০১:১৮ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৭ অগাস্ট ২০২৬, ১২ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

নেপালে আকস্মিক বন্যায় আমগাছ আঁকড়ে প্রাণে বাঁচলেন শ্রমিক

নিউজ ডেস্ক

নেপালে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যার স্রোতে ভেসে যাওয়ার পর আমগাছ আঁকড়ে প্রাণে বেঁচেছেন শ্রমিক বিবেক কুমাল।

নেপালে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যার স্রোতে ভেসে যাওয়ার পর একটি আমগাছ আঁকড়ে প্রাণে বেঁচেছেন ২৪ বছর বয়সি শ্রমিক বিবেক কুমাল। তার ভাষায়, আমগাছটি না থাকলে স্রোতে ভেসে গিয়ে মারা যেতেন তিনি।

বুধবার (২৬ আগস্ট) নেপালের বিদুর এলাকায় একটি নতুন নির্মিত বাড়ির বাইরে টয়লেটের গর্ত খননের কাজ করছিলেন কুমাল। হঠাৎ বিকট শব্দে পাহাড়ি ঢলের সঙ্গে কাদা, পাথর ও পানির বিশাল স্রোত নেমে আসে। মুহূর্তের মধ্যে আশপাশের সবকিছুর সঙ্গে তিনিও স্রোতে ভেসে যান।

কুমাল জানান, তিনি তখন প্রায় পাঁচ ফুট গভীর একটি গর্তে কাজ করছিলেন। হঠাৎ শোঁ শোঁ শব্দ শুনতে পান। ওপরে থাকা চার সহকর্মী দ্রুত গর্ত থেকে উঠে দৌড়ে পালাতে বলেন। তিনি গর্ত থেকে বের হয়ে দৌড় শুরু করার আগেই সহকর্মীরা নিরাপদ স্থানে সরে যান।

‘আমি দৌড়াতে শুরু করি। এরপর ভূমিকম্পের মতো বিকট শব্দ করে পানির বিশাল দেয়াল আমার দিকে ধেয়ে আসে,’ কাঠমান্ডুর ন্যাশনাল ট্রমা সেন্টারের শয্যায় শুয়ে বলেন কুমাল।

প্রচণ্ড স্রোত তাকে কাদা ও ধ্বংসাবশেষের সঙ্গে অনেক দূর ভাসিয়ে নিয়ে যায়। একপর্যায়ে তিনি একটি আমগাছে আটকে যান। গাছটি আঁকড়ে ধরে সেখানেই জীবন বাঁচান তিনি।

কুমাল বলেন, ‘ভাগ্যক্রমে আমি একটি আমগাছে আটকে যাই। আমগাছটি না থাকলে আমি স্রোতে ভেসে গিয়ে মারা যেতাম।’

পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে তাকে উদ্ধার করে। পানির প্রবল ধাক্কা এবং পরে একটি বড় পাথরের আঘাতে তার ডান পায়ে গুরুতর আঘাত লাগে। বর্তমানে তিনি কাঠমান্ডুর একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। তার নিজের বাড়ি অন্য এলাকায় হওয়ায় বন্যায় সেটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি।

ভয়াবহ বন্যায় অন্তত ১৬২ জনের মৃত্যু

চীনের তিব্বত সীমান্তসংলগ্ন নেপালের রাশুয়া জেলা ও আশপাশের এলাকায় ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে অন্তত ১৬২ জনের মৃত্যু হয়েছে। নিখোঁজ রয়েছেন আরও প্রায় চার শতাধিক মানুষ। নিখোঁজদের মধ্যে বিদেশিও রয়েছেন।

প্রবল স্রোতে বসতবাড়ি, যানবাহন ও বিভিন্ন অবকাঠামো ধ্বংস হয়েছে। চীনের সীমান্তবর্তী এলাকায় ধারণ করা নিরাপত্তা ক্যামেরার ফুটেজে দেখা গেছে, পাহাড়ি ঢল ও কাদামাটির বিশাল স্রোত নেমে আসার আগে অনেক মানুষ নিরাপদ স্থানে ছুটে যাচ্ছেন। এরপর মুহূর্তের মধ্যে স্রোত বহু ভবন ও গাড়ি ভাসিয়ে নিয়ে যায়।

প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, নেপাল-তিব্বত সীমান্তের একটি নদীতে বিপুল পরিমাণ কাদা ও পাথর ধসে পড়ার পর এই ভয়াবহ বন্যার সৃষ্টি হয়। তবে ঘটনার সুনির্দিষ্ট কারণ এখনো নিশ্চিত নয়।

জার্মান রিসার্চ সেন্টার ফর জিওসায়েন্সেস জানিয়েছে, নিরাপত্তা ক্যামেরার ফুটেজে উল্লেখ করা সময়ের প্রায় সাত মিনিট আগে ওই এলাকায় ৪ দশমিক ৪ মাত্রার একটি ভূমিকম্প হয়েছিল।

স্কুল থেকে ফেরার পথে স্রোতে ভেসে যায় ১১ বছরের শিশু

বন্যায় আহত হয়ে কুমালের সঙ্গে আরও তিনজন হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন। রাজধানী কাঠমান্ডু ও রাশুয়ার বিভিন্ন হাসপাতালে এ পর্যন্ত ১১৪ জনের বেশি মানুষকে উদ্ধার করে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।

আহতদের মধ্যে রয়েছে ১১ বছর বয়সি রিহানা লামিছানে। বন্যার সময় সে স্কুলে ছিল।

রিহানা জানায়, পরিস্থিতি খারাপ হওয়ায় স্কুল বন্ধ করে শিক্ষার্থীদের বাড়ি ফিরে যেতে বলা হয়। বাড়ি ফেরার পথে নদী পার হওয়ার সময় হঠাৎ প্রবল স্রোত নেমে আসে।

পানির স্রোতে পড়ে তার বুক ও পায়ে আঘাত লাগে। তবে প্রাণে বেঁচে যাওয়ায় স্বস্তি প্রকাশ করেছে শিশুটি।

রিহানা বলেন, ‘আমি নিরাপদে আছি, এটাই ভালো লাগছে। আমার বন্ধুদের কী হয়েছে, তা আমি জানি না।’

মেয়ে নিখোঁজ হওয়ার খবর পেয়ে তাকে খুঁজতে ছুটে যান তার মা রিতা। পরে মেয়েকে নিরাপদে পাওয়ার পর স্বস্তি প্রকাশ করেন তিনি।

রিতা বলেন, ‘আমার মেয়ের বড় কোনো ক্ষতি হয়নি—এটাই সবচেয়ে বড় স্বস্তি। তাকে নিরাপদে ফিরে পেয়ে আমি স্বস্তি পেয়েছি।’

প্রাকৃতিক দুর্যোগে ঝুঁকিপূর্ণ নেপাল

পাহাড়ি দেশ নেপালে বর্ষা মৌসুমে প্রায়ই ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসের ঘটনা ঘটে। দেশটি ভূমিকম্পসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকিতেও রয়েছে।

বিবেক কুমাল নিজেও ২০১৫ সালের ভয়াবহ ভূমিকম্পের অভিজ্ঞতা পেয়েছিলেন। ওই ভূমিকম্পে নেপালে প্রায় ৯ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছিল।

এবারের আকস্মিক বন্যায় আবারও ভয়াবহ ক্ষয়ক্ষতির মুখে পড়েছে দেশটি। নিখোঁজদের সন্ধানে উদ্ধার অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

নেপালে আকস্মিক বন্যায় আমগাছ আঁকড়ে প্রাণে বাঁচলেন শ্রমিক

সময় : ১২:০০:১২ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৭ অগাস্ট ২০২৬

নেপালে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যার স্রোতে ভেসে যাওয়ার পর একটি আমগাছ আঁকড়ে প্রাণে বেঁচেছেন ২৪ বছর বয়সি শ্রমিক বিবেক কুমাল। তার ভাষায়, আমগাছটি না থাকলে স্রোতে ভেসে গিয়ে মারা যেতেন তিনি।

বুধবার (২৬ আগস্ট) নেপালের বিদুর এলাকায় একটি নতুন নির্মিত বাড়ির বাইরে টয়লেটের গর্ত খননের কাজ করছিলেন কুমাল। হঠাৎ বিকট শব্দে পাহাড়ি ঢলের সঙ্গে কাদা, পাথর ও পানির বিশাল স্রোত নেমে আসে। মুহূর্তের মধ্যে আশপাশের সবকিছুর সঙ্গে তিনিও স্রোতে ভেসে যান।

কুমাল জানান, তিনি তখন প্রায় পাঁচ ফুট গভীর একটি গর্তে কাজ করছিলেন। হঠাৎ শোঁ শোঁ শব্দ শুনতে পান। ওপরে থাকা চার সহকর্মী দ্রুত গর্ত থেকে উঠে দৌড়ে পালাতে বলেন। তিনি গর্ত থেকে বের হয়ে দৌড় শুরু করার আগেই সহকর্মীরা নিরাপদ স্থানে সরে যান।

‘আমি দৌড়াতে শুরু করি। এরপর ভূমিকম্পের মতো বিকট শব্দ করে পানির বিশাল দেয়াল আমার দিকে ধেয়ে আসে,’ কাঠমান্ডুর ন্যাশনাল ট্রমা সেন্টারের শয্যায় শুয়ে বলেন কুমাল।

প্রচণ্ড স্রোত তাকে কাদা ও ধ্বংসাবশেষের সঙ্গে অনেক দূর ভাসিয়ে নিয়ে যায়। একপর্যায়ে তিনি একটি আমগাছে আটকে যান। গাছটি আঁকড়ে ধরে সেখানেই জীবন বাঁচান তিনি।

কুমাল বলেন, ‘ভাগ্যক্রমে আমি একটি আমগাছে আটকে যাই। আমগাছটি না থাকলে আমি স্রোতে ভেসে গিয়ে মারা যেতাম।’

পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে তাকে উদ্ধার করে। পানির প্রবল ধাক্কা এবং পরে একটি বড় পাথরের আঘাতে তার ডান পায়ে গুরুতর আঘাত লাগে। বর্তমানে তিনি কাঠমান্ডুর একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। তার নিজের বাড়ি অন্য এলাকায় হওয়ায় বন্যায় সেটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি।

ভয়াবহ বন্যায় অন্তত ১৬২ জনের মৃত্যু

চীনের তিব্বত সীমান্তসংলগ্ন নেপালের রাশুয়া জেলা ও আশপাশের এলাকায় ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে অন্তত ১৬২ জনের মৃত্যু হয়েছে। নিখোঁজ রয়েছেন আরও প্রায় চার শতাধিক মানুষ। নিখোঁজদের মধ্যে বিদেশিও রয়েছেন।

প্রবল স্রোতে বসতবাড়ি, যানবাহন ও বিভিন্ন অবকাঠামো ধ্বংস হয়েছে। চীনের সীমান্তবর্তী এলাকায় ধারণ করা নিরাপত্তা ক্যামেরার ফুটেজে দেখা গেছে, পাহাড়ি ঢল ও কাদামাটির বিশাল স্রোত নেমে আসার আগে অনেক মানুষ নিরাপদ স্থানে ছুটে যাচ্ছেন। এরপর মুহূর্তের মধ্যে স্রোত বহু ভবন ও গাড়ি ভাসিয়ে নিয়ে যায়।

প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, নেপাল-তিব্বত সীমান্তের একটি নদীতে বিপুল পরিমাণ কাদা ও পাথর ধসে পড়ার পর এই ভয়াবহ বন্যার সৃষ্টি হয়। তবে ঘটনার সুনির্দিষ্ট কারণ এখনো নিশ্চিত নয়।

জার্মান রিসার্চ সেন্টার ফর জিওসায়েন্সেস জানিয়েছে, নিরাপত্তা ক্যামেরার ফুটেজে উল্লেখ করা সময়ের প্রায় সাত মিনিট আগে ওই এলাকায় ৪ দশমিক ৪ মাত্রার একটি ভূমিকম্প হয়েছিল।

স্কুল থেকে ফেরার পথে স্রোতে ভেসে যায় ১১ বছরের শিশু

বন্যায় আহত হয়ে কুমালের সঙ্গে আরও তিনজন হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন। রাজধানী কাঠমান্ডু ও রাশুয়ার বিভিন্ন হাসপাতালে এ পর্যন্ত ১১৪ জনের বেশি মানুষকে উদ্ধার করে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।

আহতদের মধ্যে রয়েছে ১১ বছর বয়সি রিহানা লামিছানে। বন্যার সময় সে স্কুলে ছিল।

রিহানা জানায়, পরিস্থিতি খারাপ হওয়ায় স্কুল বন্ধ করে শিক্ষার্থীদের বাড়ি ফিরে যেতে বলা হয়। বাড়ি ফেরার পথে নদী পার হওয়ার সময় হঠাৎ প্রবল স্রোত নেমে আসে।

পানির স্রোতে পড়ে তার বুক ও পায়ে আঘাত লাগে। তবে প্রাণে বেঁচে যাওয়ায় স্বস্তি প্রকাশ করেছে শিশুটি।

রিহানা বলেন, ‘আমি নিরাপদে আছি, এটাই ভালো লাগছে। আমার বন্ধুদের কী হয়েছে, তা আমি জানি না।’

মেয়ে নিখোঁজ হওয়ার খবর পেয়ে তাকে খুঁজতে ছুটে যান তার মা রিতা। পরে মেয়েকে নিরাপদে পাওয়ার পর স্বস্তি প্রকাশ করেন তিনি।

রিতা বলেন, ‘আমার মেয়ের বড় কোনো ক্ষতি হয়নি—এটাই সবচেয়ে বড় স্বস্তি। তাকে নিরাপদে ফিরে পেয়ে আমি স্বস্তি পেয়েছি।’

প্রাকৃতিক দুর্যোগে ঝুঁকিপূর্ণ নেপাল

পাহাড়ি দেশ নেপালে বর্ষা মৌসুমে প্রায়ই ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসের ঘটনা ঘটে। দেশটি ভূমিকম্পসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকিতেও রয়েছে।

বিবেক কুমাল নিজেও ২০১৫ সালের ভয়াবহ ভূমিকম্পের অভিজ্ঞতা পেয়েছিলেন। ওই ভূমিকম্পে নেপালে প্রায় ৯ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছিল।

এবারের আকস্মিক বন্যায় আবারও ভয়াবহ ক্ষয়ক্ষতির মুখে পড়েছে দেশটি। নিখোঁজদের সন্ধানে উদ্ধার অভিযান অব্যাহত রয়েছে।