০৬:২৩ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৯ জুলাই ২০২৬, ১৪ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ময়মনসিংহে ‘শ্রমের হাট’: কাজের আশায় ভোরে জড়ো হন শতাধিক দিনমজুর

নিউজ ডেস্ক

ময়মনসিংহের ত্রিশাল উপজেলা মহিলা কলেজ মোড়ে প্রতিদিন বসে শ্রমের হাট। এখানে কাজের আশায় জড়ো হন শতাধিক দিনমজুর।

ময়মনসিংহে ‘শ্রমের হাট’: এক দিনের কাজের আশায় ভোরে জড়ো হন শতাধিক দিনমজুর

ভোরের আলো তখনো পুরোপুরি ছড়িয়ে পড়েনি। সকাল ৭টা বাজতেই ময়মনসিংহের ত্রিশাল উপজেলা মহিলা কলেজ মোড়ে একে একে জড়ো হতে থাকেন শতাধিক মানুষ। কারও হাতে কোদাল, কারও হাতে বেলচা, আবার কেউ খালি হাতেই দাঁড়িয়ে থাকেন রাস্তার পাশে। সবার অপেক্ষা—একটি দিনের কাজের আশায়।

এটি কোনো পশুর হাট নয়, নয় কোনো পণ্যের বাজার। এটি শ্রমের হাট। এখানে প্রতিদিন নিজেদের শ্রম বিক্রি করতে আসেন নির্মাণশ্রমিক, মাটি কাটার শ্রমিক, রাজমিস্ত্রি, রংমিস্ত্রি, কৃষিশ্রমিকসহ বিভিন্ন পেশার দিনমজুররা।

সকাল ৭টা থেকে শুরু হওয়া এই শ্রমের হাট চলে প্রায় সাড়ে ৯টা পর্যন্ত। এ সময়ের মধ্যে ঠিকাদার, বাড়ির মালিক কিংবা শ্রমিক প্রয়োজন এমন ব্যক্তিরা এসে দরদাম করে প্রয়োজনীয় শ্রমিক নিয়ে যান। স্থানীয়দের কাছে এটি পরিচিত ‘শ্রমিকের হাট’ নামে।

কাজের আশায় অপেক্ষা

একই চিত্র দেখা যায় ময়মনসিংহ নগরীর চরপাড়া মোড়েও। ভোর থেকেই সেখানে কাজের আশায় অপেক্ষা করেন অসংখ্য দিনমজুর। কাজ মিললে দিন ভালো কাটে, আর কাজ না মিললে খালি হাতেই ফিরতে হয় বাড়িতে।

ত্রিশালের আমিরাবাড়ি এলাকার নির্মাণশ্রমিক মো. বাবুল মিয়া বলেন, “প্রতিদিন সকালে এখানে আসি। ভাগ্য ভালো থাকলে কাজ পাই, না হলে দুপুরের আগেই বাড়ি ফিরতে হয়। এখন সাধারণ শ্রমিকের মজুরি ৫৫০ থেকে ৬০০ টাকার মধ্যে। তবে সব দিন সমান কাজ থাকে না।”

শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বর্ষা মৌসুমে নির্মাণকাজ কমে গেলে তাদের আয়ও কমে যায়। আবার ধান কাটা কিংবা বোরো মৌসুমে কৃষিশ্রমিকের চাহিদা বাড়লে কাজের সুযোগও কিছুটা বৃদ্ধি পায়।

অনিশ্চিত আয়ের জীবন

দিনমজুরদের অনেকেই জানান, দৈনিক আয়ের ওপরই তাদের সংসার চলে। একদিন কাজ না থাকলে সেই দিনের বাজার খরচ নিয়েও চিন্তায় পড়তে হয়।

শ্রমিক আবদুল কুদ্দুস বলেন, “আমাদের কোনো মাসিক বেতন নেই। আজ কাজ করলে আজ খাওয়া হবে। কাজ না থাকলে ধার করে সংসার চালাতে হয়।”

আরেক শ্রমিক জসিম উদ্দিন বলেন, “সকালে সবাই দাঁড়িয়ে থাকি। যার ভাগ্যে কাজ জোটে সে চলে যায়। যারা থেকে যায়, তাদের মনটা খারাপ হয়ে যায়।”

শ্রমিক নিতে আসেন ঠিকাদার ও বাড়ির মালিকরা

প্রতিদিন বিভিন্ন এলাকা থেকে ঠিকাদার, বাড়ির মালিক ও ব্যবসায়ীরা শ্রমিক নিতে আসেন। কাজের ধরন অনুযায়ী মজুরি নির্ধারণ করা হয়। দক্ষ শ্রমিকদের মজুরি তুলনামূলক বেশি হলেও সাধারণ শ্রমিকদের ক্ষেত্রে ৫৫০ থেকে ৬০০ টাকার মধ্যেই দরদাম শেষ হয়।

শ্রমিক নিতে আসা ত্রিশাল পৌর এলাকার বাসিন্দা মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, “বাড়ির নির্মাণকাজের জন্য মাঝেমধ্যে এখান থেকে শ্রমিক নিয়ে যাই। এখানে একসঙ্গে অনেক শ্রমিক পাওয়া যায়, তাই সময়ও বাঁচে।”

স্থানীয় ঠিকাদার শাহীন মিয়া বলেন, “ভালো ও অভিজ্ঞ শ্রমিক পেতে হলে একটু বেশি মজুরি দিতে হয়। তবে কাজের বাজার আগের তুলনায় কিছুটা মন্দ।”

সংগ্রাম থামে না

এই শ্রমের হাটে আসা শ্রমিকদের বয়স ২০ থেকে ৬০ বছরের কাছাকাছি। বয়স বাড়লেও থেমে নেই তাদের সংগ্রাম। পরিবারের ভরণপোষণ, সন্তানের লেখাপড়া কিংবা চিকিৎসার খরচ চালাতে প্রতিদিনই তাদের দাঁড়াতে হয় এই হাটে।

এই ধরনের শ্রমিকের হাট দেশের অনানুষ্ঠানিক শ্রমবাজারের একটি বাস্তব চিত্র। যেখানে হাজারো মানুষ কোনো স্থায়ী চাকরি বা সামাজিক নিরাপত্তা ছাড়াই শুধু একটি দিনের কাজের আশায় অপেক্ষা করেন।

সূর্য যখন একটু ওপরে ওঠে, তখন ফাঁকা হতে শুরু করে শ্রমের হাট। কেউ কাজ পেয়ে চলে যান নির্মাণস্থলে, কেউ যান কৃষিজমিতে, কেউ আবার মাটি কাটার কাজে। আর যারা কাজ পান না, তারা ফিরে যান বাড়ির পথে—পরদিন আবার ভোরে একই জায়গায় দাঁড়ানোর প্রত্যাশা নিয়ে।

ময়মনসিংহে ‘শ্রমের হাট’: কাজের আশায় ভোরে জড়ো হন শতাধিক দিনমজুর

সময় : ১২:১৫:৫২ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৯ জুলাই ২০২৬

ময়মনসিংহে ‘শ্রমের হাট’: এক দিনের কাজের আশায় ভোরে জড়ো হন শতাধিক দিনমজুর

ভোরের আলো তখনো পুরোপুরি ছড়িয়ে পড়েনি। সকাল ৭টা বাজতেই ময়মনসিংহের ত্রিশাল উপজেলা মহিলা কলেজ মোড়ে একে একে জড়ো হতে থাকেন শতাধিক মানুষ। কারও হাতে কোদাল, কারও হাতে বেলচা, আবার কেউ খালি হাতেই দাঁড়িয়ে থাকেন রাস্তার পাশে। সবার অপেক্ষা—একটি দিনের কাজের আশায়।

এটি কোনো পশুর হাট নয়, নয় কোনো পণ্যের বাজার। এটি শ্রমের হাট। এখানে প্রতিদিন নিজেদের শ্রম বিক্রি করতে আসেন নির্মাণশ্রমিক, মাটি কাটার শ্রমিক, রাজমিস্ত্রি, রংমিস্ত্রি, কৃষিশ্রমিকসহ বিভিন্ন পেশার দিনমজুররা।

সকাল ৭টা থেকে শুরু হওয়া এই শ্রমের হাট চলে প্রায় সাড়ে ৯টা পর্যন্ত। এ সময়ের মধ্যে ঠিকাদার, বাড়ির মালিক কিংবা শ্রমিক প্রয়োজন এমন ব্যক্তিরা এসে দরদাম করে প্রয়োজনীয় শ্রমিক নিয়ে যান। স্থানীয়দের কাছে এটি পরিচিত ‘শ্রমিকের হাট’ নামে।

কাজের আশায় অপেক্ষা

একই চিত্র দেখা যায় ময়মনসিংহ নগরীর চরপাড়া মোড়েও। ভোর থেকেই সেখানে কাজের আশায় অপেক্ষা করেন অসংখ্য দিনমজুর। কাজ মিললে দিন ভালো কাটে, আর কাজ না মিললে খালি হাতেই ফিরতে হয় বাড়িতে।

ত্রিশালের আমিরাবাড়ি এলাকার নির্মাণশ্রমিক মো. বাবুল মিয়া বলেন, “প্রতিদিন সকালে এখানে আসি। ভাগ্য ভালো থাকলে কাজ পাই, না হলে দুপুরের আগেই বাড়ি ফিরতে হয়। এখন সাধারণ শ্রমিকের মজুরি ৫৫০ থেকে ৬০০ টাকার মধ্যে। তবে সব দিন সমান কাজ থাকে না।”

শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বর্ষা মৌসুমে নির্মাণকাজ কমে গেলে তাদের আয়ও কমে যায়। আবার ধান কাটা কিংবা বোরো মৌসুমে কৃষিশ্রমিকের চাহিদা বাড়লে কাজের সুযোগও কিছুটা বৃদ্ধি পায়।

অনিশ্চিত আয়ের জীবন

দিনমজুরদের অনেকেই জানান, দৈনিক আয়ের ওপরই তাদের সংসার চলে। একদিন কাজ না থাকলে সেই দিনের বাজার খরচ নিয়েও চিন্তায় পড়তে হয়।

শ্রমিক আবদুল কুদ্দুস বলেন, “আমাদের কোনো মাসিক বেতন নেই। আজ কাজ করলে আজ খাওয়া হবে। কাজ না থাকলে ধার করে সংসার চালাতে হয়।”

আরেক শ্রমিক জসিম উদ্দিন বলেন, “সকালে সবাই দাঁড়িয়ে থাকি। যার ভাগ্যে কাজ জোটে সে চলে যায়। যারা থেকে যায়, তাদের মনটা খারাপ হয়ে যায়।”

শ্রমিক নিতে আসেন ঠিকাদার ও বাড়ির মালিকরা

প্রতিদিন বিভিন্ন এলাকা থেকে ঠিকাদার, বাড়ির মালিক ও ব্যবসায়ীরা শ্রমিক নিতে আসেন। কাজের ধরন অনুযায়ী মজুরি নির্ধারণ করা হয়। দক্ষ শ্রমিকদের মজুরি তুলনামূলক বেশি হলেও সাধারণ শ্রমিকদের ক্ষেত্রে ৫৫০ থেকে ৬০০ টাকার মধ্যেই দরদাম শেষ হয়।

শ্রমিক নিতে আসা ত্রিশাল পৌর এলাকার বাসিন্দা মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, “বাড়ির নির্মাণকাজের জন্য মাঝেমধ্যে এখান থেকে শ্রমিক নিয়ে যাই। এখানে একসঙ্গে অনেক শ্রমিক পাওয়া যায়, তাই সময়ও বাঁচে।”

স্থানীয় ঠিকাদার শাহীন মিয়া বলেন, “ভালো ও অভিজ্ঞ শ্রমিক পেতে হলে একটু বেশি মজুরি দিতে হয়। তবে কাজের বাজার আগের তুলনায় কিছুটা মন্দ।”

সংগ্রাম থামে না

এই শ্রমের হাটে আসা শ্রমিকদের বয়স ২০ থেকে ৬০ বছরের কাছাকাছি। বয়স বাড়লেও থেমে নেই তাদের সংগ্রাম। পরিবারের ভরণপোষণ, সন্তানের লেখাপড়া কিংবা চিকিৎসার খরচ চালাতে প্রতিদিনই তাদের দাঁড়াতে হয় এই হাটে।

এই ধরনের শ্রমিকের হাট দেশের অনানুষ্ঠানিক শ্রমবাজারের একটি বাস্তব চিত্র। যেখানে হাজারো মানুষ কোনো স্থায়ী চাকরি বা সামাজিক নিরাপত্তা ছাড়াই শুধু একটি দিনের কাজের আশায় অপেক্ষা করেন।

সূর্য যখন একটু ওপরে ওঠে, তখন ফাঁকা হতে শুরু করে শ্রমের হাট। কেউ কাজ পেয়ে চলে যান নির্মাণস্থলে, কেউ যান কৃষিজমিতে, কেউ আবার মাটি কাটার কাজে। আর যারা কাজ পান না, তারা ফিরে যান বাড়ির পথে—পরদিন আবার ভোরে একই জায়গায় দাঁড়ানোর প্রত্যাশা নিয়ে।