বাংলাদেশে এআইয়ের প্রভাবে চাকরি হারানোর চেয়ে বদলাবে কাজের ধরন
নিজস্ব প্রতিবেদক: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই নিয়ে বিশ্বজুড়ে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের একটি হলো, এই প্রযুক্তির ব্যাপক ব্যবহার কত মানুষের চাকরি কেড়ে নেবে। তবে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোর ক্ষেত্রে চিত্র কিছুটা ভিন্ন হতে পারে। এআইয়ের কল্যাণে এসব দেশে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়ার পাশাপাশি উৎপাদনশীলতা ও নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
বিশ্বব্যাংকের ‘ওয়ার্ল্ড ডেভেলপমেন্ট রিপোর্ট ২০২৬: দ্য প্রমিজ অব আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স’ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এআইয়ের কারণে উন্নয়নশীল দেশগুলোর কিছু খাতে কর্মসংস্থান কমতে পারে। তবে একই সঙ্গে কর্মীদের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং নতুন কাজের সুযোগ তৈরির সম্ভাবনাও রয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোর বিদ্যমান চাকরির প্রায় ৪ দশমিক ৫ শতাংশ জেনারেটিভ এআইয়ের কারণে পুরোপুরি স্বয়ংক্রিয় হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। উচ্চ আয়ের দেশগুলোতে এ হার ১৪ দশমিক ২ শতাংশ। আবার এসব দেশের ১৬ দশমিক ২ শতাংশ চাকরিতে এআই মানুষের কাজকে সহায়তা করতে পারে।
তথ্যপ্রযুক্তি ও যোগাযোগ (আইসিটি), অর্থ ও ব্যবসায়িক সেবার মতো চিন্তাশক্তিনির্ভর কাজের খাতগুলোতে এআই দিয়ে কাজ স্বয়ংক্রিয় করার সুযোগ তুলনামূলক বেশি। তবে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে এসব খাতে কর্মরত মানুষের সংখ্যা তুলনামূলক কম। ফলে বাংলাদেশের মতো দেশগুলো এআইয়ের তাৎক্ষণিক প্রভাবের ক্ষেত্রে কিছুটা সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে।
এ কারণে বাংলাদেশে এআইয়ের তাৎক্ষণিক প্রভাবে বিপুলসংখ্যক মানুষের চাকরি চলে যাওয়ার সম্ভাবনা কম বলে মনে করা হচ্ছে। বরং কাজের ধরন ও কর্মীদের দক্ষতায় পরিবর্তন আসার সম্ভাবনাই বেশি।
সবচেয়ে ঝুঁকিতে তরুণসমাজ
এআইয়ের প্রভাব সবার ওপর সমানভাবে পড়বে না। বিশ্বব্যাংকের মতে, দক্ষিণ এশিয়ায় তরুণ ও মাঝারি দক্ষতার কর্মীরা তুলনামূলক বেশি ঝুঁকিতে পড়তে পারেন।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চ্যাটজিপিটি আসার পর এআই দিয়ে স্বয়ংক্রিয় করা তুলনামূলক সহজ—এমন কাজের চাহিদা কমেছে। তবে উচ্চ আয়ের দেশগুলোর তুলনায় নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে এর প্রভাব এখনো অনেক কম।
চীনে জেনারেটিভ এআই চালুর পর চাকরির বিজ্ঞপ্তি কমেছে। ভারতেও জেনারেটিভ এআই চালুর পর এআই দিয়ে করা তুলনামূলক সহজ এমন উচ্চ দক্ষতার সেবা খাতের চাকরির বিজ্ঞপ্তি কমেছে। এই পরিবর্তনের প্রভাব তুলনামূলকভাবে তরুণদের ওপর বেশি পড়েছে।
ছোট ব্যবসায় এআইয়ের সুবিধা
নিম্ন ও নিম্নমধ্যম আয়ের দেশগুলোতে অধিকাংশ মানুষ খুব ছোট ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে কাজ করেন। প্রায় ৯০ শতাংশ কর্মী এমন প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন, যেখানে কর্মীসংখ্যা ১০ জনের কম। অর্ধেকের বেশি মানুষ নিজেদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেন। এসব ছোট ব্যবসার বড় অংশ কৃষি, খুচরা বিক্রি এবং আবাসন ও খাদ্যসেবা খাতে।
বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ছোট ব্যবসার জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করছে এআই। ব্যবসায় ব্যবহৃত মেসেজিং অ্যাপ, ব্যবসায়িক সফটওয়্যার ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে এআই আরও কার্যকর করে তুলতে পারে। ফলে বড় ধরনের প্রযুক্তিগত বিনিয়োগ ছাড়াই ছোট ব্যবসাগুলো এআইয়ের সুবিধা নিতে পারে।
ভারত, জর্ডান, কেনিয়া, মেক্সিকো, নাইজেরিয়া ও থাইল্যান্ডের অনেক ছোট প্রতিষ্ঠান ইতিমধ্যে ব্যবসায়িক কাজে এআই চ্যাটবট ব্যবহার শুরু করেছে। যুক্তরাষ্ট্রে ছোট ব্যবসায় এআই ব্যবহারের হার প্রায় এক-চতুর্থাংশ।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, উন্নত ইন্টারনেট অবকাঠামো না থাকলেও এআই ব্যবহারের মাধ্যমে উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। তবে এআই কার্যকরভাবে কাজে লাগাতে কর্মীদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দিতে হবে।
বাংলাদেশের সফলতা ও করণীয়
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ একেবারে পিছিয়ে নেই। বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের একটি উল্লেখযোগ্য সফলতার কথা তুলে ধরা হয়েছে। এআইনির্ভর মেডিকেল ইমেজিং ব্যবহারের ফলে ডায়াবেটিসজনিত চোখের জটিলতা শনাক্তের পরীক্ষা প্রতিদিন প্রায় ৪০ শতাংশ বেড়েছে।
দেশে সরকারি ডিজিটাল সেবার ভিত্তিও আগে থেকেই তৈরি হয়েছে। এখন সেই ভিত্তিকে এআই ব্যবহারের ক্ষেত্রেও কাজে লাগানো সম্ভব। কৃষি, স্বাস্থ্য ও নাগরিকসেবায় এআই ব্যবহারের উদ্যোগ ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে।
তবে এই সাফল্যের পাশাপাশি সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। মোবাইল ফোনের তথ্য ব্যবহার করে দরিদ্র পরিবার শনাক্তের এআইভিত্তিক একটি পদ্ধতি প্রত্যাশিত সফলতা পায়নি। প্রচলিত ব্যবস্থায় যতটা নির্ভুল তথ্য পাওয়া যায়, এই পদ্ধতিতে ততটা নির্ভুলতা পাওয়া যায়নি।
এই পরিস্থিতিতে বিশ্বব্যাংকের পরামর্শ হলো, অন্য দেশের প্রযুক্তি সরাসরি ব্যবহারের পরিবর্তে বাংলাদেশের স্থানীয় বাস্তবতায় তা যাচাই করে প্রয়োজন অনুযায়ী খাপ খাইয়ে নেওয়া।
এ ছাড়া জাতীয় এআই নীতির প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো কার্যকর করা, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের প্রযুক্তি গ্রহণে নিয়ন্ত্রক ও বৈদেশিক মুদ্রাজনিত বাধা কমানো এবং ডিজিটাল অবকাঠামো ও দক্ষতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
কানাডীয় অর্থনীতিবিদ জ্যঁ-লুই আরকাঁ ঢাকায় বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সানেম আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে এআইয়ের প্রভাব নিয়ে একই ধরনের মতামত দিয়েছেন। তাঁর মতে, যেসব অর্থনীতিতে দক্ষতার ঘাটতি রয়েছে, তারা এআই থেকে তুলনামূলকভাবে বেশি লাভবান হতে পারে। এর মাধ্যমে দক্ষতার ব্যবধানও কিছুটা কমানো সম্ভব।
তবে এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো, এআই গ্রহণের খরচ দেশভেদে খুব বেশি ভিন্ন হওয়া যাবে না। অর্থাৎ এআইয়ের সুফল পাওয়ার ক্ষেত্রে ধনী ও দরিদ্র দেশের মধ্যে ব্যবধান শুধু দক্ষতার ঘাটতির কারণে নয়, প্রযুক্তি গ্রহণের খরচের পার্থক্যের কারণেও হতে পারে।
জ্যঁ-লুই আরকাঁর মতে, এআইয়ের সুফল পেতে ডিজিটাল অবকাঠামো, ইন্টারনেট সংযোগ, নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ এবং এআই ব্যবহারের সহায়ক প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ নিশ্চিত করা জরুরি। তাঁর মূল বক্তব্য হলো, বাংলাদেশের দক্ষতার ঘাটতি কিছুটা পুষিয়ে দেওয়ার সুযোগ তৈরি করতে পারে এআই। তবে সেই সুযোগ কাজে লাগাতে প্রযুক্তি গ্রহণের খরচ কমানো এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামো তৈরিতে জোর দিতে হবে।
কাজ হারানোর শঙ্কা
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, অটোমেশন ও প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন ব্যবস্থার দ্রুত বিস্তারে বাংলাদেশের শ্রমবাজার বড় ধরনের পরিবর্তনের মুখে পড়েছে। প্রয়োজনীয় নীতিগত প্রস্তুতি না থাকায় আগামী দিনে দেশের কর্মসংস্থান, বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাতের লাখো শ্রমিক ঝুঁকিতে পড়তে পারেন বলে সতর্ক করেছে গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)।
সিপিডির ‘ইজ বাংলাদেশ রেডি ফর দ্য ফিউচার অব ওয়ার্ক’ শীর্ষক নীতিপত্রে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের শ্রমবাজার বড় ধরনের পরিবর্তনের মুখে রয়েছে। উৎপাদন খাত, বিশেষ করে তৈরি পোশাকশিল্প অটোমেশন ও প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের চাপে রয়েছে।
অটোমেশনের কারণে তৈরি পোশাক খাতের সর্বোচ্চ ১২ লাখ ২০ হাজার চাকরি ঝুঁকিতে রয়েছে। ২০৪১ সালের মধ্যে নারী পোশাকশ্রমিকদের প্রায় ৬০ শতাংশের কর্মসংস্থান বিলুপ্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই পরিবর্তনের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে এলডিসি উত্তরণ, বৈশ্বিক বাণিজ্যের পরিবর্তন, জলবায়ু পরিবর্তন ও ডিজিটাল অর্থনীতি। ২০২৪ সালে দেশে প্রায় ১৩ লাখ কর্মসংস্থান কমেছে, যার প্রায় ৯০ শতাংশ নারী কর্মী। উৎপাদন বাড়লেও উৎপাদন খাতে কর্মসংস্থান প্রায় ৮১ লাখে স্থির রয়েছে।
অন্যদিকে সেবা খাতে প্রায় ২ কোটি ৫০ লাখ মানুষ কাজ করলেও তাঁদের বড় একটি অংশ অনিরাপদ ও কম উৎপাদনশীল কাজে নিয়োজিত।
প্রয়োজন পরিবর্তনের প্রস্তুতি
শ্রম গবেষক ও উৎপাদন খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, অটোমেশন বা উচ্চ প্রযুক্তি গ্রহণ ও ব্যবহার অনিবার্য। এর বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই। তাই এই পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে এখন থেকেই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
তবে এই মুহূর্তে অটোমেশনের কারণে বিপুলসংখ্যক মানুষের কাজ চলে যাবে বলে মনে করেন না উৎপাদন খাতসংশ্লিষ্টরা।
শ্রম অধিকার ও গবেষণাভিত্তিক বেসরকারি সংস্থা বিলসের নির্বাহী পরিচালক সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদ বলেন, অটোমেশনের ঝুঁকি মোকাবিলায় বাংলাদেশে সবচেয়ে বড় ঘাটতি হলো প্রস্তুতি ও বিকল্প কর্মসংস্থানের পরিকল্পনার অভাব। এ কারণে সরকার, শিল্পমালিক, শ্রমিক সংগঠন, ব্যাংক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন। কিন্তু এ ক্ষেত্রে এখনো ঘাটতি রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, অটোমেশনের আগেই কর্মীদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। একই সঙ্গে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং কর্মহীন মানুষের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও জরুরি।
তবে অটোমেশনের জন্য বিপুল বিনিয়োগ প্রয়োজন। একসঙ্গে এত অর্থ জোগাড় করা সবার পক্ষে সম্ভব হবে না। ফলে এই প্রক্রিয়া বাস্তবায়নে সময় লাগবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য এআই নতুন সুযোগ তৈরি করলেও এর সুফল স্বয়ংক্রিয়ভাবে আসবে না। এআই গ্রহণের পাশাপাশি বিদ্যুৎ, ইন্টারনেট, ডিজিটাল অবকাঠামো, দক্ষতা, তথ্যব্যবস্থা ও কার্যকর প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে হবে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, নিজস্ব অত্যাধুনিক এআই ব্যবস্থা তৈরির চেয়ে বিদ্যমান প্রযুক্তি গ্রহণ করে স্থানীয় প্রয়োজন অনুযায়ী তা পরিবর্তন করে নেওয়া বেশি বাস্তবসম্মত। এআই যেমন কর্মসংস্থান ও উৎপাদনশীলতা বাড়াতে পারে, তেমনি কিছু কাজ হারানোর ঝুঁকিও তৈরি করতে পারে।
তাই বাংলাদেশের জন্য মূল চ্যালেঞ্জ শুধু এআই গ্রহণ করা নয়; বরং স্থানীয় বাস্তবতার সঙ্গে প্রযুক্তিকে খাপ খাইয়ে নিয়ে কর্মীদের দক্ষ করে তোলা এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নিশ্চিত করা। সঠিক প্রস্তুতি ও নীতিগত উদ্যোগ থাকলে এআই বাংলাদেশের শ্রমবাজারে শুধু ঝুঁকি নয়, নতুন সম্ভাবনাও তৈরি করতে পারে।
























