গ্লাসগোর অ্যাথলেট ভিলেজের শেষ রাত, স্মৃতি নিয়ে ফিরলেন ক্রীড়াবিদরা
গ্লাসগো প্রতিনিধি:
রাত তখন অনেকটা গড়িয়ে গেছে। অ্যাথলেট ভিলেজের করিডরে দিনের মতো আর নেই ব্যস্ততা। তবে পুরোপুরি নেমে আসেনি নীরবতাও। কোথাও স্যুটকেসের চাকা মেঝেতে ঘষে এগিয়ে যাচ্ছে, কোথাও আলমারির দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দ, কোথাও শেষ মুহূর্তের হাসি, আবার কোথাও চাপা দীর্ঘশ্বাস। প্রতিটি কক্ষ যেন নিজের মতো করে গুছিয়ে নিচ্ছে বিদায়ের প্রস্তুতি।
স্টেডিয়ামের আলো তখনো জ্বলছে কোথাও কোথাও। প্রতিযোগিতা শেষ, থেমে গেছে করতালি। কেউ গলায় ঝুলিয়ে রেখেছেন পদক, আবার কেউ ফিরছেন খালি হাতে। তবে বিদায়ের এই রাতে সবাই সমান—সবার সঙ্গী একটি শহরের স্মৃতি।
কয়েক দিন আগেও এই অ্যাথলেট ভিলেজ ছিল পৃথিবীর ক্ষুদ্র এক প্রতিচ্ছবি। একই ডাইনিং হলে বসে খাবার খেয়েছেন আফ্রিকার দৌড়বিদ, ক্যারিবীয় অঞ্চলের সাঁতারু, এশিয়ার বক্সার ও ইউরোপের জিমন্যাস্টরা। ভাষা, সংস্কৃতি ও দেশের পার্থক্য থাকলেও অনুশীলন, খাবারের টেবিল আর আড্ডার মাধ্যমে অচেনা মানুষগুলো হয়ে উঠেছিলেন আপন।
একটি কক্ষের সামনে দেখা গেল কয়েকজন অ্যাথলেট নিজেদের দেশের জার্সি বিনিময় করছেন। প্রতিযোগিতার মাঠে তারা ছিলেন প্রতিদ্বন্দ্বী। জয় পেতে কেউ কাউকে ছাড় দেননি। কিন্তু শেষ রাতে সেই জার্সিই হয়ে উঠেছে বন্ধুত্বের সবচেয়ে মূল্যবান স্মারক।
এক তরুণ অ্যাথলেট বলেন, “পদক সবাই পায় না। কিন্তু এই জার্সিটা আমি সারাজীবন রেখে দেব। এটা আমাকে একজন বন্ধুর কথা মনে করিয়ে দেবে।”
বাংলাদেশ দলের কক্ষেও তখন ব্যস্ততা। কেউ যত্ন করে ভাঁজ করছেন লাল-সবুজ জার্সি, কেউ গুছিয়ে রাখছেন অ্যাক্রেডিটেশন কার্ড, আবার কেউ মোবাইলে তোলা ছবিগুলো শেষবারের মতো দেখে নিচ্ছেন। কয়েক দিনের পরিচিত বিছানা, টেবিল ও জানালাও যেন বিদায়ের আগে আপন হয়ে উঠেছে।
অ্যাথলেটিকস ও বক্সিং দলের সদস্যরা এবার দেশে ফিরবেন। কারও গলায় নেই পদক, তবে প্রত্যেকের ব্যাগে রয়েছে নিজের সীমা ছুঁয়ে দেখার অভিজ্ঞতা, শেখার গল্প এবং নতুন স্বপ্ন।
বাংলাদেশের এক ক্রীড়াবিদ বলেন, “এবার পদক আনতে পারিনি। তবে এই অভিজ্ঞতা আমাদের বদলে দিয়েছে। আবার ফিরব, আরও ভালো প্রস্তুতি নিয়ে।”
রাত যত গভীর হচ্ছিল, করিডরে ততই বাড়ছিল বিদায়ের আলিঙ্গন। কেউ হয়তো আর কোনোদিন দেখা করবেন না, তবুও একে অন্যকে জড়িয়ে ধরে বলছেন—‘আবার দেখা হবে।’ কেউ উপহার দিচ্ছেন দেশের ছোট্ট পতাকা, কেউ ব্যাজ, আবার কেউ রেখে দিচ্ছেন একটি ছবি।
এক কোণে বসে এক আফ্রিকান অ্যাথলেট ভিডিও কলে কথা বলছিলেন মায়ের সঙ্গে। তার গলায় ঝুলছিল পদক। ওপাশে আনন্দে কাঁদছিলেন মা। একটু দূরেই আরেকজন অ্যাথলেট চুপচাপ জানালার বাইরে তাকিয়ে ছিলেন। তার কোনো পদক নেই, কিন্তু চোখেমুখে ছিল শান্তি। কারণ তার যাত্রা এখানেই শেষ নয়।
অ্যাথলেট ভিলেজে জয় ও পরাজয় একই করিডরে পাশাপাশি হাঁটে। কেউ স্বর্ণপদক নিয়ে ফেরেন, কেউ ব্যক্তিগত সেরা পারফরম্যান্স নিয়ে, আবার কেউ শুধু অভিজ্ঞতা নিয়ে। কিন্তু প্রত্যেকের স্যুটকেসে থাকে এমন কিছু স্মৃতি, যার মূল্য কোনো পদকের চেয়ে কম নয়।
এক তরুণী অ্যাথলেট মোবাইলের স্ক্রিনে দেখাচ্ছিলেন উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের রঙিন মুহূর্ত, অনুশীলনের ক্লান্ত বিকেল, খাবারের টেবিলে বন্ধুদের সঙ্গে হাসির ছবি। তিনি বলেন, “এই ছবিগুলো দেখলেই মনে হবে, আমি একসময় পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর কয়েকটা দিন কাটিয়েছিলাম।”
ভোরের দিকে অ্যাথলেট ভিলেজ আরও নিস্তব্ধ হয়ে আসে। অনেক ঘরের দরজা খোলা, বিছানা গুছানো। কয়েক ঘণ্টা পর করিডরে আর থাকবে না এত ভাষার শব্দ, থাকবে না বিভিন্ন দেশের পতাকা আঁকা ট্র্যাকস্যুট, থাকবে না রাত জেগে হাসাহাসি।
সবকিছু আবার আগের মতো হয়ে যাবে। তবে এই দেয়ালগুলো সাক্ষী হয়ে থাকবে—এখানে একসময় পৃথিবীর নানা প্রান্তের তরুণ-তরুণীরা একই স্বপ্ন নিয়ে এসেছিলেন। কেউ জিতেছেন, কেউ হেরেছেন, কিন্তু সবাই মানুষ হিসেবে আরও সমৃদ্ধ হয়ে ফিরেছেন।
ভোর হলে বাংলাদেশের অ্যাথলেট ও বক্সাররাও বিমানে ওঠেন। জানালার নিচে ধীরে ধীরে ছোট হয়ে আসে স্কটস্টাউন স্টেডিয়াম, অ্যাথলেট ভিলেজ ও ক্লাইড নদী। কিন্তু গ্লাসগো থেকে যায় তাদের স্মৃতিতে।
শেষ রাতে কেউ কেঁদেছেন, কেউ হেসেছেন, কেউ বিদায় জানিয়েছেন, আবার কেউ নতুন করে দেখা হওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে গেছেন।
গ্লাসগোর অ্যাথলেট ভিলেজের শেষ রাত ছিল হাজারো বন্ধুত্ব, অগণিত স্মৃতি এবং নতুন স্বপ্ন নিয়ে ঘরে ফেরার এক নীরব উৎসব। কিছু বিদায় শেষ নয়, কিছু বিদায় শুধু বলে—আবার দেখা হবে।
























