০২:২৯ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৫ অগাস্ট ২০২৬, ৩১ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বাংলাদেশে প্যারাকোয়াট বিষক্রিয়া বাড়ছে, জনস্বাস্থ্যে বড় হুমকি

নিউজ ডেস্ক

বাংলাদেশে কৃষিকাজে ব্যবহৃত প্যারাকোয়াট নিয়ে জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি বাড়ছে বলে গবেষণায় উঠে এসেছে।

নিজস্ব প্রতিবেদক: বাংলাদেশে কৃষিকাজে ব্যবহৃত অত্যন্ত বিষাক্ত আগাছানাশক প্যারাকোয়াট নিয়ে জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি ক্রমেই বাড়ছে। দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়া রোগীদের তথ্য বিশ্লেষণ করে করা সাম্প্রতিক এক গবেষণায় প্যারাকোয়াট বিষক্রিয়ার ঘটনা দ্রুত বাড়ার চিত্র উঠে এসেছে। ২০১৩ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ১০টি হাসপাতালের তথ্য বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা মোট ১ হাজার ৪২০টি প্যারাকোয়াট বিষক্রিয়ার ঘটনা শনাক্ত করেছেন।

ঝিনাইদহ সদর হাসপাতাল সূত্র জানিয়েছে, গত জুলাইয়ে ১১৭ জন রোগী বিষক্রিয়া নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন। তাঁদের মধ্যে বেশির ভাগই আগাছানাশক পান করেছিলেন বলে হাসপাতাল সূত্রের তথ্য। জেলাটিতে আত্মহানির প্রবণতা দীর্ঘদিন ধরেই উদ্বেগের বিষয় হলেও সাম্প্রতিক সময়ে আগাছানাশক ব্যবহারের ঘটনা বেড়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

১০ হাসপাতালের তথ্য নিয়ে গবেষণা

‘ক্লিনিক্যাল অ্যান্ড ল্যাবরেটরি প্রোফাইল অব প্যারাকোয়াট পয়জনিং: এ টক্সিকোলজিক্যাল ক্রাইসিস ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক গবেষণাটি American Journal of Tropical Medicine and Hygiene-এ ১৯ মে ২০২৬ প্রকাশিত হয়েছে। গবেষণায় বাংলাদেশে প্যারাকোয়াট বিষক্রিয়াকে ক্রমবর্ধমান জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

গবেষণাটিতে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা মেডিকেল কলেজসহ দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের গবেষকের পাশাপাশি যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব এডিনবরার গবেষকেরাও অংশ নেন। গবেষকদের মতে, এটি বাংলাদেশে প্যারাকোয়াট বিষক্রিয়া নিয়ে সবচেয়ে বড় গবেষণাগুলোর একটি।

গবেষণায় ২০১৩ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ১০টি তৃতীয় পর্যায়ের হাসপাতালের তথ্য নেওয়া হয়েছে। এসব হাসপাতাল দেশের ৬৫ শতাংশের বেশি জনগোষ্ঠীকে চিকিৎসাসেবা দেয়। গবেষণায় পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০১৩ সালে যেখানে একটি প্যারাকোয়াট বিষক্রিয়ার ঘটনা শনাক্ত হয়েছিল, ২০২৪ সালে সেই সংখ্যা বেড়ে ৪৯৩-এ দাঁড়ায়।

গবেষণায় বিশ্লেষণের জন্য ২৫৭ জন রোগীর বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়। তাঁদের মধ্যে তীব্র কিডনি সমস্যার কারণে পা ফুলে যাওয়া, বমি ও পেটব্যথা ছিল উল্লেখযোগ্য উপসর্গ। গবেষণায় প্যারাকোয়াট বিষক্রিয়ার ক্ষেত্রে মৃত্যুহার ৪৩ দশমিক ২ শতাংশ পাওয়া গেছে।

প্যারাকোয়াটের ব্যবহার বাড়ছে

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্যারাকোয়াট আমদানির পরিমাণও গত এক দশকে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ২০১৩ সালে যেখানে ৫৩ টনের বেশি প্যারাকোয়াট আমদানি হয়েছিল, ২০২৩ সালে তা বেড়ে প্রায় ৪ হাজার ৬৯৫ টনে দাঁড়ায়।

কৃষি-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, গ্রামাঞ্চলে শ্রমিক সংকট ও শ্রমের খরচ বেড়ে যাওয়ায় কৃষকেরা হাত দিয়ে আগাছা পরিষ্কারের পরিবর্তে রাসায়নিক আগাছানাশকের ওপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন। ফলে কৃষিজমিতে প্যারাকোয়াটের ব্যবহারও বেড়েছে।

গবেষকদের মতে, কৃষিকাজে ব্যবহৃত এই রাসায়নিকের সহজলভ্যতা জনস্বাস্থ্যের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাঁরা কৃষিতে প্যারাকোয়াটের ব্যবহার বন্ধ করে তুলনামূলক কম ক্ষতিকর বিকল্প ব্যবহারের সুপারিশ করেছেন।

তরুণদের মধ্যে আক্রান্তের হার বেশি

গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, প্যারাকোয়াট বিষক্রিয়ায় আক্রান্তদের বড় অংশ তরুণ। ১২ থেকে ৩০ বছর বয়সী ব্যক্তিদের অংশ ছিল ৭৮ দশমিক ২ শতাংশ। আক্রান্তদের মধ্যে শিক্ষার্থী ও গৃহিণীদের সংখ্যাও উল্লেখযোগ্য।

গবেষকেরা মনে করছেন, বিষাক্ত কৃষি রাসায়নিকের সহজলভ্যতা আত্মহানির ঝুঁকি বাড়াতে পারে। এ কারণে শুধু চিকিৎসার ওপর নির্ভর না করে ঝুঁকিপূর্ণ রাসায়নিকের সহজপ্রাপ্যতা কমানোও জনস্বাস্থ্য নীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হওয়া উচিত।

চিকিৎসায় জটিলতা, মৃত্যুঝুঁকি বেশি

প্যারাকোয়াট বিষক্রিয়ায় কিডনি, ফুসফুসসহ শরীরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। বাংলাদেশে করা আরেকটি গবেষণাতেও প্যারাকোয়াট বিষক্রিয়ায় কিডনি ও শ্বাসতন্ত্রের গুরুতর জটিলতা এবং উচ্চ মৃত্যুহার পাওয়া গেছে।

২০২৪ সালে প্রকাশিত ওই গবেষণায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে চিকিৎসা নেওয়া ৪২ জন রোগীর তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়। গবেষণাটিতে গুরুতর অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের জটিলতা এবং উচ্চ মৃত্যুহার পাওয়া যায়।

সাম্প্রতিক গবেষণার লেখকেরা জানিয়েছেন, প্যারাকোয়াট বিষক্রিয়ার কার্যকর নির্দিষ্ট প্রতিষেধক নেই। ফলে বিষক্রিয়া প্রতিরোধ এবং ঝুঁকিপূর্ণ রাসায়নিকের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণকেই সবচেয়ে কার্যকর জনস্বাস্থ্য পদক্ষেপ হিসেবে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নিষিদ্ধ

জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকির কারণে বিশ্বের অনেক দেশে প্যারাকোয়াটের ব্যবহার নিষিদ্ধ বা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত। গবেষণায়ও কৃষিতে প্যারাকোয়াটের ব্যবহার নিষিদ্ধ করে তুলনামূলক কম বিষাক্ত বিকল্প ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছে।

গবেষকেরা উল্লেখ করেছেন, বিভিন্ন দেশে কীটনাশক নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে আত্মহানিজনিত বিষক্রিয়া কমানোর নজির রয়েছে। তাই বাংলাদেশেও উচ্চ ঝুঁকির কীটনাশকগুলোর ব্যবহার ও প্রাপ্যতা নিয়ে নতুন করে নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।

বিকল্প আগাছা দমন পদ্ধতির সুযোগ

কৃষি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্যারাকোয়াটের বিকল্প হিসেবে সমন্বিত আগাছা ব্যবস্থাপনা, যান্ত্রিকভাবে আগাছা দমন এবং তুলনামূলক কম বিষাক্ত আগাছানাশক ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে।

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা দেশের নিবন্ধিত উচ্চ ঝুঁকির কীটনাশকগুলো চিহ্নিত করে ঝুঁকি কমানোর বিষয়ে কাজ করেছেন। তাঁদের মতে, কৃষি উৎপাদন অব্যাহত রেখেও ক্ষতিকর রাসায়নিকের ওপর নির্ভরতা কমানো সম্ভব।

নিষিদ্ধের দাবি

টক্সিকোলজি বিশেষজ্ঞ ও গবেষকেরা প্যারাকোয়াটের ক্ষতিকর প্রভাব বিবেচনায় এর ব্যবহার নিষিদ্ধের দাবি জানিয়েছেন। তাঁদের মতে, চিকিৎসার মাধ্যমে বিষক্রিয়ার পরিণতি সামাল দেওয়ার চেয়ে এ ধরনের রাসায়নিকের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করে বিষক্রিয়ার ঘটনা কমানো বেশি কার্যকর।

সাম্প্রতিক গবেষণাতেও বাংলাদেশে প্যারাকোয়াট বিষক্রিয়ার ক্রমবর্ধমান প্রবণতাকে গুরুতর জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে উল্লেখ করে কৃষিতে এর ব্যবহার বন্ধ এবং কম বিষাক্ত বিকল্প ব্যবহারের সুপারিশ করা হয়েছে।

সামনে কী উদ্যোগ

প্যারাকোয়াটসহ উচ্চ ঝুঁকির কৃষি রাসায়নিকগুলোর ক্ষতির মাত্রা নিরূপণ এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকেও উদ্যোগের কথা বলা হয়েছে বলে আপনার দেওয়া প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, কৃষি উৎপাদনে যেন নেতিবাচক প্রভাব না পড়ে, একই সঙ্গে কৃষক ও সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকিও যেন কমে—এমন নীতির মাধ্যমে বিকল্প আগাছা দমন পদ্ধতি জনপ্রিয় করা প্রয়োজন।

বাংলাদেশে প্যারাকোয়াট বিষক্রিয়ার ঘটনা যেভাবে বাড়ছে, তাতে রাসায়নিকটির আমদানি, বিক্রি ও ব্যবহার নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি আত্মহানির ঝুঁকিতে থাকা মানুষের জন্য দ্রুত মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা ও নিরাপদ চিকিৎসা নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

বাংলাদেশে প্যারাকোয়াট বিষক্রিয়া বাড়ছে, জনস্বাস্থ্যে বড় হুমকি

সময় : ১১:১৮:১৫ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৫ অগাস্ট ২০২৬

নিজস্ব প্রতিবেদক: বাংলাদেশে কৃষিকাজে ব্যবহৃত অত্যন্ত বিষাক্ত আগাছানাশক প্যারাকোয়াট নিয়ে জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি ক্রমেই বাড়ছে। দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়া রোগীদের তথ্য বিশ্লেষণ করে করা সাম্প্রতিক এক গবেষণায় প্যারাকোয়াট বিষক্রিয়ার ঘটনা দ্রুত বাড়ার চিত্র উঠে এসেছে। ২০১৩ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ১০টি হাসপাতালের তথ্য বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা মোট ১ হাজার ৪২০টি প্যারাকোয়াট বিষক্রিয়ার ঘটনা শনাক্ত করেছেন।

ঝিনাইদহ সদর হাসপাতাল সূত্র জানিয়েছে, গত জুলাইয়ে ১১৭ জন রোগী বিষক্রিয়া নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন। তাঁদের মধ্যে বেশির ভাগই আগাছানাশক পান করেছিলেন বলে হাসপাতাল সূত্রের তথ্য। জেলাটিতে আত্মহানির প্রবণতা দীর্ঘদিন ধরেই উদ্বেগের বিষয় হলেও সাম্প্রতিক সময়ে আগাছানাশক ব্যবহারের ঘটনা বেড়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

১০ হাসপাতালের তথ্য নিয়ে গবেষণা

‘ক্লিনিক্যাল অ্যান্ড ল্যাবরেটরি প্রোফাইল অব প্যারাকোয়াট পয়জনিং: এ টক্সিকোলজিক্যাল ক্রাইসিস ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক গবেষণাটি American Journal of Tropical Medicine and Hygiene-এ ১৯ মে ২০২৬ প্রকাশিত হয়েছে। গবেষণায় বাংলাদেশে প্যারাকোয়াট বিষক্রিয়াকে ক্রমবর্ধমান জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

গবেষণাটিতে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা মেডিকেল কলেজসহ দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের গবেষকের পাশাপাশি যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব এডিনবরার গবেষকেরাও অংশ নেন। গবেষকদের মতে, এটি বাংলাদেশে প্যারাকোয়াট বিষক্রিয়া নিয়ে সবচেয়ে বড় গবেষণাগুলোর একটি।

গবেষণায় ২০১৩ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ১০টি তৃতীয় পর্যায়ের হাসপাতালের তথ্য নেওয়া হয়েছে। এসব হাসপাতাল দেশের ৬৫ শতাংশের বেশি জনগোষ্ঠীকে চিকিৎসাসেবা দেয়। গবেষণায় পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০১৩ সালে যেখানে একটি প্যারাকোয়াট বিষক্রিয়ার ঘটনা শনাক্ত হয়েছিল, ২০২৪ সালে সেই সংখ্যা বেড়ে ৪৯৩-এ দাঁড়ায়।

গবেষণায় বিশ্লেষণের জন্য ২৫৭ জন রোগীর বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়। তাঁদের মধ্যে তীব্র কিডনি সমস্যার কারণে পা ফুলে যাওয়া, বমি ও পেটব্যথা ছিল উল্লেখযোগ্য উপসর্গ। গবেষণায় প্যারাকোয়াট বিষক্রিয়ার ক্ষেত্রে মৃত্যুহার ৪৩ দশমিক ২ শতাংশ পাওয়া গেছে।

প্যারাকোয়াটের ব্যবহার বাড়ছে

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্যারাকোয়াট আমদানির পরিমাণও গত এক দশকে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ২০১৩ সালে যেখানে ৫৩ টনের বেশি প্যারাকোয়াট আমদানি হয়েছিল, ২০২৩ সালে তা বেড়ে প্রায় ৪ হাজার ৬৯৫ টনে দাঁড়ায়।

কৃষি-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, গ্রামাঞ্চলে শ্রমিক সংকট ও শ্রমের খরচ বেড়ে যাওয়ায় কৃষকেরা হাত দিয়ে আগাছা পরিষ্কারের পরিবর্তে রাসায়নিক আগাছানাশকের ওপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন। ফলে কৃষিজমিতে প্যারাকোয়াটের ব্যবহারও বেড়েছে।

গবেষকদের মতে, কৃষিকাজে ব্যবহৃত এই রাসায়নিকের সহজলভ্যতা জনস্বাস্থ্যের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাঁরা কৃষিতে প্যারাকোয়াটের ব্যবহার বন্ধ করে তুলনামূলক কম ক্ষতিকর বিকল্প ব্যবহারের সুপারিশ করেছেন।

তরুণদের মধ্যে আক্রান্তের হার বেশি

গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, প্যারাকোয়াট বিষক্রিয়ায় আক্রান্তদের বড় অংশ তরুণ। ১২ থেকে ৩০ বছর বয়সী ব্যক্তিদের অংশ ছিল ৭৮ দশমিক ২ শতাংশ। আক্রান্তদের মধ্যে শিক্ষার্থী ও গৃহিণীদের সংখ্যাও উল্লেখযোগ্য।

গবেষকেরা মনে করছেন, বিষাক্ত কৃষি রাসায়নিকের সহজলভ্যতা আত্মহানির ঝুঁকি বাড়াতে পারে। এ কারণে শুধু চিকিৎসার ওপর নির্ভর না করে ঝুঁকিপূর্ণ রাসায়নিকের সহজপ্রাপ্যতা কমানোও জনস্বাস্থ্য নীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হওয়া উচিত।

চিকিৎসায় জটিলতা, মৃত্যুঝুঁকি বেশি

প্যারাকোয়াট বিষক্রিয়ায় কিডনি, ফুসফুসসহ শরীরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। বাংলাদেশে করা আরেকটি গবেষণাতেও প্যারাকোয়াট বিষক্রিয়ায় কিডনি ও শ্বাসতন্ত্রের গুরুতর জটিলতা এবং উচ্চ মৃত্যুহার পাওয়া গেছে।

২০২৪ সালে প্রকাশিত ওই গবেষণায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে চিকিৎসা নেওয়া ৪২ জন রোগীর তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়। গবেষণাটিতে গুরুতর অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের জটিলতা এবং উচ্চ মৃত্যুহার পাওয়া যায়।

সাম্প্রতিক গবেষণার লেখকেরা জানিয়েছেন, প্যারাকোয়াট বিষক্রিয়ার কার্যকর নির্দিষ্ট প্রতিষেধক নেই। ফলে বিষক্রিয়া প্রতিরোধ এবং ঝুঁকিপূর্ণ রাসায়নিকের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণকেই সবচেয়ে কার্যকর জনস্বাস্থ্য পদক্ষেপ হিসেবে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নিষিদ্ধ

জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকির কারণে বিশ্বের অনেক দেশে প্যারাকোয়াটের ব্যবহার নিষিদ্ধ বা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত। গবেষণায়ও কৃষিতে প্যারাকোয়াটের ব্যবহার নিষিদ্ধ করে তুলনামূলক কম বিষাক্ত বিকল্প ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছে।

গবেষকেরা উল্লেখ করেছেন, বিভিন্ন দেশে কীটনাশক নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে আত্মহানিজনিত বিষক্রিয়া কমানোর নজির রয়েছে। তাই বাংলাদেশেও উচ্চ ঝুঁকির কীটনাশকগুলোর ব্যবহার ও প্রাপ্যতা নিয়ে নতুন করে নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।

বিকল্প আগাছা দমন পদ্ধতির সুযোগ

কৃষি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্যারাকোয়াটের বিকল্প হিসেবে সমন্বিত আগাছা ব্যবস্থাপনা, যান্ত্রিকভাবে আগাছা দমন এবং তুলনামূলক কম বিষাক্ত আগাছানাশক ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে।

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা দেশের নিবন্ধিত উচ্চ ঝুঁকির কীটনাশকগুলো চিহ্নিত করে ঝুঁকি কমানোর বিষয়ে কাজ করেছেন। তাঁদের মতে, কৃষি উৎপাদন অব্যাহত রেখেও ক্ষতিকর রাসায়নিকের ওপর নির্ভরতা কমানো সম্ভব।

নিষিদ্ধের দাবি

টক্সিকোলজি বিশেষজ্ঞ ও গবেষকেরা প্যারাকোয়াটের ক্ষতিকর প্রভাব বিবেচনায় এর ব্যবহার নিষিদ্ধের দাবি জানিয়েছেন। তাঁদের মতে, চিকিৎসার মাধ্যমে বিষক্রিয়ার পরিণতি সামাল দেওয়ার চেয়ে এ ধরনের রাসায়নিকের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করে বিষক্রিয়ার ঘটনা কমানো বেশি কার্যকর।

সাম্প্রতিক গবেষণাতেও বাংলাদেশে প্যারাকোয়াট বিষক্রিয়ার ক্রমবর্ধমান প্রবণতাকে গুরুতর জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে উল্লেখ করে কৃষিতে এর ব্যবহার বন্ধ এবং কম বিষাক্ত বিকল্প ব্যবহারের সুপারিশ করা হয়েছে।

সামনে কী উদ্যোগ

প্যারাকোয়াটসহ উচ্চ ঝুঁকির কৃষি রাসায়নিকগুলোর ক্ষতির মাত্রা নিরূপণ এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকেও উদ্যোগের কথা বলা হয়েছে বলে আপনার দেওয়া প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, কৃষি উৎপাদনে যেন নেতিবাচক প্রভাব না পড়ে, একই সঙ্গে কৃষক ও সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকিও যেন কমে—এমন নীতির মাধ্যমে বিকল্প আগাছা দমন পদ্ধতি জনপ্রিয় করা প্রয়োজন।

বাংলাদেশে প্যারাকোয়াট বিষক্রিয়ার ঘটনা যেভাবে বাড়ছে, তাতে রাসায়নিকটির আমদানি, বিক্রি ও ব্যবহার নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি আত্মহানির ঝুঁকিতে থাকা মানুষের জন্য দ্রুত মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা ও নিরাপদ চিকিৎসা নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।