কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রামের অলওয়েদার সড়কের ৯০ শতাংশ নদীগর্ভে, বিচ্ছিন্ন হাজারো মানুষ
কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধি:
সব মৌসুমে যোগাযোগ ব্যবস্থা সচল রাখতে নির্মাণ করা হয়েছিল কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রামের ‘অলওয়েদার সড়ক’। কিন্তু নির্মাণের মাত্র ৯ বছরের মাথায় সড়কটির দেড় কিলোমিটার অংশের প্রায় ৯০ শতাংশই নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। এতে বাঙ্গালপাড়া ইউনিয়নের কয়েক হাজার মানুষের সড়ক যোগাযোগ কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, সড়কটির অনেক অংশ এখন এতটাই সরু হয়ে গেছে যে দূর থেকে দেখলে তা সুইয়ের মতো মনে হয়। গত দুই সপ্তাহ ধরে উপজেলা ও জেলা সদরের সঙ্গে বাঙ্গালপাড়া ইউনিয়নের সরাসরি যোগাযোগ বন্ধ রয়েছে।
তবে সড়কটি রক্ষার দায়িত্ব নিয়ে সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরগুলোর মধ্যে তৈরি হয়েছে দায় এড়ানোর প্রতিযোগিতা।
এলজিইডি সূত্র জানায়, ২০১৭ সালে ১০ দশমিক ৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এবং ১৬ ফুট প্রশস্ত এই অলওয়েদার সড়ক নির্মাণ করা হয়। এতে ব্যয় হয়েছিল ৪৪ কোটি টাকা। বর্তমানে সড়কটির ১৩ কোটি টাকার সংস্কারকাজ চলমান থাকলেও এর মধ্যেই বড় অংশ নদীভাঙনের শিকার হয়েছে।
ভাঙনের সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত অংশটি পড়েছে বাঙ্গালপাড়া ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডে। স্থানীয় ইউপি সদস্য আমিনুল ইসলাম জানান, সড়কের পাশাপাশি প্রায় ৪০০ একর জমিও নদীতে বিলীন হয়েছে। ১০টি পরিবার ঘরবাড়ি হারিয়েছে।
তিনি বলেন, আগে এই সড়ক ব্যবহার করে অনেক যুবক অটোরিকশা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতেন। এখন সড়ক না থাকায় সেই সুযোগও বন্ধ হয়ে গেছে।
অলওয়েদার সড়কের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে ১৭৭ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন একটি এক কিলোমিটার দীর্ঘ সংযোগ সেতু। সেতুটির এক প্রান্ত অষ্টগ্রাম এবং অপর প্রান্ত ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর উপজেলায়। সেতুটি চালু হলে ঢাকার সঙ্গে যোগাযোগ সহজ হওয়ার কথা থাকলেও সড়ক ভাঙনের কারণে এখন তা অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।
সম্প্রতি সরেজমিনে দেখা যায়, সড়কের নোয়াগাঁও অংশে সবচেয়ে বেশি ভাঙন হয়েছে। কোথাও কোথাও সড়ক ভেঙে সরু হয়ে গেছে, আবার অনেক অংশের অস্তিত্বই নেই।
স্থানীয় বাসিন্দা ফজলুর রহমান বলেন, ভাঙনে তার ঘরবাড়ি চলে গেছে। দীর্ঘদিন ধরে আশ্বাস শুনলেও শেষ পর্যন্ত ঘর ও রাস্তা দুটোই হারাতে হয়েছে।
দায় নিচ্ছে না কোনো দপ্তর
সড়ক রক্ষার দায়িত্ব নিয়ে এলজিইডি ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) মধ্যে তৈরি হয়েছে মতবিরোধ।
এলজিইডির দাবি, তাদের দায়িত্ব শুধু সড়ক নির্মাণ করা। নদীভাঙন থেকে সড়ক রক্ষার দায়িত্ব পাউবোর।
অন্যদিকে পাউবোর কর্মকর্তারা বলছেন, নদীর গতিপথ ও পানির চাপ বিবেচনায় নিয়ে সড়ক নির্মাণের আগে তাদের পরামর্শ নেওয়া হয়নি। তাই এই পরিস্থিতির দায় তাদের নয়।
পাউবো কিশোরগঞ্জের নির্বাহী প্রকৌশলী সাজ্জাদ হোসেন বলেন, বিশাল জলরাশির মধ্যে এ ধরনের সড়ক নির্মাণে বিশেষ পরিকল্পনা প্রয়োজন ছিল। নদীর গতিপথ ও প্রবাহ বিবেচনায় না নেওয়ায় বর্তমান পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
অন্যদিকে এলজিইডির অষ্টগ্রাম উপজেলা প্রকৌশলী মোজাম্মেল হক বলেন, সড়কে পানিপ্রবাহ স্বাভাবিক রাখতে চারটি বড় সেতু ও দুটি পাইপ কালভার্ট রয়েছে। তবে সময়ের সঙ্গে নদীর গতিপথ, চর সৃষ্টি ও স্রোতের ধরন পরিবর্তিত হওয়ায় ভাঙন বেড়েছে।
ভাঙন ঠেকাতে বিআইডব্লিউটিএ ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে নদীর গতিপথ পরিবর্তনের চেষ্টা করলেও তা সফল হয়নি।
বাঙ্গালপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. মনিরুজ্জামান বলেন, সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর কর্মকর্তারা সময়মতো সমন্বয় করে সিদ্ধান্ত নিলে হয়তো সড়কটি এভাবে হারিয়ে যেত না।
কিশোরগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য ফজলুর রহমান বলেন, সড়ক নির্মাণ করেছে স্থানীয় সরকার বিভাগ, কিন্তু নদীভাঙন থেকে রক্ষা করার দায়িত্ব পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের।























