জবি শিক্ষার্থী জোবায়েদ হত্যা: বর্ষাসহ তিনজনের বিচার শুরু, সাক্ষ্য ৯ ডিসেম্বর
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী জোবায়েদ হোসেন হত্যা মামলায় তিন আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেছেন আদালত।
নিজস্ব প্রতিবেদক: জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) শিক্ষার্থী ও শাখা ছাত্রদলের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য জোবায়েদ হোসেন হত্যা মামলায় তিন আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দিয়েছেন আদালত। একই সঙ্গে আগামী ৯ ডিসেম্বর মামলার সাক্ষ্য গ্রহণের দিন ধার্য করা হয়েছে।
রোববার (৮ নভেম্বর) দুপুরে ঢাকার ১৫তম অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালতের বিচারক মুহাম্মদ মাজহারুল ইসলাম আসামিদের অব্যাহতির আবেদন নাকচ করে অভিযোগ গঠনের আদেশ দেন।
মামলার তিন আসামি হলেন—জোবায়েদের ছাত্রী বার্জিস শাবনাম বর্ষা, বর্ষার প্রেমিক মো. মাহির রহমান এবং মাহিরের বন্ধু ফারদীন আহম্মেদ আয়লান। গ্রেপ্তার এই তিন আসামিই বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন। শুনানির সময় তাদের কারাগার থেকে আদালতে হাজির করা হয়। বাদীপক্ষের আইনজীবী ইশতিয়াক হোসেন জিপু বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
এর আগে গত ৩০ জুন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা বংশাল থানার উপপরিদর্শক (এসআই) আশরাফ হোসেন বর্ষাসহ তিনজনকে অভিযুক্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। আসামিরা আদালতে হত্যার দায় স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছেন।
চার্জশিটে বলা হয়, নিহত মো. জোবায়েদ হোসেন (২৫) জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগের ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের ১৫তম ব্যাচের শিক্ষার্থী ছিলেন। জীবিকা নির্বাহের জন্য তিনি টিউশনি করতেন। দীর্ঘদিন ধরে আসামি বর্ষার বাসায় গৃহশিক্ষক হিসেবে পড়াতেন তিনি। সেই সূত্রে জোবায়েদ ও বর্ষার মধ্যে ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়।
তদন্তে উঠে আসে, বর্ষার সঙ্গে আসামি মাহিরের দীর্ঘদিনের প্রেমের সম্পর্ক ছিল। পরবর্তী সময়ে গৃহশিক্ষক জোবায়েদের সঙ্গেও বর্ষার সম্পর্ক তৈরি হয়। দুজনের শারীরিক সম্পর্কের বিষয়টি জানতে পেরে মাহির ক্ষুব্ধ ও প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়ে ওঠেন বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।
স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি অনুযায়ী, জোবায়েদের কাছে নিজের আপত্তিকর ছবি ও ভিডিও থাকার অভিযোগ তুলে তাকে হত্যার জন্য মাহিরকে প্ররোচিত করেন বর্ষা। পরে মাহির তার বন্ধু আয়লানকে নিয়ে জোবায়েদকে হত্যার পরিকল্পনা করেন। তারা একটি সুইচগিয়ার চাকু সংগ্রহ করেন এবং ঘটনাস্থল ঘুরে দেখেন।
উদ্ধার করা ডিজিটাল আলামত ও ফোন বিশ্লেষণে দেখা যায়, ঘটনার দিন এবং তার আগেও বর্ষা ও জোবায়েদের মধ্যে হোয়াটসঅ্যাপে নিয়মিত যোগাযোগ ছিল। ঘটনার দিন বিকেল ৪টা ২৭ মিনিটে তাদের মধ্যে লাইভ লোকেশন শেয়ার হয়। একই সময়ে বর্ষা ও মাহিরের মধ্যেও একাধিকবার যোগাযোগ হয়। তদন্তকারীদের দাবি, পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বর্ষা জোবায়েদের অবস্থান মাহিরকে সরবরাহ করছিলেন।
অভিযোগপত্র অনুযায়ী, পূর্বপরিকল্পনা অনুসারে জোবায়েদ বর্ষার বাসায় পড়াতে গেলে মাহির ও আয়লান সেখানে অপেক্ষা করছিলেন। নিচতলায় জোবায়েদ প্রবেশ করলে মাহির কথা বলার বাহানায় তাকে থামিয়ে বাকবিতণ্ডায় জড়ান। একপর্যায়ে মাহির সুইচগিয়ার চাকু দিয়ে জোবায়েদের গলায় আঘাত করেন। গুরুতর আহত জোবায়েদ আত্মরক্ষার্থে সিঁড়ি দিয়ে ওপরে ওঠার চেষ্টা করলে তৃতীয় তলার সিঁড়িতে লুটিয়ে পড়েন। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে সেখানেই তার মৃত্যু হয় বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।
মামলার অভিযোগে বলা হয়, ২০২৫ সালের ১৯ অক্টোবর বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে জোবায়েদ বংশাল থানার ৩১ নম্বর ওয়ার্ডের নূর বক্স লেনের ১৫ নম্বর হোল্ডিংয়ের ‘রৌশান ভিলা’য় পড়াতে যান। ওই দিন সন্ধ্যা আনুমানিক ৫টা ৪৮ মিনিটে বর্ষা মেসেঞ্জারে জোবায়েদের বিশ্ববিদ্যালয়ের ছোট ভাই সৈকতকে জানান, ‘কে বা কারা জোবায়েদ স্যারকে খুন করে ফেলেছে।’
রাত আনুমানিক ৭টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মো. কামরুল হাসান ফোন করে বিষয়টি জোবায়েদের ভাই এনায়েত হোসেনকে জানান।
পরে এনায়েত তার শ্যালক শরীফ মোহাম্মদকে সঙ্গে নিয়ে রাত সাড়ে ৮টার দিকে ঘটনাস্থলে পৌঁছান। ভবনের সিঁড়ি ও দেয়ালে রক্তের দাগ দেখতে পেয়ে ওপরে গিয়ে তৃতীয় তলার সিঁড়িতে জোবায়েদের রক্তাক্ত মরদেহ পড়ে থাকতে দেখেন তারা।
ময়নাতদন্ত শেষে ২০ অক্টোবর জোবায়েদকে কুমিল্লার কৃষ্ণপুর গ্রামে দাফন করা হয়। এ ঘটনায় ২১ অক্টোবর সকালে জোবায়েদের ভাই এনায়েত হোসেন বাদী হয়ে বংশাল থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন।
মামলার নথি অনুযায়ী, ওই দিনই বর্ষাসহ তিন আসামি আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। পরে আদালত তাদের কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। এ ছাড়া প্রীতম নামের এক ব্যক্তি এ মামলায় সাক্ষী হিসেবে আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন।























