১২:১৭ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৬ অগাস্ট ২০২৬, ১১ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ভারত ভ্রমণের পর ব্রিটিশ নারীর মস্তিষ্কে পাওয়া গেল ৩৮টি পরজীবী

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

ছবি: সংগৃহীত

চিকিৎসাবিজ্ঞানে মাঝে মধ্যে এমন কিছু ঘটনা ঘটে যা সাধারণ মানুষকে তো বটেই, খোদ চিকিৎসকদেরও স্তম্ভিত করে দেয়। ২০১০ সালে যুক্তরাজ্যের বাসিন্দা লোরি ডেনম্যান নামের এক নারী তেমনই এক ভয়ানক অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন, যা পরবর্তী এক দশক ধরে তার জীবনকে আমূল বদলে দিয়েছিল।

ঘটনা ২০১০ সালের। সে সময় লোরি একটি রেস্তোরাঁর টয়লেট ব্যবহার করতে গেলে দেখতে পান, তার শরীর থেকে প্রায় এক মিটার (তিন ফুট) লম্বা একটি ফিতাকৃমি বেরিয়ে আসে।

প্রাথমিকভাবে চিকিৎসকদের কাছে সাধারণ ঘটনা মনে হলেও, আসল ধাক্কাটি আসে এর পরের বছর। ২০১১ সালে লোরি হঠাৎ করেই প্রথমবার মৃগীরোগের মতো খিঁচুনি বা ফিটের সমস্যায় আক্রান্ত হন।

এরপর গভীরভাবে স্বাস্থ্য পরীক্ষার পর চিকিৎসকরা তার মস্তিষ্কের স্ক্যান রিপোর্ট দেখে চমকে ওঠেন। ব্রিটিশ গণমাধ্যম বিবিসিকে লোরি বলেন, ‘ডাক্তার আমাকে বসিয়ে শান্তভাবে বললেন, ‘আমরা আপনার স্ক্যান রিপোর্ট দেখেছি এবং আপনার মস্তিষ্কে ৩৮টি পরজীবী পাওয়া গেছে।’ কথাটি শুনে আমার আর আমার মায়ের মুখের চোয়াল যেন ঝুলে পড়ল। আমরা প্রচণ্ড বড় একটা ধাক্কা খেয়েছিলাম—কীভাবে মানুষের মাথায় এতগুলো পোকা থাকতে পারে!’

তদন্তে জানা যায়, লোরি ২০০৭ সালে প্রায় তিন মাসের জন্য ভারতে ভ্রমণে এসেছিলেন। চিকিৎসকদের ধারণা, এই সফরের সময়ই তিনি সংক্রমিত হন।

সবচেয়ে অদ্ভুত বিষয় হলো, ভারতে থাকাকালীন লোরি যেন ফুড পয়জনিং বা পেটের সমস্যায় না পড়েন, সেজন্য সচেতনভাবে যেকোনো ধরনের মাংস খাওয়া থেকে সম্পূর্ণ বিরত ছিলেন। কিন্তু তারপরেও কীভাবে তার শরীরে শুকরের ফিতাকৃমি প্রবেশ করল?

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, এটি দুই ভাবে ছড়াতে পারে। প্রথমত, ভালোভাবে সেদ্ধ না করা শুকরের মাংস খেলে পেটে ফিতাকৃমি জন্মায়। দ্বিতীয়ত, যদি কোনো আক্রান্ত ব্যক্তির মল বা অসচেতনতার মাধ্যমে এই কৃমির আণুবীক্ষণিক ডিম খাবার বা পানির সঙ্গে মিশে যায়, তবে তা যে কারো শরীরে প্রবেশ করতে পারে।

লোরি মাংস না খেলেও, পরোক্ষভাবে এমন কোনো দূষিত পানি বা কাঁচা শাকসবজি খেয়েছিলেন যার মধ্যে ফিতাকৃমির আণুবীক্ষণিক ডিম ছিল।

‘নিউরোসিস্টাইসারকোসিস’ কী?

লোরি যে রোগটিতে আক্রান্ত হয়েছিলেন চিকিৎসাবিজ্ঞানে সেটিকে বলা হয় নিউরোসিস্টাইসারকোসিস। এটি মূলত শুকরের ফিতাকৃমি দ্বারা সৃষ্ট মানব কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রের একটি মারাত্মক সংক্রমণ। বিশ্বব্যাপী মৃগীরোগ বা খিঁচুনি হওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ এটি।

যখন মানুষ এই কৃমির আণুবীক্ষণিক ডিম অজান্তে গিলে ফেলে, তখন তা অন্ত্রে ফুটে রক্তপ্রবাহের মাধ্যমে মস্তিষ্কে চলে যায় এবং সেখানে তরল পূর্ণ ছোট ছোট সিস্ট বা থলি তৈরি করে।

দীর্ঘদিনের মানসিক ও শারীরিক যন্ত্রণা

মস্তিষ্কে ৩৮টি পরজীবী নিয়ে লোরির জীবন অসহনীয় হয়ে উঠেছিল। চিকিৎসার জন্য তাকে দেওয়া হয়েছিল কড়া অ্যান্টি-প্যারাসাইটিক ওষুধ এবং স্টেরয়েড। ওষুধ দেওয়ার পর তার মস্তিষ্কের ওই পরজীবীগুলোর চারপাশে তীব্র প্রদাহ বা ফোলাভাব তৈরি হয়।

এর ফলে লোরির শরীর জুড়ে অবশ ভাব ও সুই ফোটার মতো অনুভূতি হতে থাকে। একপর্যায়ে তিনি তীব্র মানসিক অবাদগ্রস্ততা, সাইকোসিস বা মানসিক বিকৃতি, চরম উদ্বেগ এবং প্যানিক অ্যাটাকের শিকার হন। পরিস্থিতি এতটাই জটিল রূপ নেয় যে তাকে চাকরি ছাড়তে হয় এবং প্রায় ৬ মাস একটি নিউরোসাইকিয়াট্রিক হাসপাতালে কাটাতে হয়।

বর্তমান অবস্থা

দীর্ঘ বছরব্যাপী লড়াইয়ের পর ২০২২ সালে লোরি আবার তার স্বাভাবিক কর্মজীবনে ফিরে আসতে পেরেছেন। ২০১৭ সালের পর থেকে তার আর কোনো খিঁচুনি বা ফিট হয়নি। চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, ওষুধ এবং স্টেরয়েডের মাধ্যমে তার মস্তিষ্কের সেই ৩৮টি পরজীবী এবং তাদের ডিম ধ্বংস করা সম্ভব হয়েছে এবং সেগুলো এখন মস্তিষ্কেই ‘ক্যালসিফাইড’ বা পাথরের মতো শক্ত হয়ে অকেজো হয়ে রয়েছে। এর জন্য আর কোনো অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হয়নি, তবে সারাজীবন লোরিকে মৃগীরোগের ওষুধ খেয়ে যেতে হবে।

তার প্রধান চিকিৎসক ডা. ব্র্যান্ডন হিলি বলেন, লোরির এই কেসটি ছিল অত্যন্ত বিরল। একজন চিকিৎসকের পুরো ক্যারিয়ারে এমন রোগী সাধারণত একবারই দেখা যায়।

সূত্র: এনডিটিভি

 

ভারত ভ্রমণের পর ব্রিটিশ নারীর মস্তিষ্কে পাওয়া গেল ৩৮টি পরজীবী

সময় : ০৭:০৭:০৭ অপরাহ্ন, শনিবার, ১১ জুলাই ২০২৬

চিকিৎসাবিজ্ঞানে মাঝে মধ্যে এমন কিছু ঘটনা ঘটে যা সাধারণ মানুষকে তো বটেই, খোদ চিকিৎসকদেরও স্তম্ভিত করে দেয়। ২০১০ সালে যুক্তরাজ্যের বাসিন্দা লোরি ডেনম্যান নামের এক নারী তেমনই এক ভয়ানক অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন, যা পরবর্তী এক দশক ধরে তার জীবনকে আমূল বদলে দিয়েছিল।

ঘটনা ২০১০ সালের। সে সময় লোরি একটি রেস্তোরাঁর টয়লেট ব্যবহার করতে গেলে দেখতে পান, তার শরীর থেকে প্রায় এক মিটার (তিন ফুট) লম্বা একটি ফিতাকৃমি বেরিয়ে আসে।

প্রাথমিকভাবে চিকিৎসকদের কাছে সাধারণ ঘটনা মনে হলেও, আসল ধাক্কাটি আসে এর পরের বছর। ২০১১ সালে লোরি হঠাৎ করেই প্রথমবার মৃগীরোগের মতো খিঁচুনি বা ফিটের সমস্যায় আক্রান্ত হন।

এরপর গভীরভাবে স্বাস্থ্য পরীক্ষার পর চিকিৎসকরা তার মস্তিষ্কের স্ক্যান রিপোর্ট দেখে চমকে ওঠেন। ব্রিটিশ গণমাধ্যম বিবিসিকে লোরি বলেন, ‘ডাক্তার আমাকে বসিয়ে শান্তভাবে বললেন, ‘আমরা আপনার স্ক্যান রিপোর্ট দেখেছি এবং আপনার মস্তিষ্কে ৩৮টি পরজীবী পাওয়া গেছে।’ কথাটি শুনে আমার আর আমার মায়ের মুখের চোয়াল যেন ঝুলে পড়ল। আমরা প্রচণ্ড বড় একটা ধাক্কা খেয়েছিলাম—কীভাবে মানুষের মাথায় এতগুলো পোকা থাকতে পারে!’

তদন্তে জানা যায়, লোরি ২০০৭ সালে প্রায় তিন মাসের জন্য ভারতে ভ্রমণে এসেছিলেন। চিকিৎসকদের ধারণা, এই সফরের সময়ই তিনি সংক্রমিত হন।

সবচেয়ে অদ্ভুত বিষয় হলো, ভারতে থাকাকালীন লোরি যেন ফুড পয়জনিং বা পেটের সমস্যায় না পড়েন, সেজন্য সচেতনভাবে যেকোনো ধরনের মাংস খাওয়া থেকে সম্পূর্ণ বিরত ছিলেন। কিন্তু তারপরেও কীভাবে তার শরীরে শুকরের ফিতাকৃমি প্রবেশ করল?

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, এটি দুই ভাবে ছড়াতে পারে। প্রথমত, ভালোভাবে সেদ্ধ না করা শুকরের মাংস খেলে পেটে ফিতাকৃমি জন্মায়। দ্বিতীয়ত, যদি কোনো আক্রান্ত ব্যক্তির মল বা অসচেতনতার মাধ্যমে এই কৃমির আণুবীক্ষণিক ডিম খাবার বা পানির সঙ্গে মিশে যায়, তবে তা যে কারো শরীরে প্রবেশ করতে পারে।

লোরি মাংস না খেলেও, পরোক্ষভাবে এমন কোনো দূষিত পানি বা কাঁচা শাকসবজি খেয়েছিলেন যার মধ্যে ফিতাকৃমির আণুবীক্ষণিক ডিম ছিল।

‘নিউরোসিস্টাইসারকোসিস’ কী?

লোরি যে রোগটিতে আক্রান্ত হয়েছিলেন চিকিৎসাবিজ্ঞানে সেটিকে বলা হয় নিউরোসিস্টাইসারকোসিস। এটি মূলত শুকরের ফিতাকৃমি দ্বারা সৃষ্ট মানব কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রের একটি মারাত্মক সংক্রমণ। বিশ্বব্যাপী মৃগীরোগ বা খিঁচুনি হওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ এটি।

যখন মানুষ এই কৃমির আণুবীক্ষণিক ডিম অজান্তে গিলে ফেলে, তখন তা অন্ত্রে ফুটে রক্তপ্রবাহের মাধ্যমে মস্তিষ্কে চলে যায় এবং সেখানে তরল পূর্ণ ছোট ছোট সিস্ট বা থলি তৈরি করে।

দীর্ঘদিনের মানসিক ও শারীরিক যন্ত্রণা

মস্তিষ্কে ৩৮টি পরজীবী নিয়ে লোরির জীবন অসহনীয় হয়ে উঠেছিল। চিকিৎসার জন্য তাকে দেওয়া হয়েছিল কড়া অ্যান্টি-প্যারাসাইটিক ওষুধ এবং স্টেরয়েড। ওষুধ দেওয়ার পর তার মস্তিষ্কের ওই পরজীবীগুলোর চারপাশে তীব্র প্রদাহ বা ফোলাভাব তৈরি হয়।

এর ফলে লোরির শরীর জুড়ে অবশ ভাব ও সুই ফোটার মতো অনুভূতি হতে থাকে। একপর্যায়ে তিনি তীব্র মানসিক অবাদগ্রস্ততা, সাইকোসিস বা মানসিক বিকৃতি, চরম উদ্বেগ এবং প্যানিক অ্যাটাকের শিকার হন। পরিস্থিতি এতটাই জটিল রূপ নেয় যে তাকে চাকরি ছাড়তে হয় এবং প্রায় ৬ মাস একটি নিউরোসাইকিয়াট্রিক হাসপাতালে কাটাতে হয়।

বর্তমান অবস্থা

দীর্ঘ বছরব্যাপী লড়াইয়ের পর ২০২২ সালে লোরি আবার তার স্বাভাবিক কর্মজীবনে ফিরে আসতে পেরেছেন। ২০১৭ সালের পর থেকে তার আর কোনো খিঁচুনি বা ফিট হয়নি। চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, ওষুধ এবং স্টেরয়েডের মাধ্যমে তার মস্তিষ্কের সেই ৩৮টি পরজীবী এবং তাদের ডিম ধ্বংস করা সম্ভব হয়েছে এবং সেগুলো এখন মস্তিষ্কেই ‘ক্যালসিফাইড’ বা পাথরের মতো শক্ত হয়ে অকেজো হয়ে রয়েছে। এর জন্য আর কোনো অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হয়নি, তবে সারাজীবন লোরিকে মৃগীরোগের ওষুধ খেয়ে যেতে হবে।

তার প্রধান চিকিৎসক ডা. ব্র্যান্ডন হিলি বলেন, লোরির এই কেসটি ছিল অত্যন্ত বিরল। একজন চিকিৎসকের পুরো ক্যারিয়ারে এমন রোগী সাধারণত একবারই দেখা যায়।

সূত্র: এনডিটিভি