গাইবান্ধায় বাড়ছে ডেঙ্গু-হামের রোগী, একই ওয়ার্ডে চিকিৎসায় বাড়ছে ঝুঁকি
গাইবান্ধা জেনারেল হাসপাতালে ডেঙ্গু ও হামের রোগীর সংখ্যা বাড়ায় চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
গাইবান্ধা প্রতিনিধি: গাইবান্ধায় আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে ডেঙ্গু জ্বর ও হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা। এরই মধ্যে গত বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) ডেঙ্গুতে এক শিক্ষার্থীর মৃত্যুর ঘটনায় জেলাজুড়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। হাসপাতালগুলোতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাপনা, চিকিৎসাসেবা ও নজরদারি নিয়ে নানা ঘাটতির অভিযোগও উঠেছে।
ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে নিহত ১৯ বছর বয়সী ওই শিক্ষার্থী গাইবান্ধা সরকারি মহিলা কলেজের বিজ্ঞান বিভাগ থেকে এইচএসসি পরীক্ষার ফল প্রত্যাশী ছিলেন।
হাসপাতাল ও নিহতের পরিবার সূত্র জানায়, গত ১৫ আগস্ট পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি প্রস্তুতির কোচিং করতে ওই শিক্ষার্থী ঢাকায় যান। সেখানে গত শনিবার জ্বর পরীক্ষা করালে ডেঙ্গু পজিটিভ ধরা পড়ে। পরে বুধবার বিকেলে তাকে গাইবান্ধা সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে বিকেল ৫টার দিকে উন্নত চিকিৎসার জন্য রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। তবে পথে মিঠাপুকুর এলাকায় তার মৃত্যু হয়।
মেয়ের নাম-পরিচয় প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়ে নিহতের বাবা আব্দুল করিম ঢাকা পোস্টকে বলেন, ঢাকায় ডেঙ্গু পজিটিভ হওয়ার পর হাসপাতালে ভর্তি না করে সাধারণ চিকিৎসায় ওষুধ খাওয়ানো হয়েছিল। পরে বাড়িতে এনে চিকিৎসা করানোর কথা থাকলেও সেই সুযোগ হয়নি।
বাড়ছে হামের রোগীও
শুধু ডেঙ্গু নয়, হামের উপসর্গ নিয়েও প্রতিদিন বাড়ছে রোগীর চাপ। জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের ১৭ সেপ্টেম্বরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ১৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সন্দেহভাজন হামে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ৪৯১ জন।
এর মধ্যে ৪৬৭ জন সন্দেহভাজন হাম রোগীর সিরাম নমুনা সংগ্রহ করে ঢাকায় পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়। পরীক্ষায় ২৯ জনের হাম পজিটিভ শনাক্ত হয়েছে। শনাক্তদের মধ্যে একজনের মৃত্যু হয়েছে।
অন্যদিকে একই সময়ে জেলার সাত উপজেলায় ডেঙ্গু শনাক্ত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন ১৭১ জন। তাদের মধ্যে ১৫২ জন ছাড়পত্র নিয়েছেন।
জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, সন্দেহভাজন ৪৯১ জন হাম রোগীর মধ্যে গাইবান্ধা জেনারেল হাসপাতালেই ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন ৩৭৩ জন। একই সময়ে হাসপাতালটিতে ডেঙ্গু রোগীর চিকিৎসা নিয়েছেন ১২১ জন। এদের মধ্যে গত বুধবার ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ওই শিক্ষার্থীর মৃত্যু হয়।
একই ওয়ার্ডে ডেঙ্গু, হাম ও সাধারণ রোগী
হাসপাতালের আন্তঃবিভাগের দায়িত্বে থাকা সংশ্লিষ্টরা জানান, নিচতলার ৪৯ থেকে ৫৫ নম্বর পর্যন্ত—৫০ ও ৫৩ বাদে—পাঁচটি বেড ডেঙ্গু রোগীদের জন্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এছাড়া দোতলার মহিলা ওয়ার্ডের ১ থেকে ৭ নম্বর বেড হাম কর্নার হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে। হামে আক্রান্ত শিশুদের জন্য শিশু ওয়ার্ড আলাদা রাখা হয়েছে।
তবে বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) সকাল ও বিকেলে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, হাম ও সন্দেহভাজন হামে আক্রান্ত শিশুদের জন্য আলাদা কক্ষ থাকলেও বয়স্কদের জন্য আলাদা কোনো ওয়ার্ড বা বিভাগ নেই। বিভিন্ন ওয়ার্ডে ডেঙ্গু, হাম ও সাধারণ রোগীদের একসঙ্গে চিকিৎসা নিতে দেখা যায়।
দোতলার মহিলা ওয়ার্ডের ১ থেকে ৭ নম্বর বেড হাম কর্নার হিসেবে ব্যবহৃত হলেও সেখানে সাধারণ রোগীও ছিলেন। হামের জন্য নির্ধারিত বেডে রোগী না থাকলেও ১৪ নম্বর সাধারণ রোগীর বেডে লাবনী (২০) নামে একজন হাম রোগীকে পাওয়া যায়। গত বুধবার ওই ১৪ নম্বর বেডেই ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়া শিক্ষার্থী চিকিৎসাধীন ছিলেন।
অন্যদিকে ডেঙ্গু রোগীদের জন্য নির্ধারিত পাঁচটি বেডে আটজন রোগীকে পাওয়া যায়। তাদের বেশির ভাগই ঢাকায় আক্রান্ত হয়েছেন। ৫৫ নম্বর বেডের ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী মশিউর ছাড়া অন্যদের বেডে মশারি টানানো ছিল না।
পুরুষ ওয়ার্ডের ৫০ নম্বর বেডে থাকা শহিদুল ইসলাম (৩২) জানান, গত শুক্রবার থেকে তার জ্বর ছিল। স্থানীয়ভাবে ওষুধ খাওয়ার পরও জ্বর না কমায় বুধবার পরীক্ষা করে ডেঙ্গু শনাক্ত হয়। ওইদিন সন্ধ্যায় তিনি হাসপাতালে ভর্তি হন। তবে তাকে মশারি দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি।
ওই ওয়ার্ডের ৪৫ নম্বর বেডে চিকিৎসাধীন হার্নিয়া রোগী বিপুল বলেন, ডেঙ্গু রোগীদের বেডে মশারি না থাকায় তারা ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন। তার ভাষ্য, ডেঙ্গু, হাম ও সাধারণ রোগীদের একসঙ্গে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
এক রোগীর স্বজন মাহালমও বলেন, হাসপাতালের পরিস্থিতিতে রোগী ও স্বজনদের মধ্যে ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।
নার্সদের বক্তব্য
শিশু ওয়ার্ডে হামে সন্দেহভাজন শিশু আব্দুর রহিমের মা হালিমা বেগম জানান, কয়েক দিন আগে শিশুটির শরীরে অ্যালার্জির মতো উপসর্গ দেখা দেয়। পরে হোমিওপ্যাথিক ওষুধ খাওয়ানো হলেও মঙ্গলবার সারা শরীরে তা ছড়িয়ে পড়ে। এরপর তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
দোতলার মহিলা ওয়ার্ডের সিনিয়র স্টাফ নার্স আঞ্জুয়ারা খাতুন বলেন, রোগীর চাপ অনেক বেড়েছে। বাস্তবতার সঙ্গে তারা পুরোপুরি তাল মেলাতে পারছেন না। রোগী এলে যে বেড ফাঁকা থাকে, সেখানেই তাকে ভর্তি করতে হচ্ছে।
তিনি বলেন, হাম ছোঁয়াচে রোগ হওয়ায় রোগী ও স্বাস্থ্যকর্মী সবাই ঝুঁকিতে রয়েছেন। ডেঙ্গুও বিপজ্জনকভাবে ছড়াচ্ছে বলে জানান তিনি।
হাসপাতালের সিনিয়র স্টাফ নার্স মাহিনুর জান্নাত মুন্নি বলেন, ডেঙ্গু রোগীদের মশারি দিতে চাওয়া হয়। তবে অনেক রোগী গরম ও ফ্যানের বাতাস কম পাওয়ার কথা বলে মশারি ব্যবহার করতে চান না। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ডেঙ্গু রোগীর ক্ষেত্রে মশারি ব্যবহার বাধ্যতামূলক হলেও তা বাস্তবায়নে কিছু ঝুঁকি রয়েছে।
কয়েক মাসে বেড়েছে রোগীর চাপ
হাসপাতালের মাসভিত্তিক পরিসংখ্যানেও ডেঙ্গু ও হামের রোগীর চাপ বৃদ্ধির চিত্র পাওয়া যায়।
জেলা সদর হাসপাতালে জানুয়ারি মাসে চারজন ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসা নেন। ফেব্রুয়ারিতে একজন, মার্চে তিনজন, এপ্রিল ও মে মাসে একজন করে এবং জুনে পাঁচজন রোগী চিকিৎসা নেন। এরপর জুলাই, আগস্ট ও সেপ্টেম্বরে রোগীর সংখ্যা কয়েক গুণ বেড়ে যায়।
হাসপাতালের হিসাব অনুযায়ী, জুলাইয়ে ১৫ জন ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসা নিলেও আগস্টে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৫০ জনে। চলতি মাসের ১৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত গাইবান্ধা জেনারেল হাসপাতালে ৪১ জন ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসা নিয়েছেন।
হামের ক্ষেত্রেও একই সময়ে রোগীর সংখ্যা বেড়েছে। মার্চে হামের উপসর্গ নিয়ে তিনজন রোগী ভর্তি হলেও এপ্রিলে ৩৪ জন, মে মাসে ৬৭ জন, জুনে ৮৯ জন এবং জুলাইয়ে ৭৩ জন চিকিৎসা নেন। আগস্টে রোগীর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৭৬ জনে। ১ সেপ্টেম্বর থেকে ১৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আরও ৪১ জন সন্দেহভাজন হাম রোগী চিকিৎসা নিয়েছেন।
এছাড়া বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) সকাল ৮টা পর্যন্ত গত ২৪ ঘণ্টায় গাইবান্ধা জেলায় চিকিৎসাধীন ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা ছিল ১৯ জন এবং সন্দেহভাজন হাম রোগী পাঁচজন।
গাইবান্ধা জেনারেল হাসপাতালে নতুন পাঁচজনসহ সন্দেহভাজন হামে আক্রান্ত ১৪ জন চিকিৎসা নিচ্ছিলেন। তাদের মধ্যে শূন্য থেকে পাঁচ বছর বয়সী শিশু ছিল আটজন। একই সময়ে ডেঙ্গু সন্দেহে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ছিল আটজন, যাদের সবাই প্রাপ্তবয়স্ক।
চিকিৎসকদের পরামর্শ
ফুলছড়ি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জুনিয়র কনসালটেন্ট পদের বিপরীতে থাকা অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর ডা. তানভীর রহমান কল্লোল বলেন, হাম একটি ভাইরাসজনিত ছোঁয়াচে রোগ। হাঁচি-কাশি ও বায়ুর মাধ্যমে এটি ছড়ায়।
ডেঙ্গু প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সারা দেশেই ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ছে এবং সাধারণত বর্ষাকালে এর বিস্তার বেশি হয়। উভয় ধরনের রোগীদের আলাদা রেখে চিকিৎসা করানো উচিত। ডেঙ্গু রোগীকে অবশ্যই মশারির ভেতরে রাখার পরামর্শ দেন তিনি।
গাইবান্ধা জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) আসিফ রহমান বলেন, শয্যা সংকটের কারণে রোগীদের জন্য আলাদা আলাদা বিভাগ করা সম্ভব হয়নি। তবে সাধারণ রোগীদের বিভাগে আলাদা কর্নার রয়েছে।
মশারি না থাকার বিষয়ে তিনি বলেন, এমনটা হওয়ার কথা নয় এবং বিষয়টি তিনি দেখছেন।
গাইবান্ধার সিভিল সার্জন ডা. রফিকুজ্জামান বলেন, ডেঙ্গু ও হাম—দুই ধরনের রোগেই ঝুঁকি রয়েছে। হাম ও ডেঙ্গু রোগীদের আলাদা বিভাগে রাখার জন্য অধিদপ্তরের নির্দেশনা রয়েছে।
তবে হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা নিয়ে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করে গাইবান্ধা জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. শহীদুল্লাহ বলেন, হামের জন্য আইসোলেশন এবং ডেঙ্গুর জন্য নির্দিষ্ট বেড রয়েছে। পর্যাপ্ত মশারিও রয়েছে এবং রোগীদের তা দেওয়া হয়। তবে অনেক রোগী মশারি ব্যবহার করেন না।
তিনি আরও বলেন, এসব ব্যবস্থা বাস্তবায়নে স্টাফদের নিরাপত্তার জন্য বারবার আনসার চেয়েও পাওয়া যাচ্ছে না।






















