গর্ভাবস্থার প্রথম তিন মাসে মায়ের যেসব বিষয়ে বিশেষ খেয়াল রাখা জরুরি
স্বাস্থ্য ডেস্ক: গর্ভধারণের পর প্রথম তিন মাস বা প্রথম ত্রৈমাসিক মা ও অনাগত শিশুর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ সময়ে শিশুর শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলোর বিকাশ শুরু হয়। একই সঙ্গে মায়ের শরীরেও নানা পরিবর্তন দেখা দিতে পারে। বমি বমি ভাব, ক্লান্তি, স্তনে ব্যথা ও মেজাজের পরিবর্তনের মতো উপসর্গ এ সময়ে দেখা দিতে পারে।
গর্ভাবস্থার প্রতিটি পর্যায়ে মায়ের পুষ্টি, শারীরিক সুস্থতা ও মানসিক স্বাস্থ্যের চাহিদা কিছুটা ভিন্ন। তাই প্রথম ত্রৈমাসিকে কয়েকটি বিষয়ে বিশেষভাবে সতর্ক থাকা জরুরি।
প্রসবপূর্ব চিকিৎসা শুরু করুন
গর্ভধারণের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পর যত দ্রুত সম্ভব চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। প্রথম সাক্ষাতে আগে থেকে থাকা কোনো স্বাস্থ্যগত সমস্যা, নিয়মিত খাওয়া ওষুধ এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ তথ্য চিকিৎসককে জানানো প্রয়োজন।
চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া আগে থেকে নির্ধারিত কোনো ওষুধ হঠাৎ বন্ধ করাও ঠিক নয়। গর্ভাবস্থায় কোন ওষুধ নিরাপদ এবং কোনটি এড়িয়ে চলা প্রয়োজন, তা চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা করে নেওয়া উচিত।
ফলিক অ্যাসিড গ্রহণ করুন
গর্ভাবস্থার শুরুতে ফলিক অ্যাসিড শিশুর স্নায়ুতন্ত্রের স্বাভাবিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সাধারণভাবে প্রতিদিন ৪০০ মাইক্রোগ্রাম ফলিক অ্যাসিড গ্রহণের পরামর্শ দেওয়া হয় এবং গর্ভাবস্থার প্রথম ১২ সপ্তাহ পর্যন্ত এটি চালিয়ে যেতে বলা হয়। এটি স্পাইনা বাইফিডার মতো নিউরাল টিউবের ত্রুটির ঝুঁকি কমাতে সহায়তা করে।
তবে কিছু নারীর ক্ষেত্রে বেশি মাত্রার ফলিক অ্যাসিড প্রয়োজন হতে পারে। যেমন—আগের গর্ভধারণে নিউরাল টিউবের ত্রুটি থাকা, ডায়াবেটিস বা নির্দিষ্ট কিছু ওষুধ সেবনের ক্ষেত্রে চিকিৎসক বেশি মাত্রা নির্ধারণ করতে পারেন। তাই নিজের মতো করে ডোজ বাড়ানো উচিত নয়।
অল্প অল্প করে পুষ্টিকর খাবার খান
প্রথম ত্রৈমাসিকে বমি বমি ভাব বা খাবারে অনীহা দেখা দিতে পারে। এ ক্ষেত্রে একবারে বেশি খাবার না খেয়ে অল্প পরিমাণে বারবার খাওয়া অনেকের জন্য তুলনামূলক সহজ হতে পারে।
খাদ্যতালিকায় শাকসবজি, ফল, পূর্ণ শস্য, ডাল, দুধ ও উপযুক্ত দুগ্ধজাত বিকল্প এবং প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার রাখা উচিত। গর্ভাবস্থায় ‘দুজনের জন্য খাওয়া’ প্রয়োজন নেই; বরং বৈচিত্র্যময় ও সুষম খাবার খাওয়াই গুরুত্বপূর্ণ।
নিয়মিত সক্রিয় থাকুন
স্বাভাবিক ও জটিলতামুক্ত গর্ভাবস্থায় শারীরিকভাবে সক্রিয় থাকা সাধারণত উপকারী। স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করলে হাঁটা, সাঁতার বা গর্ভাবস্থার উপযোগী হালকা থেকে মাঝারি ব্যায়াম করা যেতে পারে।
তবে আগে নিয়মিত ব্যায়ামের অভ্যাস না থাকলে হঠাৎ কঠিন ব্যায়াম শুরু করা উচিত নয়। শরীরের অবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ধীরে ধীরে সক্রিয় হওয়া এবং অস্বস্তি হলে বিশ্রাম নেওয়া ভালো।
যা করবেন না
মদ ও ধূমপান থেকে দূরে থাকুন
গর্ভাবস্থায় মদ পান ও ধূমপান এড়িয়ে চলা উচিত। পরোক্ষ ধূমপানের সংস্পর্শ থেকেও যতটা সম্ভব দূরে থাকা প্রয়োজন।
নিজে থেকে ওষুধ খাবেন না
সাধারণ ব্যথানাশক, ভেষজ ওষুধ বা বিভিন্ন ধরনের সাপ্লিমেন্টও গর্ভাবস্থায় সবসময় নিরাপদ নাও হতে পারে। তাই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোনো ওষুধ, ভেষজ উপাদান বা সম্পূরক গ্রহণ করা উচিত নয়।
একইভাবে, নিয়মিত খাওয়া কোনো প্রেসক্রাইব করা ওষুধও চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া বন্ধ করা ঠিক নয়।
অতিরিক্ত পরিশ্রম ও ক্লান্তি এড়িয়ে চলুন
ব্যায়াম বা দৈনন্দিন কাজের সময় শরীরের সক্ষমতার বাইরে অতিরিক্ত পরিশ্রম করা উচিত নয়। পর্যাপ্ত পানি পান করুন এবং শরীর ক্লান্ত বা অসুস্থ লাগলে বিশ্রাম নিন।
কঠোর ডায়েট করবেন না
গর্ভাবস্থা ওজন কমানোর জন্য ক্র্যাশ ডায়েট বা অপ্রয়োজনীয় খাদ্যবিধিনিষেধ অনুসরণের সময় নয়। প্রয়োজনীয় পুষ্টি নিশ্চিত করতে বৈচিত্র্যময় ও সুষম খাবারের দিকে মনোযোগ দেওয়া জরুরি।
প্রয়োজন ছাড়া সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করবেন না
গর্ভাবস্থায় সব ধরনের ভিটামিন বা সাপ্লিমেন্ট নিরাপদ নয়। বিশেষ করে ভিটামিন এ-এর অতিরিক্ত মাত্রা ক্ষতিকর হতে পারে। তাই চিকিৎসক বা স্বাস্থ্যকর্মীর পরামর্শ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করা উচিত।
সবশেষে, প্রথম ত্রৈমাসিকে মায়ের যত্নের পাশাপাশি নিয়মিত প্রসবপূর্ব চিকিৎসা নেওয়াও গুরুত্বপূর্ণ। কোনো অস্বাভাবিক বা উদ্বেগজনক উপসর্গ দেখা দিলে নিজে থেকে সিদ্ধান্ত না নিয়ে দ্রুত চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করা উচিত।
























