০৬:০৪ অপরাহ্ন, বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৫ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ইরাক থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার, তেল রাজস্বে নিউইয়র্ক ফেডের প্রভাব বহাল

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

ইরাক থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার হলেও দেশটির তেল রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় নিউইয়র্ক ফেডের ভূমিকা বহাল রয়েছে।

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: দুই দশকের বেশি সময়ের সামরিক উপস্থিতির পর বুধবার ইরাক থেকে শেষ সেনাদেরও সরিয়ে নিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। তবে সেনা প্রত্যাহার হলেও দেশটির অর্থনীতিতে ওয়াশিংটনের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব এখনো রয়ে গেছে। ইরাকের তেল বিক্রি থেকে পাওয়া রাজস্বের অর্থ এখনো নিউইয়র্কের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকের মাধ্যমে রাখা ও পরিচালিত হচ্ছে।

২০০৩ সালের মার্কিন নেতৃত্বাধীন আগ্রাসনের পর থেকেই এই ব্যবস্থা চলে আসছে।

কীভাবে শুরু হয়েছিল এই ব্যবস্থা

২০০৩ সালে ইরাকে আগ্রাসনের পর যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন কোয়ালিশন প্রভিশনাল অথরিটি ‘ডেভেলপমেন্ট ফান্ড ফর ইরাক’ (ডিএফআই) গঠন করে। নিউইয়র্ক ফেডে রাখা এই তহবিলের উদ্দেশ্য ছিল ইরাকের তেল বিক্রির অর্থ সংরক্ষণ করে দেশটির পুনর্গঠন ও উন্নয়ন কাজে ব্যবহার করা।

একই সঙ্গে সাবেক প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনের আমলের বিভিন্ন মামলা, পাওনা ও আইনি দাবির হাত থেকে ইরাকের তেল রাজস্ব সুরক্ষিত রাখাও এই ব্যবস্থার অন্যতম লক্ষ্য ছিল।

তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশের নির্বাহী আদেশে ব্যবস্থা চালু হওয়ার পর পরবর্তী মার্কিন প্রশাসনগুলোও তা নবায়ন করে। পরে ডিএফআইয়ের কাঠামো পরিবর্তিত হয়ে নিউইয়র্ক ফেডে ইরাকের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একটি হিসাব হিসেবে কার্যকর থাকে।

ইরাকের ওপর এর প্রভাব কতটা

ইরাকের সরকারি আয়ের সবচেয়ে বড় উৎস তেল। দেশটির বাজেটের প্রায় ৯০ শতাংশই এই খাত থেকে আসে। ফলে তেল রাজস্বের অর্থ ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত এই কাঠামো ইরাকের অর্থনীতি ও আর্থিক ব্যবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রের উল্লেখযোগ্য প্রভাব তৈরি করেছে।

২০২০ সালে মার্কিন সেনাদের ইরাক থেকে প্রত্যাহারের দাবি ওঠার সময় ওয়াশিংটন নিউইয়র্ক ফেডে থাকা অর্থে ইরাকের প্রবেশাধিকার সীমিত করার হুমকি দিয়েছিল বলে জানা যায়। এর ফলে বাগদাদ শেষ পর্যন্ত ওই অবস্থান থেকে সরে আসে বলে রয়টার্সের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে সময়ের সঙ্গে ইরাক নিজেদের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় আগের তুলনায় বেশি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে। একই সঙ্গে দেশটির অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব বাড়ানোর প্রচেষ্টাও অব্যাহত রয়েছে।

কেন এখনো এই ব্যবস্থা বদলায়নি

ইরাকি কর্মকর্তাদের মতে, নিউইয়র্ক ফেডের মাধ্যমে তেল রাজস্ব পরিচালনার ব্যবস্থা দেশটির আর্থিক স্থিতিশীলতা ও সরকারি অর্থের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সহায়তা করে।

এর মাধ্যমে তেল আয়ের ব্যবস্থাপনায় আন্তর্জাতিক আস্থা বজায় থাকে এবং বৈদেশিক বাণিজ্য ও আমদানির জন্য প্রয়োজনীয় মার্কিন ডলার সংগ্রহ তুলনামূলকভাবে সহজ হয়।

এ ছাড়া আন্তর্জাতিক ঋণদাতা, মামলা ও অন্যান্য আর্থিক দাবির মতো ঝুঁকি থেকেও রাজস্ব সুরক্ষিত থাকে। কর্মকর্তাদের মতে, এই ব্যবস্থা ইরাকি দিনারের বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখা এবং দেশের আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর আস্থা ধরে রাখতেও ভূমিকা রাখে।

ডলার নিয়ন্ত্রণে তৈরি হয়েছে নতুন সমস্যা

তবে ডলারের সরবরাহে কঠোর নিয়ন্ত্রণের কারণে ইরাকে সরকারি ও অনানুষ্ঠানিক বাজারের মধ্যে বড় ধরনের পার্থক্য তৈরি হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্ধারিত বিনিময় হারের পাশাপাশি খোলাবাজারে ডলারের আলাদা দাম তৈরি হয়।

ইরান ও অন্যান্য নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা পক্ষগুলোর কাছে ডলার পাচারের অভিযোগের পর যুক্তরাষ্ট্র ইরাকের আর্থিক ব্যবস্থার ওপর চাপ বাড়ায়।

এরই ধারাবাহিকতায় ২০২৫ সালের শুরুতে ইরাক দীর্ঘদিনের ডলার নিলাম বা ‘ফরেন কারেন্সি উইন্ডো’ ব্যবস্থা আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধ করে দেয়।

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনার মাঝেও ইরাক

ইরাক একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা করে আসছে। ফলে দুই দেশের বিরোধের প্রভাব প্রায়ই বাগদাদের অর্থনীতি ও রাজনীতিতে পড়ে।

যুক্তরাষ্ট্র ইরান-সংশ্লিষ্ট অর্থপাচারের অভিযোগে ইরাকের কয়েকটি ব্যাংক ও ব্যক্তির ওপর নিষেধাজ্ঞাও আরোপ করেছে।

ফলে মার্কিন সেনারা ইরাক থেকে পুরোপুরি সরে গেলেও তেল রাজস্ব ব্যবস্থাপনার এই কাঠামো দেশটির সঙ্গে ওয়াশিংটনের দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হয়ে রয়েছে।

বর্তমানে ইরাক নিজেদের আর্থিক স্বাধীনতা বাড়ানোর চেষ্টা করলেও তেল আয়ের অর্থ নিউইয়র্ক ফেডে রাখার ব্যবস্থা এখনো বহাল রয়েছে।

ইরাক থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার, তেল রাজস্বে নিউইয়র্ক ফেডের প্রভাব বহাল

সময় : ০৬:০৪:০৯ অপরাহ্ন, বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: দুই দশকের বেশি সময়ের সামরিক উপস্থিতির পর বুধবার ইরাক থেকে শেষ সেনাদেরও সরিয়ে নিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। তবে সেনা প্রত্যাহার হলেও দেশটির অর্থনীতিতে ওয়াশিংটনের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব এখনো রয়ে গেছে। ইরাকের তেল বিক্রি থেকে পাওয়া রাজস্বের অর্থ এখনো নিউইয়র্কের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকের মাধ্যমে রাখা ও পরিচালিত হচ্ছে।

২০০৩ সালের মার্কিন নেতৃত্বাধীন আগ্রাসনের পর থেকেই এই ব্যবস্থা চলে আসছে।

কীভাবে শুরু হয়েছিল এই ব্যবস্থা

২০০৩ সালে ইরাকে আগ্রাসনের পর যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন কোয়ালিশন প্রভিশনাল অথরিটি ‘ডেভেলপমেন্ট ফান্ড ফর ইরাক’ (ডিএফআই) গঠন করে। নিউইয়র্ক ফেডে রাখা এই তহবিলের উদ্দেশ্য ছিল ইরাকের তেল বিক্রির অর্থ সংরক্ষণ করে দেশটির পুনর্গঠন ও উন্নয়ন কাজে ব্যবহার করা।

একই সঙ্গে সাবেক প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনের আমলের বিভিন্ন মামলা, পাওনা ও আইনি দাবির হাত থেকে ইরাকের তেল রাজস্ব সুরক্ষিত রাখাও এই ব্যবস্থার অন্যতম লক্ষ্য ছিল।

তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশের নির্বাহী আদেশে ব্যবস্থা চালু হওয়ার পর পরবর্তী মার্কিন প্রশাসনগুলোও তা নবায়ন করে। পরে ডিএফআইয়ের কাঠামো পরিবর্তিত হয়ে নিউইয়র্ক ফেডে ইরাকের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একটি হিসাব হিসেবে কার্যকর থাকে।

ইরাকের ওপর এর প্রভাব কতটা

ইরাকের সরকারি আয়ের সবচেয়ে বড় উৎস তেল। দেশটির বাজেটের প্রায় ৯০ শতাংশই এই খাত থেকে আসে। ফলে তেল রাজস্বের অর্থ ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত এই কাঠামো ইরাকের অর্থনীতি ও আর্থিক ব্যবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রের উল্লেখযোগ্য প্রভাব তৈরি করেছে।

২০২০ সালে মার্কিন সেনাদের ইরাক থেকে প্রত্যাহারের দাবি ওঠার সময় ওয়াশিংটন নিউইয়র্ক ফেডে থাকা অর্থে ইরাকের প্রবেশাধিকার সীমিত করার হুমকি দিয়েছিল বলে জানা যায়। এর ফলে বাগদাদ শেষ পর্যন্ত ওই অবস্থান থেকে সরে আসে বলে রয়টার্সের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে সময়ের সঙ্গে ইরাক নিজেদের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় আগের তুলনায় বেশি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে। একই সঙ্গে দেশটির অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব বাড়ানোর প্রচেষ্টাও অব্যাহত রয়েছে।

কেন এখনো এই ব্যবস্থা বদলায়নি

ইরাকি কর্মকর্তাদের মতে, নিউইয়র্ক ফেডের মাধ্যমে তেল রাজস্ব পরিচালনার ব্যবস্থা দেশটির আর্থিক স্থিতিশীলতা ও সরকারি অর্থের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সহায়তা করে।

এর মাধ্যমে তেল আয়ের ব্যবস্থাপনায় আন্তর্জাতিক আস্থা বজায় থাকে এবং বৈদেশিক বাণিজ্য ও আমদানির জন্য প্রয়োজনীয় মার্কিন ডলার সংগ্রহ তুলনামূলকভাবে সহজ হয়।

এ ছাড়া আন্তর্জাতিক ঋণদাতা, মামলা ও অন্যান্য আর্থিক দাবির মতো ঝুঁকি থেকেও রাজস্ব সুরক্ষিত থাকে। কর্মকর্তাদের মতে, এই ব্যবস্থা ইরাকি দিনারের বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখা এবং দেশের আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর আস্থা ধরে রাখতেও ভূমিকা রাখে।

ডলার নিয়ন্ত্রণে তৈরি হয়েছে নতুন সমস্যা

তবে ডলারের সরবরাহে কঠোর নিয়ন্ত্রণের কারণে ইরাকে সরকারি ও অনানুষ্ঠানিক বাজারের মধ্যে বড় ধরনের পার্থক্য তৈরি হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্ধারিত বিনিময় হারের পাশাপাশি খোলাবাজারে ডলারের আলাদা দাম তৈরি হয়।

ইরান ও অন্যান্য নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা পক্ষগুলোর কাছে ডলার পাচারের অভিযোগের পর যুক্তরাষ্ট্র ইরাকের আর্থিক ব্যবস্থার ওপর চাপ বাড়ায়।

এরই ধারাবাহিকতায় ২০২৫ সালের শুরুতে ইরাক দীর্ঘদিনের ডলার নিলাম বা ‘ফরেন কারেন্সি উইন্ডো’ ব্যবস্থা আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধ করে দেয়।

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনার মাঝেও ইরাক

ইরাক একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা করে আসছে। ফলে দুই দেশের বিরোধের প্রভাব প্রায়ই বাগদাদের অর্থনীতি ও রাজনীতিতে পড়ে।

যুক্তরাষ্ট্র ইরান-সংশ্লিষ্ট অর্থপাচারের অভিযোগে ইরাকের কয়েকটি ব্যাংক ও ব্যক্তির ওপর নিষেধাজ্ঞাও আরোপ করেছে।

ফলে মার্কিন সেনারা ইরাক থেকে পুরোপুরি সরে গেলেও তেল রাজস্ব ব্যবস্থাপনার এই কাঠামো দেশটির সঙ্গে ওয়াশিংটনের দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হয়ে রয়েছে।

বর্তমানে ইরাক নিজেদের আর্থিক স্বাধীনতা বাড়ানোর চেষ্টা করলেও তেল আয়ের অর্থ নিউইয়র্ক ফেডে রাখার ব্যবস্থা এখনো বহাল রয়েছে।