০৫:১৪ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৩ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

আইফোনের লোভে ১৩ বছরের অপ্রতিমকে হত্যা, তিন আসামির জবানবন্দিতে চাঞ্চল্যকর তথ্য

নিউজ ডেস্ক

কুমিল্লার অপ্রতিম হত্যা মামলায় তিন আসামির জবানবন্দিতে আইফোনকে কেন্দ্র করে পূর্বপরিকল্পিত হত্যার তথ্য উঠে এসেছে।

কুমিল্লা প্রতিনিধি: আইফোন দিয়ে ছবি তোলা ও টিকটক ভিডিও তৈরির মধ্য দিয়ে গড়ে উঠেছিল সম্পর্ক। সেই সম্পর্কের সুযোগ নিয়েই আইফোনের লোভে ১৩ বছর বয়সী ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয় ঘটনার সাত দিন আগে। ছবি তোলার কথা বলে অপ্রতিমকে কুমিল্লার লালমাই পাহাড়ের নির্জন এলাকায় নিয়ে যাওয়ার পর আইফোন কেড়ে নেওয়াকে কেন্দ্র করে কোদালের হাতল দিয়ে আঘাত করে তাকে হত্যা করা হয় বলে তিন আসামির আদালতে দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে উঠে এসেছে।

কুমিল্লার অপ্রতিম হত্যা মামলায় তিন আসামির ১৬৪ ধারায় দেওয়া জবানবন্দিতে হত্যার পরিকল্পনা, অপ্রতিমকে পাহাড়ে নিয়ে যাওয়া, আইফোন নেওয়া এবং তাকে আঘাত করার বিষয়ে বেশ কিছু মিল পাওয়া গেছে। তবে হত্যাকাণ্ডের সময়ের ঘটনাক্রম ও ঘটনার পর কে কোথায় গিয়েছিল—এসব বিষয়ে তাদের বক্তব্যে কিছুটা পার্থক্য রয়েছে।

কুমিল্লা বর্ডার গার্ড পাবলিক স্কুলের সপ্তম শ্রেণির ছাত্র অপ্রতিম ১৮ সেপ্টেম্বর শুক্রবার বাসা থেকে বের হওয়ার পর নিখোঁজ হয়। পরদিন কুমিল্লা সদর দক্ষিণের সানন্দা গ্রামের লালমাই পাহাড়ের নির্জন জঙ্গল থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

এ ঘটনায় গ্রেপ্তার সাইফুল ইসলাম ওরফে তুহিন (১৯) এবং অপ্রাপ্তবয়স্ক দুই কিশোর ২০ সেপ্টেম্বর রাতে কুমিল্লার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, তিন জবানবন্দির মধ্যে হত্যার পরিকল্পনা সম্পর্কে সবচেয়ে বিস্তারিত বক্তব্য দিয়েছেন তুহিন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, পাঁচ-ছয় মাস ধরে অপ্রতিমের সঙ্গে তার পরিচয় ছিল। তুহিনের বন্ধু সিয়ামের মোটরসাইকেলে করে ছবি তোলা ও টিকটক ভিডিও তৈরির জন্য অপ্রতিম তাদের সঙ্গে বের হতো।

তুহিনের জবানবন্দি অনুযায়ী, অপ্রতিমের আইফোনের প্রতি তার ও অপ্রতিমের বাবার দোকানে কর্মরত এক কিশোরের লোভ হয়। ঘটনার আগের শুক্রবার সন্ধ্যায় কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ফটকের কিছুটা সামনে তাদের দেখা হয়। সেখানেই আইফোন নেওয়া এবং অপ্রতিমকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয় বলে তুহিনের বক্তব্যে এসেছে।

অপ্রতিমের বাবার দোকানে কর্মরত ওই কিশোরের জবানবন্দিতেও আগের শুক্রবারের ওই বৈঠকের কথা এসেছে। তবে সে পরিকল্পনার দায় মূলত তুহিনের ওপর দিয়েছে। তার বক্তব্য অনুযায়ী, তুহিন আইফোনের জন্য অপ্রতিমকে হত্যার পরিকল্পনা করে।

অন্য কিশোরের জবানবন্দিতেও একই ধরনের তথ্য পাওয়া গেছে। সে জানিয়েছে, ঘটনার দিন বিকেলে তার বন্ধু তাকে পরিকল্পনার কথা জানায়—তুহিনের সঙ্গে মিলে আইফোনের জন্য অপ্রতিমকে হত্যা করা হবে।

অর্থাৎ তিন জবানবন্দির একটি গুরুত্বপূর্ণ মিল হলো, হত্যার সিদ্ধান্ত তাৎক্ষণিকভাবে নেওয়া হয়নি। আইফোনকে কেন্দ্র করে আগেই হত্যার পরিকল্পনা করা হয়েছিল বলে তিন আসামির বক্তব্যে উঠে এসেছে।

ছবি তোলার কথা বলে পাহাড়ে নেওয়া

তুহিনের জবানবন্দি অনুযায়ী, হত্যার আগের দিন ১৭ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় ময়নামতির একটি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের সামনে অপ্রতিমের সঙ্গে তার দেখা হয়। অপ্রতিম তাকে নিজের টিকটক অ্যাকাউন্টের ঠিকানা দেয়। ওই রাতেই টিকটকে অপ্রতিমকে মেসেজ করেন তুহিন। পরে অপ্রতিম একটি মুঠোফোন নম্বর দিলে সেই নম্বরে কথা হয়। পরদিন জুমার নামাজের পর দেখা করার সিদ্ধান্ত হয়।

অপ্রতিম তার বাবার দোকানে কর্মরত ওই কিশোরকেও একই সময়ে আসতে বলেছিল বলে তুহিনের বক্তব্যে এসেছে। তাদের কথা ছিল ছবি তোলার। তিন আসামির জবানবন্দি অনুযায়ী, ছবি তোলার এই সম্পর্কই অপ্রতিমকে নির্জন পাহাড়ি এলাকায় নিয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি করে।

তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, ১৩ বছর বয়সী অপ্রতিমের চেয়ে পাঁচ থেকে ১০ বছরের বড় যুবকদের সঙ্গে তার মেলামেশা ও সম্পর্ককে তারা ‘অসম বন্ধুত্ব’ হিসেবে দেখছেন।

পাহাড়ে নিয়ে যাওয়ার বর্ণনায় মিল

১৮ সেপ্টেম্বর বিকেলে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ফটকের সামনে অপ্রতিমের সঙ্গে তুহিনের দেখা হয় বলে তার জবানবন্দিতে উল্লেখ রয়েছে। এরপর অপ্রতিমকে ‘বুদ্ধি দিয়ে’ সানন্দা পশ্চিমপাড়ার দিকে নিয়ে যান তুহিন। জায়গাটি নির্জন এবং সেটি তার চাচা শাহ আলমের পাহাড় বলে জবানবন্দিতে উল্লেখ করেছেন তিনি।

অন্যদিকে অপ্রতিমের বাবার দোকানে কর্মরত কিশোরটি জানিয়েছে, বেলা দুইটার পর কোটবাড়ির বোর্ড মার্কেট এলাকায় তার সঙ্গে অপ্রতিমের দেখা হয়। পরে সন্ধ্যার আগে সে তার আরেক কিশোর বন্ধুকে নিয়ে পাহাড়ে যায়। যাওয়ার আগেই ওই বন্ধুকে হত্যার পরিকল্পনার কথা জানায়।

তৃতীয় কিশোরের বক্তব্যও অনেকটা কাছাকাছি। সে জানিয়েছে, বেলা ৩টা ৪০ মিনিটের দিকে একটি স্কুলের সামনে তার সঙ্গে ওই কিশোরের দেখা হয়। সেখানেই সে হত্যার পরিকল্পনার কথা জানতে পারে। এরপর বিকেল চারটার পর তারা পাহাড়ে যায় এবং সেখানে অপ্রতিম ও তুহিনকে বসে থাকতে দেখে।

চারজন একত্র হওয়ার পর কিছু সময় গল্প ও আড্ডা হয়—এই বিষয়েও তিন জবানবন্দির মধ্যে মিল রয়েছে।

আইফোন নিয়ে বিরোধ, প্রথম আঘাত তুহিনের

দোকানে কর্মরত কিশোরটি জবানবন্দিতে জানিয়েছে, সে অপ্রতিমের কাছে ফোন চাইলে অপ্রতিম সেটি তাকে দেয়। কিছুক্ষণ ব্যবহারের পর সে ফোনটি তুহিনের হাতে দেয়।

তুহিনের জবানবন্দিতেও একই ধরনের বর্ণনা পাওয়া যায়। ওই কিশোর অপ্রতিমের কাছ থেকে আইফোন নিয়ে কিছুক্ষণ ব্যবহারের পর সেটি অপ্রতিমকে ফেরত না দিয়ে তুহিনের হাতে দেয়। এরপর ফোন নিয়ে অপ্রতিম ও তুহিনের মধ্যে কথা-কাটাকাটি শুরু হয়।

পুলিশও আগে জানিয়েছিল, অপ্রতিম আইফোনটি নেওয়ার চেষ্টা করলে তুহিন বাধা দেন। এরপরই মারধরের ঘটনা ঘটে।

তিন আসামির জবানবন্দিতে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মিল পাওয়া যায়—অপ্রতিমকে প্রথম আঘাত করেন তুহিন। প্রথমে তাকে থাপ্পড় মারার পর পাশে পড়ে থাকা কোদালের হাতল দিয়ে মাথায় আঘাত করেন তুহিন। এরপর অন্য দুজনকেও মারতে বলেন বলে জবানবন্দিতে এসেছে।

দোকানে কর্মরত কিশোরটির বক্তব্যেও তুহিনের হাতে কোদালের হাতল দিয়ে অপ্রতিমের মাথায় প্রথম আঘাত করার কথা রয়েছে। তৃতীয় কিশোরও জানিয়েছে, তুহিনই প্রথম ওই হাতল দিয়ে অপ্রতিমকে আঘাত করেন।

আইফোন বিক্রি করে টাকা ভাগের পরিকল্পনা

তিন জবানবন্দিতে হত্যার উদ্দেশ্য নিয়েও মিল পাওয়া গেছে। তুহিন বলেছেন, অপ্রতিমের আইফোনের প্রতি তাদের লোভ হয়েছিল।

দ্বিতীয় কিশোর তার জবানবন্দিতে জানিয়েছে, আইফোনটি বিক্রি করে তুহিন তাকে টাকার ভাগ দেওয়ার কথা বলেছিল। তৃতীয় কিশোরের বক্তব্যেও একই ধরনের তথ্য রয়েছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, তাকে বলা হয়েছিল আইফোনটি বিক্রি করে টাকা ভাগ করে দেওয়া হবে।

হত্যার পর কে কোথায়

অপ্রতিমের মৃত্যুর পর কে কোথায় ছিলেন, সেই বর্ণনায় তিন আসামির বক্তব্যে কিছুটা পার্থক্য রয়েছে।

তুহিন বলেছেন, অপ্রতিম মারা যাওয়ার পর অন্য দুজন একদিকে চলে যায় এবং তিনি অন্যদিকে গিয়ে বাসায় ফেরেন।

দ্বিতীয় জবানবন্দিতে বলা হয়েছে, অপ্রতিম মারা যাওয়ার পর দুই কিশোর একসঙ্গে ঘটনাস্থল ছেড়ে যায়। তখন তুহিন সেখানে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তৃতীয় কিশোরও জানিয়েছে, সে ও তার বন্ধু একসঙ্গে চলে আসে এবং তুহিন অন্যদিকে যান।

তবে অপ্রতিমের আইফোন শেষ পর্যন্ত তুহিনের কাছেই ছিল—তিনজনের বয়ানেই এমন তথ্য উঠে এসেছে।

তুহিনের বন্ধু সিয়ামকে নিয়েও বক্তব্য

তুহিনের জবানবন্দিতে তার বন্ধু মো. সিয়ামকে (১৯) নিয়ে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য এসেছে।

তুহিনের ভাষ্য অনুযায়ী, হত্যার পর বাসায় ফিরে তিনি সিয়ামকে ফোন করে ডেকে আনেন এবং তাকে পুরো ঘটনা জানান। হত্যার পরিকল্পনার কথা সিয়াম আগে থেকেই জানতেন বলেও তুহিনের জবানবন্দিতে দাবি করা হয়েছে।

তবে অন্য দুই আসামির জবানবন্দিতে হত্যার আগের পরিকল্পনার সঙ্গে সিয়ামের সম্পৃক্ততার কথা নেই।

পুলিশ পরে সিয়ামকে সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠায়। পুলিশের ভাষ্য ছিল, সিয়াম সরাসরি হত্যাকাণ্ডে অংশ নেননি; তবে ঘটনার কথা জানার পর তা গোপন করেছিলেন। পুলিশ সূত্রের দাবি, হত্যার দিন রাতেই তুহিন সিয়ামের সঙ্গে দেখা করে তাকে হত্যাকাণ্ডের বিস্তারিত জানান।

হত্যার পরও অপ্রতিমকে খোঁজার দাবি

জবানবন্দিগুলোতে ঘটনার পরের দিনের আচরণের বর্ণনাও রয়েছে।

তুহিন বলেছেন, হত্যার পরদিন সকালে অপ্রতিমের মামা তাকে ফোন করে অপ্রতিমের খোঁজ করেন। এরপর তিনি সিয়ামকে নিয়ে কোটবাড়িতে অপ্রতিমকে খুঁজতে যান।

অপ্রতিমের বাবার দোকানে কর্মরত কিশোরটি জানিয়েছে, পরদিন সে অপ্রতিমের বাবার একজন সহকারীর সঙ্গে অপ্রতিমকে খুঁজেছে। পরে অপ্রতিমের মরদেহ উদ্ধারের খবর শুনে সেও ঘটনাস্থলে যায়।

অন্য কিশোর জানিয়েছে, মরদেহ উদ্ধারের পর সে ও তার বন্ধু সন্ধ্যায় ফেসবুকে অপ্রতিমের মৃত্যুতে দুঃখ প্রকাশ করে স্ট্যাটাস দেয়।

এর মধ্যেই পুলিশ সিসিটিভি ফুটেজসহ বিভিন্ন তথ্য বিশ্লেষণ করে তুহিনকে শনাক্ত করে। তাকে জিজ্ঞাসাবাদের পর অন্যদের বিষয়ে তথ্য পাওয়া যায় বলে পুলিশ জানিয়েছে।

মামলাটিতে তিন আসামির আদালতে দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে হত্যার পরিকল্পনা, আইফোনকে কেন্দ্র করে বিরোধ এবং হামলার বিষয়ে বেশ কিছু মিল পাওয়া গেলেও ঘটনার বিভিন্ন পর্যায়ে তাদের বক্তব্যে কিছু পার্থক্যও রয়েছে। এসব তথ্য মামলার তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে বিবেচিত হবে।

আইফোনের লোভে ১৩ বছরের অপ্রতিমকে হত্যা, তিন আসামির জবানবন্দিতে চাঞ্চল্যকর তথ্য

সময় : ১২:১৮:২৬ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

কুমিল্লা প্রতিনিধি: আইফোন দিয়ে ছবি তোলা ও টিকটক ভিডিও তৈরির মধ্য দিয়ে গড়ে উঠেছিল সম্পর্ক। সেই সম্পর্কের সুযোগ নিয়েই আইফোনের লোভে ১৩ বছর বয়সী ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয় ঘটনার সাত দিন আগে। ছবি তোলার কথা বলে অপ্রতিমকে কুমিল্লার লালমাই পাহাড়ের নির্জন এলাকায় নিয়ে যাওয়ার পর আইফোন কেড়ে নেওয়াকে কেন্দ্র করে কোদালের হাতল দিয়ে আঘাত করে তাকে হত্যা করা হয় বলে তিন আসামির আদালতে দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে উঠে এসেছে।

কুমিল্লার অপ্রতিম হত্যা মামলায় তিন আসামির ১৬৪ ধারায় দেওয়া জবানবন্দিতে হত্যার পরিকল্পনা, অপ্রতিমকে পাহাড়ে নিয়ে যাওয়া, আইফোন নেওয়া এবং তাকে আঘাত করার বিষয়ে বেশ কিছু মিল পাওয়া গেছে। তবে হত্যাকাণ্ডের সময়ের ঘটনাক্রম ও ঘটনার পর কে কোথায় গিয়েছিল—এসব বিষয়ে তাদের বক্তব্যে কিছুটা পার্থক্য রয়েছে।

কুমিল্লা বর্ডার গার্ড পাবলিক স্কুলের সপ্তম শ্রেণির ছাত্র অপ্রতিম ১৮ সেপ্টেম্বর শুক্রবার বাসা থেকে বের হওয়ার পর নিখোঁজ হয়। পরদিন কুমিল্লা সদর দক্ষিণের সানন্দা গ্রামের লালমাই পাহাড়ের নির্জন জঙ্গল থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

এ ঘটনায় গ্রেপ্তার সাইফুল ইসলাম ওরফে তুহিন (১৯) এবং অপ্রাপ্তবয়স্ক দুই কিশোর ২০ সেপ্টেম্বর রাতে কুমিল্লার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, তিন জবানবন্দির মধ্যে হত্যার পরিকল্পনা সম্পর্কে সবচেয়ে বিস্তারিত বক্তব্য দিয়েছেন তুহিন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, পাঁচ-ছয় মাস ধরে অপ্রতিমের সঙ্গে তার পরিচয় ছিল। তুহিনের বন্ধু সিয়ামের মোটরসাইকেলে করে ছবি তোলা ও টিকটক ভিডিও তৈরির জন্য অপ্রতিম তাদের সঙ্গে বের হতো।

তুহিনের জবানবন্দি অনুযায়ী, অপ্রতিমের আইফোনের প্রতি তার ও অপ্রতিমের বাবার দোকানে কর্মরত এক কিশোরের লোভ হয়। ঘটনার আগের শুক্রবার সন্ধ্যায় কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ফটকের কিছুটা সামনে তাদের দেখা হয়। সেখানেই আইফোন নেওয়া এবং অপ্রতিমকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয় বলে তুহিনের বক্তব্যে এসেছে।

অপ্রতিমের বাবার দোকানে কর্মরত ওই কিশোরের জবানবন্দিতেও আগের শুক্রবারের ওই বৈঠকের কথা এসেছে। তবে সে পরিকল্পনার দায় মূলত তুহিনের ওপর দিয়েছে। তার বক্তব্য অনুযায়ী, তুহিন আইফোনের জন্য অপ্রতিমকে হত্যার পরিকল্পনা করে।

অন্য কিশোরের জবানবন্দিতেও একই ধরনের তথ্য পাওয়া গেছে। সে জানিয়েছে, ঘটনার দিন বিকেলে তার বন্ধু তাকে পরিকল্পনার কথা জানায়—তুহিনের সঙ্গে মিলে আইফোনের জন্য অপ্রতিমকে হত্যা করা হবে।

অর্থাৎ তিন জবানবন্দির একটি গুরুত্বপূর্ণ মিল হলো, হত্যার সিদ্ধান্ত তাৎক্ষণিকভাবে নেওয়া হয়নি। আইফোনকে কেন্দ্র করে আগেই হত্যার পরিকল্পনা করা হয়েছিল বলে তিন আসামির বক্তব্যে উঠে এসেছে।

ছবি তোলার কথা বলে পাহাড়ে নেওয়া

তুহিনের জবানবন্দি অনুযায়ী, হত্যার আগের দিন ১৭ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় ময়নামতির একটি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের সামনে অপ্রতিমের সঙ্গে তার দেখা হয়। অপ্রতিম তাকে নিজের টিকটক অ্যাকাউন্টের ঠিকানা দেয়। ওই রাতেই টিকটকে অপ্রতিমকে মেসেজ করেন তুহিন। পরে অপ্রতিম একটি মুঠোফোন নম্বর দিলে সেই নম্বরে কথা হয়। পরদিন জুমার নামাজের পর দেখা করার সিদ্ধান্ত হয়।

অপ্রতিম তার বাবার দোকানে কর্মরত ওই কিশোরকেও একই সময়ে আসতে বলেছিল বলে তুহিনের বক্তব্যে এসেছে। তাদের কথা ছিল ছবি তোলার। তিন আসামির জবানবন্দি অনুযায়ী, ছবি তোলার এই সম্পর্কই অপ্রতিমকে নির্জন পাহাড়ি এলাকায় নিয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি করে।

তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, ১৩ বছর বয়সী অপ্রতিমের চেয়ে পাঁচ থেকে ১০ বছরের বড় যুবকদের সঙ্গে তার মেলামেশা ও সম্পর্ককে তারা ‘অসম বন্ধুত্ব’ হিসেবে দেখছেন।

পাহাড়ে নিয়ে যাওয়ার বর্ণনায় মিল

১৮ সেপ্টেম্বর বিকেলে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ফটকের সামনে অপ্রতিমের সঙ্গে তুহিনের দেখা হয় বলে তার জবানবন্দিতে উল্লেখ রয়েছে। এরপর অপ্রতিমকে ‘বুদ্ধি দিয়ে’ সানন্দা পশ্চিমপাড়ার দিকে নিয়ে যান তুহিন। জায়গাটি নির্জন এবং সেটি তার চাচা শাহ আলমের পাহাড় বলে জবানবন্দিতে উল্লেখ করেছেন তিনি।

অন্যদিকে অপ্রতিমের বাবার দোকানে কর্মরত কিশোরটি জানিয়েছে, বেলা দুইটার পর কোটবাড়ির বোর্ড মার্কেট এলাকায় তার সঙ্গে অপ্রতিমের দেখা হয়। পরে সন্ধ্যার আগে সে তার আরেক কিশোর বন্ধুকে নিয়ে পাহাড়ে যায়। যাওয়ার আগেই ওই বন্ধুকে হত্যার পরিকল্পনার কথা জানায়।

তৃতীয় কিশোরের বক্তব্যও অনেকটা কাছাকাছি। সে জানিয়েছে, বেলা ৩টা ৪০ মিনিটের দিকে একটি স্কুলের সামনে তার সঙ্গে ওই কিশোরের দেখা হয়। সেখানেই সে হত্যার পরিকল্পনার কথা জানতে পারে। এরপর বিকেল চারটার পর তারা পাহাড়ে যায় এবং সেখানে অপ্রতিম ও তুহিনকে বসে থাকতে দেখে।

চারজন একত্র হওয়ার পর কিছু সময় গল্প ও আড্ডা হয়—এই বিষয়েও তিন জবানবন্দির মধ্যে মিল রয়েছে।

আইফোন নিয়ে বিরোধ, প্রথম আঘাত তুহিনের

দোকানে কর্মরত কিশোরটি জবানবন্দিতে জানিয়েছে, সে অপ্রতিমের কাছে ফোন চাইলে অপ্রতিম সেটি তাকে দেয়। কিছুক্ষণ ব্যবহারের পর সে ফোনটি তুহিনের হাতে দেয়।

তুহিনের জবানবন্দিতেও একই ধরনের বর্ণনা পাওয়া যায়। ওই কিশোর অপ্রতিমের কাছ থেকে আইফোন নিয়ে কিছুক্ষণ ব্যবহারের পর সেটি অপ্রতিমকে ফেরত না দিয়ে তুহিনের হাতে দেয়। এরপর ফোন নিয়ে অপ্রতিম ও তুহিনের মধ্যে কথা-কাটাকাটি শুরু হয়।

পুলিশও আগে জানিয়েছিল, অপ্রতিম আইফোনটি নেওয়ার চেষ্টা করলে তুহিন বাধা দেন। এরপরই মারধরের ঘটনা ঘটে।

তিন আসামির জবানবন্দিতে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মিল পাওয়া যায়—অপ্রতিমকে প্রথম আঘাত করেন তুহিন। প্রথমে তাকে থাপ্পড় মারার পর পাশে পড়ে থাকা কোদালের হাতল দিয়ে মাথায় আঘাত করেন তুহিন। এরপর অন্য দুজনকেও মারতে বলেন বলে জবানবন্দিতে এসেছে।

দোকানে কর্মরত কিশোরটির বক্তব্যেও তুহিনের হাতে কোদালের হাতল দিয়ে অপ্রতিমের মাথায় প্রথম আঘাত করার কথা রয়েছে। তৃতীয় কিশোরও জানিয়েছে, তুহিনই প্রথম ওই হাতল দিয়ে অপ্রতিমকে আঘাত করেন।

আইফোন বিক্রি করে টাকা ভাগের পরিকল্পনা

তিন জবানবন্দিতে হত্যার উদ্দেশ্য নিয়েও মিল পাওয়া গেছে। তুহিন বলেছেন, অপ্রতিমের আইফোনের প্রতি তাদের লোভ হয়েছিল।

দ্বিতীয় কিশোর তার জবানবন্দিতে জানিয়েছে, আইফোনটি বিক্রি করে তুহিন তাকে টাকার ভাগ দেওয়ার কথা বলেছিল। তৃতীয় কিশোরের বক্তব্যেও একই ধরনের তথ্য রয়েছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, তাকে বলা হয়েছিল আইফোনটি বিক্রি করে টাকা ভাগ করে দেওয়া হবে।

হত্যার পর কে কোথায়

অপ্রতিমের মৃত্যুর পর কে কোথায় ছিলেন, সেই বর্ণনায় তিন আসামির বক্তব্যে কিছুটা পার্থক্য রয়েছে।

তুহিন বলেছেন, অপ্রতিম মারা যাওয়ার পর অন্য দুজন একদিকে চলে যায় এবং তিনি অন্যদিকে গিয়ে বাসায় ফেরেন।

দ্বিতীয় জবানবন্দিতে বলা হয়েছে, অপ্রতিম মারা যাওয়ার পর দুই কিশোর একসঙ্গে ঘটনাস্থল ছেড়ে যায়। তখন তুহিন সেখানে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তৃতীয় কিশোরও জানিয়েছে, সে ও তার বন্ধু একসঙ্গে চলে আসে এবং তুহিন অন্যদিকে যান।

তবে অপ্রতিমের আইফোন শেষ পর্যন্ত তুহিনের কাছেই ছিল—তিনজনের বয়ানেই এমন তথ্য উঠে এসেছে।

তুহিনের বন্ধু সিয়ামকে নিয়েও বক্তব্য

তুহিনের জবানবন্দিতে তার বন্ধু মো. সিয়ামকে (১৯) নিয়ে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য এসেছে।

তুহিনের ভাষ্য অনুযায়ী, হত্যার পর বাসায় ফিরে তিনি সিয়ামকে ফোন করে ডেকে আনেন এবং তাকে পুরো ঘটনা জানান। হত্যার পরিকল্পনার কথা সিয়াম আগে থেকেই জানতেন বলেও তুহিনের জবানবন্দিতে দাবি করা হয়েছে।

তবে অন্য দুই আসামির জবানবন্দিতে হত্যার আগের পরিকল্পনার সঙ্গে সিয়ামের সম্পৃক্ততার কথা নেই।

পুলিশ পরে সিয়ামকে সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠায়। পুলিশের ভাষ্য ছিল, সিয়াম সরাসরি হত্যাকাণ্ডে অংশ নেননি; তবে ঘটনার কথা জানার পর তা গোপন করেছিলেন। পুলিশ সূত্রের দাবি, হত্যার দিন রাতেই তুহিন সিয়ামের সঙ্গে দেখা করে তাকে হত্যাকাণ্ডের বিস্তারিত জানান।

হত্যার পরও অপ্রতিমকে খোঁজার দাবি

জবানবন্দিগুলোতে ঘটনার পরের দিনের আচরণের বর্ণনাও রয়েছে।

তুহিন বলেছেন, হত্যার পরদিন সকালে অপ্রতিমের মামা তাকে ফোন করে অপ্রতিমের খোঁজ করেন। এরপর তিনি সিয়ামকে নিয়ে কোটবাড়িতে অপ্রতিমকে খুঁজতে যান।

অপ্রতিমের বাবার দোকানে কর্মরত কিশোরটি জানিয়েছে, পরদিন সে অপ্রতিমের বাবার একজন সহকারীর সঙ্গে অপ্রতিমকে খুঁজেছে। পরে অপ্রতিমের মরদেহ উদ্ধারের খবর শুনে সেও ঘটনাস্থলে যায়।

অন্য কিশোর জানিয়েছে, মরদেহ উদ্ধারের পর সে ও তার বন্ধু সন্ধ্যায় ফেসবুকে অপ্রতিমের মৃত্যুতে দুঃখ প্রকাশ করে স্ট্যাটাস দেয়।

এর মধ্যেই পুলিশ সিসিটিভি ফুটেজসহ বিভিন্ন তথ্য বিশ্লেষণ করে তুহিনকে শনাক্ত করে। তাকে জিজ্ঞাসাবাদের পর অন্যদের বিষয়ে তথ্য পাওয়া যায় বলে পুলিশ জানিয়েছে।

মামলাটিতে তিন আসামির আদালতে দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে হত্যার পরিকল্পনা, আইফোনকে কেন্দ্র করে বিরোধ এবং হামলার বিষয়ে বেশ কিছু মিল পাওয়া গেলেও ঘটনার বিভিন্ন পর্যায়ে তাদের বক্তব্যে কিছু পার্থক্যও রয়েছে। এসব তথ্য মামলার তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে বিবেচিত হবে।