পাকিস্তান–নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে সংঘর্ষে বহু হতাহত, চিকিৎসা ও খাদ্যসংকটের অভিযোগ
আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
পাকিস্তান–নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের (পিএকে) রাওয়ালাকোটে চলমান বিক্ষোভ ঘিরে নিরাপত্তা বাহিনী ও জয়েন্ট আওয়ামী অ্যাকশন কমিটির (জেএএসি) কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষে কয়েক ডজন মানুষের প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। আহতদের চিকিৎসা, খাদ্যসংকট এবং নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। ঘটনাস্থল থেকে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানিয়েছে বিবিসি।
রাওয়ালাকোট শহরের একটি অস্থায়ী চিকিৎসাকেন্দ্রে প্রতিদিন গুলিবিদ্ধ ও গুরুতর আহতদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। নিরাপত্তার কারণে পরিচয় গোপন রাখা ওই চিকিৎসক, ছদ্মনাম ডা. আনোয়ার, জানান—গত ২৭ জুলাই থেকে তাঁর কেন্দ্রে ৫০ থেকে ৬০ জন গুরুতর আহত ব্যক্তির চিকিৎসা হয়েছে। এর মধ্যে ১৫ থেকে ২০ জন গুলিবিদ্ধ ছিলেন।
অস্থায়ী চিকিৎসাকেন্দ্রে বাড়ছে আহতের সংখ্যা
ডা. আনোয়ার বলেন, প্রাথমিক চিকিৎসার জন্য পর্যাপ্ত ওষুধ থাকলেও বুক, মাথা বা পেটে গুলিবিদ্ধ রোগীদের উন্নত হাসপাতালে নেওয়া জরুরি। তবে অনেক বিক্ষোভকারী হাসপাতালে যেতে ভয় পাচ্ছেন। তাদের আশঙ্কা, সেখানে গেলে গ্রেপ্তার বা হামলার শিকার হতে পারেন। যদিও এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে কর্তৃপক্ষ।
সংঘর্ষে নিহতদের বেশির ভাগই তরুণ
চিকিৎসকের ভাষ্য অনুযায়ী, নিহত ও গুরুতর আহতদের বেশির ভাগের বয়স ১৫ থেকে ৩৫ বছরের মধ্যে। ৪০ বছরের বেশি বয়সী আহতের সংখ্যা খুবই কম।
অস্থায়ী চিকিৎসাকেন্দ্রে চিকিৎসাধীন গুলিবিদ্ধ শাফকাত হোসেনের পাশে থাকা তাঁর বন্ধু আলী অভিযোগ করেন, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম কমানো এবং মৌলিক অধিকার আদায়ের দাবিতে আন্দোলন করলেও তাদের ওপর গুলি চালানো হয়েছে।
জেএএসি কী দাবি করছে?
জেএএসি জানায়, বিদ্যুতের মূল্য কমানো, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়ন এবং নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করার দাবিতে তারা আন্দোলন করছে। তাদের দাবি, গত বছরের অক্টোবরে পাকিস্তান ও পিএকে সরকারের সঙ্গে হওয়া চুক্তি বাস্তবায়ন না হওয়ায় তারা আবারও আন্দোলনে নেমেছে।
অন্যদিকে স্থানীয় সরকারের দাবি, জেএএসি একটি সশস্ত্র সংগঠন এবং চলমান নির্বাচন বানচালের উদ্দেশ্যে আন্দোলন করছে। এ কারণে তাদের মুজাফফরাবাদের দিকে পদযাত্রার অনুমতি দেওয়া হয়নি।
জেএএসিকে ঘিরে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ
গত জুনে জেএএসিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে পিএকে প্রশাসন। সংগঠনটিকে বিদেশি অর্থায়নে পরিচালিত সন্ত্রাসী গোষ্ঠী হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
তবে জেএএসি এ অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। তাদের দাবি, তারা শান্তিপূর্ণ আন্দোলন করছে এবং বিদেশে থাকা কাশ্মীরি সম্প্রদায়ের কাছ থেকে সহায়তা পেলেও ভারতের কাছ থেকে কোনো অর্থ বা সহায়তা নেয়নি।
সংগঠনটির দাবি, তারা কোনো সহিংসতা শুরু করেনি; বরং নিরাপত্তা বাহিনীর গুলির শিকার হয়েছে।
নিহতদের স্বজনদের কান্না
বিবিসি রাওয়ালাকোটে নিহতদের কয়েকটি পরিবারের সঙ্গে কথা বলেছে। স্বজনদের অভিযোগ, বিক্ষোভে অংশ নেওয়ার কারণেই তাদের প্রিয়জন প্রাণ হারিয়েছেন।
নিহত এক তরুণের মা আসমা বলেন, “আমরা শুধু আমাদের অধিকার চেয়েছিলাম। আমরা সন্ত্রাসী নই।”
আরেক স্বজন সালমান বলেন, তাঁর ছোট ভাই মানুষের অধিকারের পক্ষে দাঁড়িয়ে জীবন দিয়েছেন। এতে তিনি যেমন শোকাহত, তেমনি ভাইয়ের সাহসিকতা নিয়েও গর্বিত।
সাবেক সেনাসদস্যের অভিযোগ
অবসরপ্রাপ্ত সেনাসদস্য আইয়ুবও সংঘর্ষে তাঁর ছেলেকে হারিয়েছেন। তিনি পাকিস্তান সেনাবাহিনীর পরিবর্তে পিএকে সরকারকে দায়ী করে বলেন, আধাসামরিক বাহিনী মোতায়েনের সিদ্ধান্ত পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।
সরকারের বক্তব্য
পিএকে সরকার শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের ওপর নির্বিচারে গুলি চালানোর অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে।
সরকারের দাবি, কেবল আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর হামলা, জননিরাপত্তা বিঘ্নিত করা কিংবা আইনগত কার্যক্রমে বাধা দেওয়া ব্যক্তিদের বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
এছাড়া রাওয়ালাকোটে খাদ্য ও চিকিৎসাসামগ্রী প্রবেশে বাধা দেওয়ার অভিযোগও ভিত্তিহীন বলে জানিয়েছে প্রশাসন।
খাদ্যসংকট ও অনিশ্চয়তা
বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সংঘাতের কারণে শহরের অধিকাংশ দোকানপাট বন্ধ রয়েছে। অনেক বিক্ষোভকারী নিজেদের মধ্যে খাবার ভাগাভাগি করে খাচ্ছেন। মোটরসাইকেলে করে গোপনে চালসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী আনার চেষ্টার কথাও জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
শহরের বিভিন্ন প্রবেশপথে নিরাপত্তা চৌকি বসানো হয়েছে। প্রশাসনের দাবি, কিছু সড়ক গাছ ফেলে অবরোধ করেছে জেএএসি।
আলোচনার ইঙ্গিত
জেএএসি নেতা ওমর নাজির বলেছেন, তারা আলোচনায় বসতে প্রস্তুত। তবে দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
বর্তমানে রাওয়ালাকোটের পরিস্থিতি অত্যন্ত উত্তেজনাপূর্ণ। সংঘাতের কারণে সাধারণ মানুষের মধ্যে অনিশ্চয়তা ও উদ্বেগ বাড়ছে।























