০৪:২৩ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৬ অগাস্ট ২০২৬, ১০ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

প্লাস্টিক বর্জ্য থেকে তৈরি বিস্কুট, নভোচারীদের খাবার সংকট মেটাতে গবেষণা

নিউজ ডেস্ক

প্লাস্টিক বর্জ্যকে রূপান্তর করে থ্রিডি প্রিন্টারের মাধ্যমে বিস্কুট তৈরির প্রযুক্তি নিয়ে গবেষণা চলছে।

প্লাস্টিক দিয়ে তৈরি বিস্কুট খেতে চাইবেন? শুনতে অদ্ভুত লাগলেও প্লাস্টিক বর্জ্যকে খাদ্য উপাদানে রূপান্তর করে বিস্কুট তৈরির প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছেন একদল গবেষক। মহাকাশ অভিযানে দীর্ঘমেয়াদি খাদ্যসংকট মোকাবিলার সম্ভাব্য সমাধান হিসেবে এ প্রযুক্তি নিয়ে গবেষণা চলছে।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে এনডিটিভি জানিয়েছে, নাসার অর্থায়নে পরিচালিত একটি প্রকল্পের অংশ হিসেবে এই গবেষণা চলছে। ভবিষ্যতে দীর্ঘ সময়ের মহাকাশ অভিযানে নভোচারীদের খাবারের জোগান নিশ্চিত করাই প্রকল্পটির অন্যতম লক্ষ্য।

যেভাবে প্লাস্টিক থেকে খাবার

সরাসরি প্লাস্টিক মানুষের জন্য বিষাক্ত। তাই গবেষকেরা প্লাস্টিককে খাবারে রূপান্তরের আগে জটিল জৈব পুনর্ব্যবহার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এর রাসায়নিক গঠন ভেঙে ফেলছেন।

গবেষণায় ব্যবহৃত প্লাস্টিকের অন্যতম প্রধান ধরন পলিইথিলিন টেরেফথালেট বা পিইটি। কোমল পানীয় ও পানির বোতলের মতো একবার ব্যবহারযোগ্য বিভিন্ন পণ্য তৈরিতে এই প্লাস্টিক ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়।

গবেষকেরা পিইটি প্লাস্টিকের সঙ্গে ফেলে দেওয়া ভুট্টাগাছের কাণ্ড, পাতা এবং অন্যান্য জৈব পদার্থ মিশিয়ে উচ্চ তাপমাত্রা ও চাপে পানি ও অক্সিজেনের সাহায্যে একটি বিশেষ রাসায়নিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে নিয়ে যান। এতে শক্ত উপাদানগুলো এমন ক্ষুদ্র অংশে ভেঙে যায়, যা অণুজীব সহজে ব্যবহার করতে পারে।

এরপর ওই ভাঙা প্লাস্টিক যৌগের মধ্যে বিশেষ ধরনের ব্যাকটেরিয়া বা ইস্ট প্রয়োগ করা হয়। গবেষকদের তৈরি এসব অণুজীব প্লাস্টিকের উপজাত ব্যবহার করে প্রোটিন, চর্বি ও প্রয়োজনীয় শর্করায় সমৃদ্ধ জৈব পদার্থ তৈরি করে।

পরে এসব উপাদান পরিশোধন ও স্বাদযুক্ত করে থ্রিডি ফুড প্রিন্টারে দেওয়া হয়। প্রিন্টারটি স্তরে স্তরে পেস্ট বের করে বিস্কুটের মতো খাবারের আকৃতি তৈরি করে। এরপর তা বেক বা শক্ত করে প্রস্তুত করা হয়।

গবেষণাটির নেতৃত্ব দেওয়া সাউদার্ন ইলিনয় বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্বনডেলের অণুজীববিজ্ঞানী ড. লাহিরু জয়াকোডি বলেন, তার গবেষণাগারে প্লাস্টিক পুনর্ব্যবহারের প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করা হয়। তার প্রশ্ন ছিল, প্লাস্টিকও যদি কার্বন দিয়ে তৈরি হয় এবং খাবারও কার্বননির্ভর হয়, তাহলে খাবার তৈরির সম্ভাবনা নিয়ে কেন গবেষণা করা হবে না?

তবে এখনো এসব বিস্কুট মানুষের খাওয়ার অনুমোদন পায়নি। পরীক্ষা-নিরীক্ষার অনুমতি না পাওয়ায় গবেষকেরা নিজেরাও বিস্কুটের স্বাদ নেননি। অবশ্য গন্ধের বিচারে বিস্কুটগুলো ভালো সাড়া পেয়েছে।

কেন নভোচারীদের জন্য?

পৃথিবীতে প্লাস্টিক থেকে তৈরি খাবারের ধারণা অনেকের কাছেই অস্বস্তিকর হতে পারে। তবে দীর্ঘমেয়াদি মহাকাশ অভিযানে এর সম্ভাবনা রয়েছে। বিশেষ করে মঙ্গলগ্রহে যাওয়া-আসার মতো দীর্ঘ অভিযানে নভোচারীদের সীমিত সম্পদ সর্বোচ্চ কাজে লাগাতে হয়।

জয়াকোডির মতে, মঙ্গল অভিযানে যাওয়া-আসায় প্রায় তিন বছর সময় লাগতে পারে। তাই মহাকাশযানে থাকা প্রতিটি জিনিস পুনর্ব্যবহারের সুযোগ গুরুত্বপূর্ণ।

ভবিষ্যতে প্লাস্টিকের প্যাকেজিং, সরঞ্জামের মোড়ক বা অব্যবহৃত সামগ্রীকে খাদ্য উপাদানে রূপান্তরের সুযোগ তৈরি হলে মহাকাশে খাবার সরবরাহের ওপর চাপ কমতে পারে। শুধু মহাকাশ নয়, সাবমেরিন কিংবা দুর্যোগকবলিত এলাকাতেও এমন প্রযুক্তি কাজে লাগতে পারে বলে মনে করছেন গবেষকেরা।

জয়াকোডি বলেন, ২০৫০ সালের মধ্যে বিশ্বে খাদ্যের চাহিদা ৩৫ থেকে ৫৬ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। একই সময়ে বিশ্বের প্রায় ৩০ শতাংশ মানুষ ভবিষ্যতে ক্ষুধার ঝুঁকিতে পড়তে পারে। এ সমস্যা মোকাবিলায় অণুজীবভিত্তিক প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করেন তিনি।

তবে বর্তমানে এই প্রযুক্তিতে তৈরি বিস্কুট উৎপাদনে প্রতি কেজিতে প্রায় ৬০ ডলার খরচ হচ্ছে। ফলে ব্যাপক বাণিজ্যিক উৎপাদনের আগে উৎপাদন ব্যয় কমানো এবং মানবদেহের জন্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই গবেষকদের বড় চ্যালেঞ্জ।

সূত্র: এনডিটিভি

প্লাস্টিক বর্জ্য থেকে তৈরি বিস্কুট, নভোচারীদের খাবার সংকট মেটাতে গবেষণা

সময় : ১১:৩৮:১৯ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৫ অগাস্ট ২০২৬

প্লাস্টিক দিয়ে তৈরি বিস্কুট খেতে চাইবেন? শুনতে অদ্ভুত লাগলেও প্লাস্টিক বর্জ্যকে খাদ্য উপাদানে রূপান্তর করে বিস্কুট তৈরির প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছেন একদল গবেষক। মহাকাশ অভিযানে দীর্ঘমেয়াদি খাদ্যসংকট মোকাবিলার সম্ভাব্য সমাধান হিসেবে এ প্রযুক্তি নিয়ে গবেষণা চলছে।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে এনডিটিভি জানিয়েছে, নাসার অর্থায়নে পরিচালিত একটি প্রকল্পের অংশ হিসেবে এই গবেষণা চলছে। ভবিষ্যতে দীর্ঘ সময়ের মহাকাশ অভিযানে নভোচারীদের খাবারের জোগান নিশ্চিত করাই প্রকল্পটির অন্যতম লক্ষ্য।

যেভাবে প্লাস্টিক থেকে খাবার

সরাসরি প্লাস্টিক মানুষের জন্য বিষাক্ত। তাই গবেষকেরা প্লাস্টিককে খাবারে রূপান্তরের আগে জটিল জৈব পুনর্ব্যবহার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এর রাসায়নিক গঠন ভেঙে ফেলছেন।

গবেষণায় ব্যবহৃত প্লাস্টিকের অন্যতম প্রধান ধরন পলিইথিলিন টেরেফথালেট বা পিইটি। কোমল পানীয় ও পানির বোতলের মতো একবার ব্যবহারযোগ্য বিভিন্ন পণ্য তৈরিতে এই প্লাস্টিক ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়।

গবেষকেরা পিইটি প্লাস্টিকের সঙ্গে ফেলে দেওয়া ভুট্টাগাছের কাণ্ড, পাতা এবং অন্যান্য জৈব পদার্থ মিশিয়ে উচ্চ তাপমাত্রা ও চাপে পানি ও অক্সিজেনের সাহায্যে একটি বিশেষ রাসায়নিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে নিয়ে যান। এতে শক্ত উপাদানগুলো এমন ক্ষুদ্র অংশে ভেঙে যায়, যা অণুজীব সহজে ব্যবহার করতে পারে।

এরপর ওই ভাঙা প্লাস্টিক যৌগের মধ্যে বিশেষ ধরনের ব্যাকটেরিয়া বা ইস্ট প্রয়োগ করা হয়। গবেষকদের তৈরি এসব অণুজীব প্লাস্টিকের উপজাত ব্যবহার করে প্রোটিন, চর্বি ও প্রয়োজনীয় শর্করায় সমৃদ্ধ জৈব পদার্থ তৈরি করে।

পরে এসব উপাদান পরিশোধন ও স্বাদযুক্ত করে থ্রিডি ফুড প্রিন্টারে দেওয়া হয়। প্রিন্টারটি স্তরে স্তরে পেস্ট বের করে বিস্কুটের মতো খাবারের আকৃতি তৈরি করে। এরপর তা বেক বা শক্ত করে প্রস্তুত করা হয়।

গবেষণাটির নেতৃত্ব দেওয়া সাউদার্ন ইলিনয় বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্বনডেলের অণুজীববিজ্ঞানী ড. লাহিরু জয়াকোডি বলেন, তার গবেষণাগারে প্লাস্টিক পুনর্ব্যবহারের প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করা হয়। তার প্রশ্ন ছিল, প্লাস্টিকও যদি কার্বন দিয়ে তৈরি হয় এবং খাবারও কার্বননির্ভর হয়, তাহলে খাবার তৈরির সম্ভাবনা নিয়ে কেন গবেষণা করা হবে না?

তবে এখনো এসব বিস্কুট মানুষের খাওয়ার অনুমোদন পায়নি। পরীক্ষা-নিরীক্ষার অনুমতি না পাওয়ায় গবেষকেরা নিজেরাও বিস্কুটের স্বাদ নেননি। অবশ্য গন্ধের বিচারে বিস্কুটগুলো ভালো সাড়া পেয়েছে।

কেন নভোচারীদের জন্য?

পৃথিবীতে প্লাস্টিক থেকে তৈরি খাবারের ধারণা অনেকের কাছেই অস্বস্তিকর হতে পারে। তবে দীর্ঘমেয়াদি মহাকাশ অভিযানে এর সম্ভাবনা রয়েছে। বিশেষ করে মঙ্গলগ্রহে যাওয়া-আসার মতো দীর্ঘ অভিযানে নভোচারীদের সীমিত সম্পদ সর্বোচ্চ কাজে লাগাতে হয়।

জয়াকোডির মতে, মঙ্গল অভিযানে যাওয়া-আসায় প্রায় তিন বছর সময় লাগতে পারে। তাই মহাকাশযানে থাকা প্রতিটি জিনিস পুনর্ব্যবহারের সুযোগ গুরুত্বপূর্ণ।

ভবিষ্যতে প্লাস্টিকের প্যাকেজিং, সরঞ্জামের মোড়ক বা অব্যবহৃত সামগ্রীকে খাদ্য উপাদানে রূপান্তরের সুযোগ তৈরি হলে মহাকাশে খাবার সরবরাহের ওপর চাপ কমতে পারে। শুধু মহাকাশ নয়, সাবমেরিন কিংবা দুর্যোগকবলিত এলাকাতেও এমন প্রযুক্তি কাজে লাগতে পারে বলে মনে করছেন গবেষকেরা।

জয়াকোডি বলেন, ২০৫০ সালের মধ্যে বিশ্বে খাদ্যের চাহিদা ৩৫ থেকে ৫৬ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। একই সময়ে বিশ্বের প্রায় ৩০ শতাংশ মানুষ ভবিষ্যতে ক্ষুধার ঝুঁকিতে পড়তে পারে। এ সমস্যা মোকাবিলায় অণুজীবভিত্তিক প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করেন তিনি।

তবে বর্তমানে এই প্রযুক্তিতে তৈরি বিস্কুট উৎপাদনে প্রতি কেজিতে প্রায় ৬০ ডলার খরচ হচ্ছে। ফলে ব্যাপক বাণিজ্যিক উৎপাদনের আগে উৎপাদন ব্যয় কমানো এবং মানবদেহের জন্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই গবেষকদের বড় চ্যালেঞ্জ।

সূত্র: এনডিটিভি