শিশুদের মধ্যে দ্রুত বাড়ছে ফ্যাটি লিভার: কারণ, লক্ষণ ও প্রতিরোধের উপায়
শিশুদের মধ্যে দ্রুত বাড়ছে ফ্যাটি লিভার: কারণ, লক্ষণ ও প্রতিরোধের উপায়
এক সময় ফ্যাটি লিভার বা যকৃতে চর্বি জমার সমস্যাকে মূলত প্রাপ্তবয়স্কদের রোগ হিসেবে বিবেচনা করা হতো। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চিকিৎসকদের পর্যবেক্ষণে দেখা যাচ্ছে, শিশু ও কিশোর-কিশোরীদের মধ্যেও এই রোগ দ্রুত বাড়ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি বর্তমানে তরুণদের মধ্যে সবচেয়ে দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়া দীর্ঘস্থায়ী লিভারের রোগগুলোর একটি।
শিশুদের মধ্যে ফ্যাটি লিভার কেন বাড়ছে?
গবেষণায় দেখা গেছে, ১৯৭৫ সালে শিশু ও কিশোরদের স্থূলতার হার ছিল মাত্র ৪ শতাংশ। ২০১৬ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১৮ শতাংশে। এর ফলে বর্তমানে বিশ্বের প্রায় ৫ থেকে ১০ শতাংশ শিশু ফ্যাটি লিভারে আক্রান্ত।
ভারতে ১১ থেকে ১৫ বছর বয়সি অতিরিক্ত ওজনের শিশুদের ওপর পরিচালিত এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, তাদের প্রায় ৬২ শতাংশের শরীরে কোনো লক্ষণ ছাড়াই ফ্যাটি লিভার রয়েছে। কিছু প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশটির প্রায় ৩৫ শতাংশ শিশুরও এই সমস্যা থাকতে পারে।
কেন এই রোগকে ‘নীরব ঘাতক’ বলা হয়?
ফ্যাটি লিভারের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, এটি দীর্ঘ সময় কোনো স্পষ্ট লক্ষণ ছাড়াই শরীরে বাসা বাঁধে। ধীরে ধীরে যকৃতে চর্বি জমে প্রদাহ সৃষ্টি করে এবং লিভারের ক্ষতি করতে পারে।
সময়মতো শনাক্ত না হলে ভবিষ্যতে এটি—
- টাইপ-২ ডায়াবেটিস
- হৃদরোগ
- লিভার সিরোসিস
- গুরুতর লিভারের জটিলতা
সৃষ্টির ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
ফ্যাটি লিভারের প্রধান কারণ
১. অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস
অতিরিক্ত চিনিযুক্ত পানীয়, ফাস্টফুড, প্রক্রিয়াজাত খাবার এবং অতিরিক্ত ক্যালরি গ্রহণ ওজন বৃদ্ধি করে এবং ফ্যাটি লিভারের ঝুঁকি বাড়ায়।
২. শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা
অতিরিক্ত মোবাইল, টিভি বা অন্যান্য স্ক্রিন ব্যবহারের ফলে শিশুদের শারীরিক কার্যকলাপ কমে যায়, যা রোগের ঝুঁকি বাড়ায়।
৩. ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স
বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশুদের ফ্যাটি লিভারের অন্যতম প্রধান কারণ হলো ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স ও বিপাকীয় সমস্যা।
গবেষণায় যা জানা গেছে
গবেষণায় দেখা গেছে, মাত্র আট সপ্তাহ স্বাস্থ্যকর ও কম চিনিযুক্ত খাদ্য গ্রহণ করলে বয়ঃসন্ধিকালীন শিশুদের লিভারের চর্বি উল্লেখযোগ্যভাবে কমতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু কোনো নির্দিষ্ট তেল নয়; অতিরিক্ত ক্যালরি, জিনগত প্রবণতা, স্থূলতা ও শারীরিক নিষ্ক্রিয়তার সম্মিলিত প্রভাবেই ফ্যাটি লিভার তৈরি হয়।
টোকোট্রিয়েনল: সম্ভাবনাময় উপাদান
ভিটামিন ‘ই’-এর একটি বিশেষ রূপ হলো টোকোট্রিয়েনল, যা পাম তেল ও রাইস ব্র্যান অয়েলে পাওয়া যায়।
বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, টোকোট্রিয়েনল—
- লিভারের চর্বি কমাতে সাহায্য করতে পারে
- প্রদাহ কমাতে ভূমিকা রাখতে পারে
- লিভারের স্বাস্থ্য উন্নত করতে সহায়ক হতে পারে
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কোনো সাপ্লিমেন্টই স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের বিকল্প নয়।
কীভাবে প্রতিরোধ করবেন?
শিশুদের ফ্যাটি লিভার প্রতিরোধে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ—
- সুষম ও পুষ্টিকর খাদ্য গ্রহণ
- প্রতিদিন নিয়মিত শারীরিক ব্যায়াম
- ফাস্টফুড ও প্রক্রিয়াজাত খাবার কম খাওয়া
- পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করা
- স্ক্রিন টাইম সীমিত রাখা
- ফল, শাকসবজি, ডাল, গোটা শস্য ও মাছ বেশি খাওয়া
উপসংহার
শিশুদের মধ্যে ফ্যাটি লিভারের ঝুঁকি দ্রুত বাড়ছে, যা ভবিষ্যতে বড় ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তাই ছোটবেলা থেকেই স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত ব্যায়াম এবং সক্রিয় জীবনযাপন নিশ্চিত করা জরুরি। পরিবার, স্কুল ও সমাজের সম্মিলিত উদ্যোগই শিশুদের সুস্থ ভবিষ্যৎ গড়তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
সূত্র: NDTV


























