একসময় তিনি লা গুয়াইরার দমকল বাহিনীতে কর্মরত ছিলেন। চাকরি ছেড়ে দিলেও এক সহকর্মী তার ব্যবহৃত হেলমেট ও নিরাপত্তা পোশাক সংরক্ষণ করে রেখেছিলেন। সেই সরঞ্জাম নিয়েই তিনি ছুটে যান ধসে পড়া ভবনের সামনে।

জেসুস বলেন, ঘটনাস্থলে পৌঁছে তিনি জানতেন না তার পরিবারের কেউ বেঁচে আছেন কি না। সেখানে এক দমকলকর্মী তাকে জানান, তার বাবা ও দুই ভাই এখনো জীবিত এবং ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে আছেন।

প্রথমে বিশ্বাস করতে পারেননি তিনি। পরে ধ্বংসস্তূপের ভেতর থেকে বাবার কণ্ঠ শুনতে পান। হোসে চিৎকার করে বলছিলেন, আমাকে এখানে রেখে যেও না।

জবাবে জেসুস বলেন, শান্ত থাকুন। শিশুদেরও শান্ত রাখুন। আমি আপনাদের না নিয়ে কোথাও যাব না।

তবে সঙ্গে সঙ্গে উদ্ধার সম্ভব হয়নি। ধ্বংসস্তূপ ভাঙার প্রয়োজনীয় যন্ত্র না থাকায় পুরো রাত অপেক্ষা করতে হয়। পরদিন সকালে বিশেষ উদ্ধারকারী দল ভারী যন্ত্রপাতি নিয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। এরপর সাবেক সহকর্মীদের সহযোগিতায় প্রায় ২০ ঘণ্টা পর ধ্বংসস্তূপ ভেদ করে বাবা ও দুই ভাইকে জীবিত উদ্ধার করেন জেসুস।

তিনি বলেন, দুই ভাইকে জীবিত দেখে জড়িয়ে ধরেছিলাম। তাদের বলেছিলাম, আমি তোমাদের ভালোবাসি। এরপর নিজেকে আর ধরে রাখতে পারিনি, কেঁদে ফেলেছিলাম।

জোসে গার্সিয়া বলেন, নতুন জীবন পাওয়ার জন্য তিনি সারাজীবন কৃতজ্ঞ থাকবেন। তবে তার স্ত্রী এখনো ধ্বংসস্তূপের নিচে নিখোঁজ। ঘটনার ১১ দিন পেরিয়ে গেলেও তিনি আশা ছাড়েননি।

তিনি বলেন, যেভাবে বিশ্বাস করেছিলাম আমি আর আমার সন্তানরা জীবিত বের হতে পারব, এখনো তেমনি বিশ্বাস করি, আমার স্ত্রীও জীবিত ফিরবেন।

ধ্বংসস্তূপের পাশে দাঁড়িয়ে প্রতিদিন উদ্ধারকাজ দেখেন জোসে গার্সিয়া। সামনে কীভাবে জীবন শুরু করবেন, তার কোনো উত্তর তার জানা নেই।

তিনি বলেন, আমাদের আবার শূন্য থেকে শুরু করতে হবে। কিন্তু কীভাবে, কতটা মূল্য দিয়ে সেটা এখনো জানি না।

সরকারের তথ্য অনুযায়ী, ভূমিকম্পে অন্তত ৮৫৬টি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার মধ্যে ১৯০টি পুরোপুরি ধসে পড়েছে। তবে স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণ করে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আরও বেশি হতে পারে।

মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ইয়ান কোস্তা বলেন, হাজার হাজার মানুষ এখনো জানেন না তারা কোথায় থাকবেন বা কীভাবে নতুন করে জীবন শুরু করবেন। এই অনিশ্চয়তা মানুষের মানসিক কষ্ট আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

তিনি বলেন, অনেক মানুষের অভিযোগ, দুর্যোগ মোকাবিলায় সরকারের ধীরগতির কারণে ক্ষোভ ও হতাশা আরও বেড়েছে।

সূত্র: আলজাজিরা