০২:২০ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৫ অগাস্ট ২০২৬, ১০ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

গাজার স্বাস্থ্যব্যবস্থা নীরবে আরও গভীর সংকটে, চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত বাস্তুচ্যুতরা

নিউজ ডেস্ক

যুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞে গাজার স্বাস্থ্যব্যবস্থা বিপর্যস্ত হয়ে পড়ায় বাস্তুচ্যুতি শিবিরে চিকিৎসাসেবা পাওয়া কঠিন হয়ে উঠেছে।

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: গাজার স্বাস্থ্যব্যবস্থার বিপর্যয় এখন আগের মতো সংবাদ শিরোনামে না এলেও চিকিৎসাক্ষেত্রে সংকট কমেনি। বরং যুদ্ধের দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব, হাসপাতাল ও চিকিৎসাকেন্দ্র ধ্বংস এবং ব্যাপক বাস্তুচ্যুতির কারণে পুরো স্বাস্থ্যব্যবস্থা আরও গভীর সংকটে পড়েছে।

এই সংকট সবচেয়ে বেশি স্পষ্ট গাজার বাস্তুচ্যুতি শিবিরগুলোতে। যুদ্ধের কারণে গৃহহীন ও দরিদ্র হয়ে পড়া মানুষ এসব শিবিরে আশ্রয় নিয়েছেন। কিন্তু ধ্বংসপ্রাপ্ত স্বাস্থ্যব্যবস্থার কারণে তাদের কাছে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়েছে। একইভাবে অসুস্থ ও আহত ব্যক্তিদের জন্য সীমিতসংখ্যক সচল চিকিৎসাকেন্দ্রে পৌঁছানোও প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠেছে।

পয়োনিষ্কাশনের দুরবস্থা, নিরাপদ পানীয় জলের সংকট এবং প্রচণ্ড গরম বা ঠান্ডার মধ্যে বসবাসের কারণে শিবিরগুলোর পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠেছে।

সম্প্রতি গাজা সিটির নাসর এলাকায় হাসান সালামা স্কুলের ধ্বংসাবশেষের ওপর গড়ে ওঠা একটি অনানুষ্ঠানিক শিবিরে শত শত গৃহহীন মানুষকে তাঁবু টাঙিয়ে বসবাস করতে দেখা গেছে। কোনো সংস্থা শিবিরটি পরিচালনা করে না। ফলে সেখানে চিকিৎসাসহ নিয়মিত কোনো সেবার ব্যবস্থাও নেই।

২০২৪ সালের আগস্টে পাশের নাসর স্কুলের সঙ্গে হাসান সালামা স্কুলেও বোমা হামলা হয়। এতে অন্তত ৩০ জন নিহত হন।

স্থানীয় একটি বেসরকারি ক্লিনিকের কয়েকজন চিকিৎসাকর্মী ওই শিবিরে একদিন বিনা মূল্যে স্বাস্থ্য পরীক্ষা করেন। সেদিন অন্তত ১৫০ রোগীকে চিকিৎসাসেবা দেওয়া হয়। রোগীদের মধ্যে উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস ও কিডনি সমস্যার মতো দীর্ঘমেয়াদি রোগের পাশাপাশি হেপাটাইটিস ও স্ক্যাবিসের মতো সংক্রমণও পাওয়া যায়।

শিশুদের মধ্যেও জলবসন্ত, গ্যাস্ট্রোএন্টেরাইটিস, ডায়রিয়া ও শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ দেখা গেছে।

বাস্তুচ্যুতি শিবিরে বসবাসকারী অনেক মানুষের জন্য চিকিৎসকের কাছে পৌঁছানো এখন প্রায় অসম্ভব। যাতায়াতের খরচ, দীর্ঘ পথ, বাস্তুচ্যুতির ক্লান্তি এবং প্রচণ্ড গরমের কারণে জরুরি প্রয়োজন থাকলেও অনেকে চিকিৎসা নিতে দেরি করছেন।

এমনই একজন ৪৬ বছর বয়সী ব্যক্তি গোলার টুকরার আঘাতে গুরুতরভাবে আহত হয়েছেন। হাঁটার জন্য তার ক্রাচ প্রয়োজন। একই সঙ্গে তিনি উচ্চ রক্তচাপেও ভুগছেন। কাছের আল-রান্তিসি হাসপাতাল আংশিকভাবে চালু থাকলেও সেখানে মূলত শিশু ও ক্যানসার রোগীদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। ফলে ওই ব্যক্তির প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সেখানে পাওয়া সম্ভব হয়নি।

অন্য হাসপাতালে যেতে হলে শুধু যাতায়াতেই অন্তত ৮ ডলার খরচ হতো। বাস্তুচ্যুতি শিবিরে বসবাসকারী অধিকাংশ মানুষের জন্য এই অর্থও অনেক বেশি। প্রতিদিনের খাবার জোগাড় করতেই যেখানে অনেক মানুষ হিমশিম খাচ্ছেন, সেখানে চিকিৎসার জন্য অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করা তাদের পক্ষে প্রায় অসম্ভব।

ফলে চিকিৎসা নিতে দেরি হওয়া, ওষুধের সংকট এবং কঠিন জীবনযাপনের কারণে অনেকের রোগ আরও জটিল হয়ে উঠছে।

গাজায় মৌলিক স্বাস্থ্যসেবা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা গেলে পরিস্থিতির বড় একটি অংশ প্রতিরোধ করা সম্ভব বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। বিশেষ করে জাতিসংঘের ফিলিস্তিনি শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা ইউএনআরডব্লিউএর মতো বড় প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ফিরিয়ে আনা জরুরি।

যুদ্ধের আগে গাজাজুড়ে ইউএনআরডব্লিউএর ২২টি ক্লিনিক ছিল। বর্তমানে এর মধ্যে মাত্র ছয়টি সচল রয়েছে।

গাজার ৩৪টি হাসপাতালের মধ্যে মাত্র ১৯টি আংশিকভাবে কার্যকর রয়েছে। ধ্বংসযজ্ঞের কারণে এসব হাসপাতালের অধিকাংশ ওয়ার্ড আর চালু নেই। প্রায় ২০ লাখ মানুষের জন্য পুরো গাজায় হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার শয্যা রয়েছে মাত্র ২ হাজার ২০০টি। যুদ্ধের আগে শুধু আল-শিফা হাসপাতালেই ছিল ৭০০ শয্যা।

পরীক্ষাগার, অস্ত্রোপচারসহ বিভিন্ন চিকিৎসাসেবার অনেক কিছুই এখন আর পাওয়া যাচ্ছে না। প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জাম ও ওষুধের অভাবের পাশাপাশি চিকিৎসাকর্মীর সংকটও রয়েছে।

চিকিৎসাকেন্দ্র ধ্বংস ও ব্যাপক বাস্তুচ্যুতির কারণে গাজায় স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার অধিকার কার্যত বিশেষ সুবিধায় পরিণত হয়েছে। তাই শুধু হাসপাতাল পুনর্নির্মাণ নয়, প্রাথমিক চিকিৎসাকেন্দ্রগুলো পুনরায় চালু করা এবং বাস্তুচ্যুতি শিবিরে বসবাসকারী সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ মানুষের কাছে সরাসরি চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দিতে জরুরি ভিত্তিতে বড় ধরনের স্বাস্থ্য উদ্যোগ প্রয়োজন।

সূত্র: আল জাজিরা

গাজার স্বাস্থ্যব্যবস্থা নীরবে আরও গভীর সংকটে, চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত বাস্তুচ্যুতরা

সময় : ০১:৫১:১৯ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৫ অগাস্ট ২০২৬

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: গাজার স্বাস্থ্যব্যবস্থার বিপর্যয় এখন আগের মতো সংবাদ শিরোনামে না এলেও চিকিৎসাক্ষেত্রে সংকট কমেনি। বরং যুদ্ধের দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব, হাসপাতাল ও চিকিৎসাকেন্দ্র ধ্বংস এবং ব্যাপক বাস্তুচ্যুতির কারণে পুরো স্বাস্থ্যব্যবস্থা আরও গভীর সংকটে পড়েছে।

এই সংকট সবচেয়ে বেশি স্পষ্ট গাজার বাস্তুচ্যুতি শিবিরগুলোতে। যুদ্ধের কারণে গৃহহীন ও দরিদ্র হয়ে পড়া মানুষ এসব শিবিরে আশ্রয় নিয়েছেন। কিন্তু ধ্বংসপ্রাপ্ত স্বাস্থ্যব্যবস্থার কারণে তাদের কাছে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়েছে। একইভাবে অসুস্থ ও আহত ব্যক্তিদের জন্য সীমিতসংখ্যক সচল চিকিৎসাকেন্দ্রে পৌঁছানোও প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠেছে।

পয়োনিষ্কাশনের দুরবস্থা, নিরাপদ পানীয় জলের সংকট এবং প্রচণ্ড গরম বা ঠান্ডার মধ্যে বসবাসের কারণে শিবিরগুলোর পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠেছে।

সম্প্রতি গাজা সিটির নাসর এলাকায় হাসান সালামা স্কুলের ধ্বংসাবশেষের ওপর গড়ে ওঠা একটি অনানুষ্ঠানিক শিবিরে শত শত গৃহহীন মানুষকে তাঁবু টাঙিয়ে বসবাস করতে দেখা গেছে। কোনো সংস্থা শিবিরটি পরিচালনা করে না। ফলে সেখানে চিকিৎসাসহ নিয়মিত কোনো সেবার ব্যবস্থাও নেই।

২০২৪ সালের আগস্টে পাশের নাসর স্কুলের সঙ্গে হাসান সালামা স্কুলেও বোমা হামলা হয়। এতে অন্তত ৩০ জন নিহত হন।

স্থানীয় একটি বেসরকারি ক্লিনিকের কয়েকজন চিকিৎসাকর্মী ওই শিবিরে একদিন বিনা মূল্যে স্বাস্থ্য পরীক্ষা করেন। সেদিন অন্তত ১৫০ রোগীকে চিকিৎসাসেবা দেওয়া হয়। রোগীদের মধ্যে উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস ও কিডনি সমস্যার মতো দীর্ঘমেয়াদি রোগের পাশাপাশি হেপাটাইটিস ও স্ক্যাবিসের মতো সংক্রমণও পাওয়া যায়।

শিশুদের মধ্যেও জলবসন্ত, গ্যাস্ট্রোএন্টেরাইটিস, ডায়রিয়া ও শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ দেখা গেছে।

বাস্তুচ্যুতি শিবিরে বসবাসকারী অনেক মানুষের জন্য চিকিৎসকের কাছে পৌঁছানো এখন প্রায় অসম্ভব। যাতায়াতের খরচ, দীর্ঘ পথ, বাস্তুচ্যুতির ক্লান্তি এবং প্রচণ্ড গরমের কারণে জরুরি প্রয়োজন থাকলেও অনেকে চিকিৎসা নিতে দেরি করছেন।

এমনই একজন ৪৬ বছর বয়সী ব্যক্তি গোলার টুকরার আঘাতে গুরুতরভাবে আহত হয়েছেন। হাঁটার জন্য তার ক্রাচ প্রয়োজন। একই সঙ্গে তিনি উচ্চ রক্তচাপেও ভুগছেন। কাছের আল-রান্তিসি হাসপাতাল আংশিকভাবে চালু থাকলেও সেখানে মূলত শিশু ও ক্যানসার রোগীদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। ফলে ওই ব্যক্তির প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সেখানে পাওয়া সম্ভব হয়নি।

অন্য হাসপাতালে যেতে হলে শুধু যাতায়াতেই অন্তত ৮ ডলার খরচ হতো। বাস্তুচ্যুতি শিবিরে বসবাসকারী অধিকাংশ মানুষের জন্য এই অর্থও অনেক বেশি। প্রতিদিনের খাবার জোগাড় করতেই যেখানে অনেক মানুষ হিমশিম খাচ্ছেন, সেখানে চিকিৎসার জন্য অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করা তাদের পক্ষে প্রায় অসম্ভব।

ফলে চিকিৎসা নিতে দেরি হওয়া, ওষুধের সংকট এবং কঠিন জীবনযাপনের কারণে অনেকের রোগ আরও জটিল হয়ে উঠছে।

গাজায় মৌলিক স্বাস্থ্যসেবা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা গেলে পরিস্থিতির বড় একটি অংশ প্রতিরোধ করা সম্ভব বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। বিশেষ করে জাতিসংঘের ফিলিস্তিনি শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা ইউএনআরডব্লিউএর মতো বড় প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ফিরিয়ে আনা জরুরি।

যুদ্ধের আগে গাজাজুড়ে ইউএনআরডব্লিউএর ২২টি ক্লিনিক ছিল। বর্তমানে এর মধ্যে মাত্র ছয়টি সচল রয়েছে।

গাজার ৩৪টি হাসপাতালের মধ্যে মাত্র ১৯টি আংশিকভাবে কার্যকর রয়েছে। ধ্বংসযজ্ঞের কারণে এসব হাসপাতালের অধিকাংশ ওয়ার্ড আর চালু নেই। প্রায় ২০ লাখ মানুষের জন্য পুরো গাজায় হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার শয্যা রয়েছে মাত্র ২ হাজার ২০০টি। যুদ্ধের আগে শুধু আল-শিফা হাসপাতালেই ছিল ৭০০ শয্যা।

পরীক্ষাগার, অস্ত্রোপচারসহ বিভিন্ন চিকিৎসাসেবার অনেক কিছুই এখন আর পাওয়া যাচ্ছে না। প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জাম ও ওষুধের অভাবের পাশাপাশি চিকিৎসাকর্মীর সংকটও রয়েছে।

চিকিৎসাকেন্দ্র ধ্বংস ও ব্যাপক বাস্তুচ্যুতির কারণে গাজায় স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার অধিকার কার্যত বিশেষ সুবিধায় পরিণত হয়েছে। তাই শুধু হাসপাতাল পুনর্নির্মাণ নয়, প্রাথমিক চিকিৎসাকেন্দ্রগুলো পুনরায় চালু করা এবং বাস্তুচ্যুতি শিবিরে বসবাসকারী সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ মানুষের কাছে সরাসরি চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দিতে জরুরি ভিত্তিতে বড় ধরনের স্বাস্থ্য উদ্যোগ প্রয়োজন।

সূত্র: আল জাজিরা